একটি দেশের মানুষকে প্রাথমিক দিকে প্রথম জাতি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, আদিম মানুষ, উপজাতি প্রভৃতি নামে চিহ্নিত করা হত। আদিবাসী বলতে কি বুঝায় ও তাদের অধিকার কি এ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রয়েছে বহু বিতর্ক।

জাতিসংঘের সাথে অনেক আলোচনা করেও এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি।

সাধারণত কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অনুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করত এবং এখনও করে; যাদের নিজস্ব আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী।

আদিবাসীদের উপজাতি হিসেবে সম্বোধন করা একেবারেই অনুচিত, কারণ তারা কোন জাতির অংশ নয় যে তাদের উপজাতি বলা যাবে। বরং তারা নিজেরাই এক একটি আলাদা জাতি।

পাঁচটি মহাদেশে ৪০টির বেশি দেশে বসবাসরত প্রায় ৫,০০০ আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি।

আদিবাসীদের দিকে যেন দৃষ্টি দেয়া হয় সে জন্য ১৯৯৫ সালের ৯ আগস্টকে "বিশ্ব আদিবাসী দিবস" ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়।

বাংলাদেশে সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থানে সরকার ও আদিবাসী নেতৃবৃন্দ। সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে আদিবাসী জনগণকে ইতোমধ্যে ‘উপজাতি, নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সম্প্রদায়’হিসেবে অভিহিত করেছে বর্তমান সরকার।

সরকারী ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে লড়াইসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আদিবাসী নেতৃবৃন্দ।

তারা অভিযোগ করেন, সরকার আরেকটি পদক্ষেপ নিয়ে আদিবাসীকে উত্তেজিত করে তুলেছে। নানাভাবে ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালনে নিরুৎসাহিত করে যাচ্ছে সরকার।

প্রশাসনে এবং সরকারী পর্যায়ে এ ধারণা প্রবলভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নেই। দিবসটি যাতে পালন করতে না পারে, সেজন্য সরকার ২০১২ সালে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত নির্দেশনা পাঠিয়েছিল।

এ বছর নিষেধাজ্ঞা না দিলেও আদিবাসীদের দাবি নিয়ে সরকারের নতুন কোন বক্তব্য নেই। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ রবিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব আদিবাসী দিবস।

আদিবাসী নেতৃবৃন্দ জানান, বাংলাদেশে ৪৫টি জাতিসত্তার প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী রয়েছে। আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে পাহাড়ী ও সমতল অঞ্চলের বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন।

দাবি আদায়ের লক্ষ্যে একের পর এক কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছে তারা। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটির কাছে তারা নিজেদের দাবিদাওয়া পেশ করেন।

স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় তারা বুক বেধে ছিলেন। কিন্তু আদিবাসীদের দাবি এড়িয়ে যায় সরকার। ২০১২ সালে আদিবাসী স্বীকৃতি নাকচ করে দিয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে আদিবাসীরা।

তারই ধাবাবাহিকতায় ২০১২ সালে একই বক্তব্য দেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি। ‘আদিবাসী’বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে ২০১২ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটা করে বিদেশী কূটনীতিক ও উন্নয়নসহযোগী গোষ্ঠী এবং দেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের পৃথক পৃথকভাবে ব্রিফিং করেন।

ব্রিফিংয়ে তিনি দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহকে ‘আদিবাসী’হিসেবে অভিহিত করতে বারণ করেন এবং পক্ষান্তরে তাদের ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’বা ‘উপজাতি’ (ট্রাইবাল) আখ্যায়িত করতে পরামর্শ দেন।

২০১২ সালে এই দু’মন্ত্রীর বক্তব্য যেন কাগজে-কলমে রূপ পায়। সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে ৩০ লাখ আদিবাসীকে ‘উপজাতি, নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সম্প্রদায়’হিসেবে অভিহিত করে বর্তমান সরকার। তবে তা প্রত্যাখ্যান করেছে আদিবাসীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) জানান, সংবিধানে আদিবাসীদের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদিবাসী জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, কলামিস্ট সঞ্জীব দ্রং বলেন, মানবাধিকার লংঘন, ভূমি দখল, নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে আদিবাসীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে। আদিবাসী জনগণের সঙ্গে বাঙালী জনগণের সংহতি স্থাপন ও সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে।

এদিকে, বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রবিবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে সমাবেশ, র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

এমকে