তদবিরে ব্যস্ত হবার অভিযোগ পাওয়া গেছে কিছু সহকারি ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে। অ্যাটর্নিরা হচ্ছেন উচ্চ আদালতে কর্মরত রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী । সুপ্রীম কোটের্র দলীয় আইনজীবীদের মধ্যে হতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন অ্যাটর্নিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকারি সম্পদ রক্ষায় মামলা পরিচালনা করার কথা থাকলেও অ্যাটর্নিরা বিভিন্ন তদবিরে কাজ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিপুল সংখ্যক মামলা-মোকাদ্দমার কারণে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন বিঘ্নিত ও বিলম্বিত হয়। মামলায় সরকার পক্ষ পরাজিত হওয়ার হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মূলত দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলাসমূহ অ্যাটর্নিরা পরিচালনা করে থাকেন।
রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৬৪ ধারার পদাধিকার বলে অ্যাটর্নিদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তারা সরকার কর্তৃক প্রদেয় মাসিক হারে নির্ধারিত বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন । রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সর্বশেষ নির্দেশনা দেয়া পর্যন্ত অ্যাটর্নিরা কর্মরত থাকেন ।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় জানায়, দেশে সর্বমোট ১৫১ জন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কর্মরত আছেন। রাষ্ট্রর প্রধান আইন কর্মকর্তা হচ্ছেন অ্যাটর্নি জেনারেল, তার মধ্যে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ৩ জন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ৫১ জন এবং এসিসট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ৯৬ জন ।
একান্ত সাক্ষাতকারে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শশাঙ্ক শেখর সরকার টাইমনিউজবিডি প্রতিনিধিকে জানান, "সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অ্যাটর্নি জেনারেলরা নিয়োগ প্রাপ্ত হন। নিয়োগের পর থেকে পুন: আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তারা কাজ করে যাবেন। রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা অনুযায়ী অ্যাটর্নিরা বিদায় নেয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যখন কোন মহল আমাকে চাপ প্রয়োগ করেছে তখন আমি আদালত কে অবহিত করেছি । মামলা পরিচালনা থেকে দূরে থেকেছি। সর্বক্ষেত্রে আদালত বিব্রত হয় তা নয় আইনজীবীও বিব্রত হতে পারে।
অন্য আরেকটি প্রশ্নের জবাবে বলেন, রাজনৈতিক কারণেই বিএনপি -জামায়াত সরকারের অ্যার্টনি সার্ভিস বাস্তবে আসতে পারেনি। নতুন মেয়াদের মহাজোট সরকারের অ্যাটর্নিদের মধ্যে কোন পরিবর্তন আসবে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, আসলে তো ভাল হত।
তিনি আরও বলেন, সব অ্যাটর্নিরা যোগ্য বা দক্ষ তা বলা যাবে না। তবে আমি রাষ্ট্রের পক্ষে সব সময় কাজ করেছি, কোন সময় জিতেছি কোন সময় হেরেছি।
কারো কারো তদবির করার অভিযোগে তিনি বলেন, আমার জানা নাই, সুনিদিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অ্যাটর্নি জেনারেল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।"
সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন জানান, "কয়েক জন আছেন আদালতের কার্যক্রমে অনুপস্থিত থেকে চেষ্টা-তদবীর করে থাকেন। তবে বিস্তারিতভাবে আমার জানা নাই। নামসহ অভিযোগ গুলো আসলে ভাল হত।"
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সরকারের অসংখ্য মামলা হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এসব মামলার ৯৫ শতাংশই সরকার পক্ষ হেরেছে।
এর কারণ অনুসন্ধান করে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, মামলার সরকার বিরোধীপক্ষ সব সসময়ই প্রভাবশালী হয়ে থাকে। তারা সরকারি সম্পদ অবৈধভাবে দখল করে থাকে। এসব অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে সরকার অভিযান চালালে তারা আদালতে মামলা দায়ের করে দেয়। আর এসব মামলার অধিকাংশই সরকারি খাস জমির মামলা।
দখলদাররা ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জাল দলিল বানিয়ে আদালতে পেশ করে থাকে।
সরকার পক্ষের যেসব আইনজীবী রয়েছে তাদের নানাভাবে প্রভাবান্বিত করে মামলায় জয়ের চেষ্টা করেন বিরোধীপক্ষ। প্রয়োজনে সরকারের ওই আইনজীবীকে মোটা অংকের অর্থও দিয়ে থাকেন তারা।
যেহেতু সরকারি ওই আইনজীবী অস্থায়ীভাবে নিয়োগকৃত এবং মামলায় হার-জিতের সঙ্গে তার তেমন কোনো স্বার্থ নেই এবং বড় ধরণের পুরস্কারেরও সম্ভাবনা নেই,তাই তারা অবৈধ সুবিধা নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
অন্যদিকে এ জাতীয় আইনজীবীদের সরকার অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন, যারা সাধারণত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়োগও পরিবর্তন হয়। কাজেই নগদ যা পাওয়া যায় তাই তারা কাজে লাগায়।
আর অবৈধ দখলদাররা অধিকাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা। ফলে সরকারি এসব আইনজীবীদের সঙ্গে এসব অবৈধ দখলদারের একটা অনৈতিক সম্পর্ক থাকেই। আর এ সম্পর্ক থাকা এবং অবৈধ লেনদেনের কারণে আদালতে সরকারপক্ষের আইনজীবী তথ্যপ্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও শক্তভাবে তা উপস্থাপন করে না। ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনীয় দলিলও আদালতে উপস্থাপন করে না তারা।
ফলে সরকারপক্ষকে আদালতে হারতে হয়। সরকারপক্ষ হারলেও ওই আইনজীবীকে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। ফলে সরকারের আইনজীবীর উভয়দিকেই লাভ হয়।
একদিকে তারা সরকারের কাছে প্রাপ্য পাওনা পায়। পাশাপাশি বিরোধীপক্ষের কাছ থেকেও বড় ধরণের অর্থ নেয়। অনেক সময় এসব বিষয়ে শতকরা হারে কমিশনও নিয়ে থাকে সরকারের নিয়োগ করা এসব আইনজীবীরা।
ফলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারপক্ষ হেরে যায়। কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ হাত ছাড়া হয়ে যায়।
এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতেই বিএনপি-জামায়াত সরকার স্থায়ীভাবে অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। সরকারের সে সময়কার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেয়। খসড়া চূড়ান্তও হয়।
কিন্তু রহস্যজনক কারণে আইনটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে ওয়ান ইলেভেনের সরকার এসে এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করে। আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নিলে এ অধ্যাদেশে অনুমোদন না দেওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। পরে ওই অধ্যাদেশের ওপরই নতুন করে কিছু সংশোধন এনে প্রস্তাবিত এ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়।
[b]খসড়ায় যা ছিল:[/b]
প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ৫০ ভাগ, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, জেলা অ্যাটর্নি ও অতিরিক্ত জেলা অ্যাটর্নি পদে ২৫ ভাগ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে।
অবশিষ্ট পদে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)’র অধীনে পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে অ্যাটর্নি সার্ভিসের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য একটি অধিদপ্তর গঠন করার কথা বলা হয়েছে। অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
উল্লেখ্য,ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’ ২০০৮ প্রণীত হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে ওই অধ্যাদেশের অনুমোদন না দিলে তা বাতিল হয়ে যায়। ওই অধ্যাদেশে অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে।
সেখানে শুধু অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ৫০ ভাগ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান ছিল। অন্যপদে সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিসে সুপ্রীম কোর্ট ও জেলা নামে দু'টি শাখার কথা বলা হয়েছে।
সুপ্রীম কোর্ট শাখায় নিযুক্ত অ্যাটর্নিগণ সুপ্রীমকোর্টে এবং জেলা শাখার অ্যাটর্নিরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতে সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনাসহ অন্যান্য বিষয়াদি সম্পর্কে দায়িত্ব পালন করবেন।
এই আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেলদের সকল আদালতে বক্তব্য পেশ করার অধিকার থাকবে।
সুপ্রীম কোর্ট শাখায় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে। তবে এ ক্ষেত্রে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা লাগবে কমপক্ষে ৩ বছরের।
বাকি ৫০ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে সুপ্রীম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত আইনজীবীগণের মধ্যে সরকার কর্তৃক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে। এ জন্য সুপ্রীমকোর্টে আইন পেশায় কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা লাগবে।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ৭৫ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেলের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে। বাকি ২৫ শতাংশ পদ সুপ্রীম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত আইনজীবীগণের মধ্যে সরকার কর্তৃক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে।
এ জন্য সুপ্রীম কোর্টে আইন পেশায় কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে কমপক্ষে পাঁচ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা লাগবে। সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেলের ৭৫ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে পিএসসির মাধ্যমে।
এ জন্য প্রার্থীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হওয়া চলবে না এবং কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতক (সম্মান) এবং সুপ্রীম কোর্টের আইন পেশায় কমপক্ষে ৫ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
বাকি ২৫ শতাংশ পদ যুগ্ম জেলা অ্যাটর্নিগণের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হবে। এ জন্য যুগ্ম জেলা অ্যাটর্নি পদে কমপক্ষে ৩ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা লাগবে।
জেলা পর্যায়ে জেলা অ্যাটর্নি পদে ৭৫ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে অতিরিক্ত জেলা অ্যাটর্নিগণের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে। এ জন্য প্রার্থীকে অতিরিক্ত জেলা অ্যাটর্নি পদে কমপক্ষে তিন বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা লাগবে।
বাকি ২৫ শতাংশ পদ সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে আইন পেশায় কমপক্ষে ১৫ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হবে।
অতিরিক্ত জেলা অ্যাটর্নি পদের ৭৫ শতাংশ পদ পূরণ করা হবে যুগ্ম জেলা অ্যাটর্নিগণের পদোন্নতির মাধ্যমে। এ জন্য কমপক্ষে ৩ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা লাগবে। বাকি ২৫ শতাংশ পদ সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করবে। এ জন্য আইন পেশায় কমপক্ষে ১০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হবে।
যুগ্ম জেলা-অ্যাটর্নি পদ পূরণ করা হবে সহকারি অ্যাটর্নিগণের মধ্য হতে পদোন্নতির মাধ্যমে। সহকারি জেলা অ্যাটর্নি নিয়োগ পাবেন সরাসরি পিএসসি’র অধীনে পরীক্ষার মাধ্যমে।
[b]ঢাকা: কেএ ১৩ এপ্রিল(টাইম নিউজ) // জেআই[/b]
টাইম ফোকাস
তদবিরে ব্যস্ত সহকারি ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল
তদবিরে ব্যস্ত হবার অভিযোগ পাওয়া গেছে কিছু সহকারি ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে। অ্যাটর্নিরা হচ্ছেন উচ্চ আদালতে কর্মরত রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী । সুপ্রীম কোটের্র দলীয় আইনজীবীদের মধ্যে হতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন অ্যাটর্নিরা।





