১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস অভিযান শুরুর কয়েকদিনপরে থেকেই সারাদেশে শুরু হয়ে যায় চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার বাঙালি বিভিন্ন জায়গা ঘেরাও করে প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত ছড়িয়ে দেয়।
মেজর নাসিরউদ্দিনের লেখা ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ এবং মুকুল মোস্তাফিজুর রহমান লিখিত ‘মুক্তিযুদ্ধে রংপুর’ গ্রন্থে ওই দিনের বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়, ক্যান্টনমেন্ট দখলের জন্য ওইদিন হাজার হাজার বাঙালি ক্যান্টনমেন্টের কাছে নিশবেতগঞ্জে সমবেত হয়।
বাঙালি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, ওঁরাও, সাঁত্ততাল এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক, দেশীয় অস্ত্র তীর, ধনুক, বর্শা নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট দখলের পরিকল্পনা করে বলে এই বইয়ে উল্লেখ করা হয়।
২৩তম ব্রিগেড সদর দফতরের ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ মালিক এবং বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানী সৈন্য ও আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, আর্টিলারি, ট্যাঙ্ক ও গোলাবারুদে, ক্যান্টনমেন্ট সজ্জিত ছিল।
হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হয়। সেখানে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী গণহত্যা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। পাকিস্তানি আর্মির জিপ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মাধ্যমে ঘেরাওকারীদের ওপর গুলি চালাতে থাকে। পাঁচ মিনিট ধরে গুলিবর্ষণে ৬০০ বাঙালির মৃত্যু হয় এবং আরও শত শত আহত হয়।
স্থানীয় বিহারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী পাকিস্তানি কর্নেল সগীর পরে বলেছেন, তারা (বাঙালি) সকল সীমা অতিক্রম করায় অধীন কমান্ডকে উচিত শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দেন এতে অন্তত ৬০০ লোকের মৃত্যু হয়। তিনি সৈন্যদের মৃত দেহগুলো সংগ্রহের নির্দেশ দেন।
এক পর্যায় এক বিহারী ক্যাপ্টেন নিকটবর্তী ঘাঘট ব্রিজের নিচ থেকে পলায়নরত এক বৃদ্ধ বাঙালিকে ধরে এনে নিজের পিস্তলের গুলিতে হত্যা করে।
কর্নেল সগির ও ক্যাপ্টেন সাজিদ মাহমুদের কমান্ড শহীদ বাঙালিদের বেশিরভাগ মৃতদেহ সংগ্রহ করে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেয় এবং কিছু মৃতদেহ নিশবেতগঞ্জ গণকবরে মাটিচাপা দেয়।
এ দিন ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ে ৬০০ বীর সন্তানের আত্মত্যাগের জনগণ, বাঙালি আর্মি অফিসার, ইপিআর সদস্য, ছাত্র, কৃষক শিক্ষক, যুবক, আইনজীবী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্র্মী দেশকে স্বাধীন করার অঙ্গীকার করেন।
এই খবর দ্রুত অন্য সকল এলাকা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নিলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড় এবং আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার ছাত্র, যুবক, পুলিশ ও আনসার বাড়ি থেকে পালিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়।
পরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ছাত্র নেতারা স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং রংপুর অঞ্চলে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
এআইজে





