বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আজ ১৩ অক্টোবর বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উদযাপিত হচ্ছে। দুর্যোগ ঝুঁকি ও এর ফলে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে সচেতন করতে বিশ্বব্যপী এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘জীবনের প্রয়োজনে জ্ঞান’, যা আমাদের বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।

এ বছর বৈশ্বিক পরিসরে তিনটি উন্নয়ন পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কাঠামো পাশাপাশি চলছে। এগুলো হচ্ছে দুর্যোগ সম্পর্কিত সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা (এসডিজি) এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত চুড়ান্ত সংলাপ। তিনটি কাঠামোতেই সমস্যা অনুধাবন, শনাক্তকরণ এবং এদের সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ উপরোক্ত তিনটি বৈশ্বিক কাঠামোর সাথে সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকার প্রাপ্ত দেশ হিসেবে প্রয়োজনীয় সংলাপ ও আলোচনায় কার্যকর অংশ গ্রহণ করে বিভিন্ন দুর্যোগ ঝুঁকির ক্ষয়ক্ষতি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচন করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনের রূপরেখা তৈরিতে ভূমিকা রেখে চলেছে।

জ্ঞান একটি ব্যবহার উপযোগী বিষয়, আর প্রয়োজনীয় তথ্য ও দক্ষতা শিক্ষা গ্রহণ বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। এগুলো তিনভাবে এসে থাকে, যথা- অনুধাবন, আবিষ্কার বা উদভাবন এবং অভিজ্ঞতা। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত জ্ঞান আলাদা হলেও এগুলো আমাদের জীবন যাপনকে ব্যাপকভাবে দারুনভাবে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস ও লোকায়ত জ্ঞানের ব্যবহার অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সে কারণেই এ বিষয়টিকে দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে সেন্দাই ফ্রেমওর্য়াকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; যা এতদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ফ্রেমওয়ার্কের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।

দুর্যোগ হচ্ছে, একটি সম্ভাব্য ঘটনা বা ঘটনার বাস্তবতা। দুর্যোগের দ্বারা ক্ষয়ক্ষতি ও এর সম্ভাব্য নেতিবাচক ফলাফল কমিয়ে আনার জন্য আমাদের আগাম সতর্ক বার্তা দুর্যোগে প্রস্তুতি নিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে। আমরা জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগে যত ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবো, ততো ক্ষয়-ক্ষতির সম্ভাবনা কমিয়ে আনতে সক্ষম হবো। দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারি।
সে কারণে বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ১৯৯৮/১৯৯৯ এ টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জ্ঞানকে পুঁজির চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এবারের আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের লোকায়ত জ্ঞানকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। লোকায়ত জ্ঞান হাজার বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্জিত। এটি স্থানীয় পরিবেশ প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ। তাই পরিবেশ প্রক্রিয়া ধংস বিভিন্ন দুর্যোগের একটি বড় কারণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও আমরা এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা কমিয়ে আনতে বৈশ্বিক আলোচনা চলমান আছে। কার্বন নিংসরণের মাত্রা কমিয়ে আনতে মতৈক্য হলেও আমাদের এর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় অভিযোজন, ঝুঁকিহ্রাস, প্রস্তুতি ও সাড়াদানের কাজ করে যেতে হবে। এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তনের শিকার গ্রামীণ বা শহরের জনগণকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় আমাদের হাজার বছরের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের একটি ঐশ্বর্যমণ্ডিত ভাণ্ডার রয়েছে। সাংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যগতভাবে গ্রহণযোগ্য কোন এলাকার জ্ঞান ভাণ্ডার দেশের অন্য এলাকা, এমনকি পৃথিবীর অন্য কোন দেশেও ব্যবহৃত হতে পারে। আমাদের লোকায়ত জ্ঞানের ব্যবহারের ক্ষেত্র বেশ ব্যাপক; এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে –
ক) কৃষি, খ) বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনা, গ) মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনা, ঘ) আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (উঁচুতে বাড়িঘর, স্থানীয় পদ্ধতিতে নৌকা তৈরি), ঙ) ভেষজ ও ঔষধী বৃক্ষ, চ) স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক সংহতি স্থাপন, ছ) নানা সামাজিকতা ও আচার-আনুষ্ঠান, জ) স্থানীয় পদ্ধতিতে পানি ও খাদ্য সংরক্ষণ ঝ) দুর্যোগের আগাম বার্তা প্রদান ইত্যাদি।
আমরা হয়তো অর্থনৈতিক মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র, কিন্তু আমাদের যুগবাহিত সংযোজিত জ্ঞান, অনুশীলন এবং আমাদের জীবন দক্ষতা অনেক উন্নত দেশ থেকে সমৃদ্ধ, বৈচিত্রময় ও প্রাচুর্যপূর্ণ। দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের অবশ্যই লোকায়ত জ্ঞানের সংরক্ষণ এবং সেই সাথে নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দিতে হবে। এগুলোকে আমাদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।

এমএইচ