ধারাবাহিকের এই পর্বে যে বিষয়টি আমি প্রমান করার চেষ্টা করবো তা হলো হিটলার আসলে কখনোই ইহুদী বিদ্বেষী ছিল না; বরং যারা ইহুদী বিরোধী অবস্থানে ছিলেন তাদের প্রতিই অনেকাংশে হিটলার বিরুপ মনোভাব পোষণ করতেন। কিন্তু ইহুদীদের কর্মকান্ড যতই হিটলারের কাছে পরিস্কার হতে থাকে এবং ইহুদীদের কুটচালের জট খুলতে থাকে, ততই ইহুদী বিদ্বেষ তার মধ্যে চাঙ্গা হতে থাকে। এই ইহুদী বিদ্বেষ কতটা বাস্তবিক তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষের কাছে যখন ইহুদীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ পরিস্কার হয়ে যায় তখন তার কীইবা করার থাকে?

বিষয়টিকে আমি একটু বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তুলনা করতে চাই। গত ৮ জুলাই ২০১৪ থেকে গাজায় ইসরাইলী আগ্রাসন শুরুর পর থেকে সেখানে ছোট ছোট শিশু ও নারীসহ যে নারকীয় গণহত্যা চলছে সেটা প্রত্যক্ষ করার পর কেউ যদি প্রচন্ড মাত্রায় ইহুদী বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করেন সেটা কতটা অযৌক্তিক হবে? গাজায় ইসলামী প্রতিরোধ যোদ্ধা হামাসের কর্মকান্ডকে অনেকেই ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারেন। বলতে পারেন যেহেতু হামাস গাজারই অধিবাসীদের সংগঠন, তাই  দখলদার ইহুদীদের প্রতি হামাসের বিদ্বেষ স্বাভাবিক।

কিন্তু বাস্তবতা আসলে কী? ন্যূনতম বিবেক আছে এমন মানুষই এটাকে কিভাবে দেখছেন? এক্ষেত্রে আমি বৃটেনের একজন পার্লামেন্ট সদস্যের বক্তব্য তুলে ধরতে চাই। তিনি সম্প্রতি তার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে এক বার্তা দেন, যা প্রেস টিভির অনলাইন ভার্সনে গত ২৩ জুলাই ২০১৪ প্রকাশিত হয়। ডেভিড ওয়ার্ড নামের লিবারেল ডেমোক্র্যাট (Liberal Democrat) দল থেকে নির্বাচিত ওই বৃটিশ এমপি লিখেছেন:    “The big question is - if I lived in Gaza would I fire a rocket? - probably yes,” অর্থাৎ “বড় প্রশ্ন হলো-যদি আমি গাজায় বসবাস করতাম তাহলে কি আমি রকেট (হামাসের মতো) নিক্ষেপ করতাম? সম্ভবত এর উত্তর হবে হ্যা”।

উল্লেখ্য, সবশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী সাম্প্রতিক ইসরাইলী আগ্রাসনে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৬৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া আরও প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ফিলিস্তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। ২৩ জুলাই ২০১৪,  জাতিসংঘ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, “গাজায় প্রতি ঘণ্টায় এক ফিলিস্তিনি শিশু ইসরাইলের আগ্রাসনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে”।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “74% of the victims are civilians, and one-third of the civilians killed so far are also children” অর্থাৎ- “ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ৭৪ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। হত্যাকান্ডের শিকার এই সাধারণ নাগরিকদের তিনভাগের একভাগই শিশু”।  

ইসরাইলের এই হত্যাযজ্ঞ ও তান্ডব সম্পর্কে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কাউন্সিলের প্রধান নাভি পিল্লাই বলেছেন, গাজার প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী যে কর্মকান্ড করেছে তা সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের শামিল (Israeli military's actions in the impoverished region could amount to war crimes)। নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক জরুরী অধিবেশনে বক্তৃতাকালে এমন মন্তব্য করেন।

অপরদিকে, সাম্প্রতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হামাসের ছোড়া রকেটে এ পর্যন্ত তেলআবিবসহ ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে মাত্র একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অথচ এই রকেট ছোড়াকেই ইসরাইল বিশ্ব মোড়লদের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন এটাই ইসরাইলের বর্বর বিমান হামলার চেয়েও মারাত্মক। যার বড় প্রমান জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের এমন বিবৃতি, “হামাসের বর্বর রকেট হামলা বন্ধ করতে হবে”। এমনকী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইসরাইলী নারকীয় বিমান হামলাকে সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে মন্তব্য করেছেন।

মূল কথা হচ্ছে-জন্ম থেকেই ইসরাইলের স্বভাব হচ্ছে তারা সমস্ত শক্তি দিয়ে নিষ্ঠুরতা ও আগ্রাসি তৎপরতা চালাবে তাদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিপক্ষকেই আবার ভিলেন হিসেবে উপস্থাপনের জন্য সব ধরনের মিথ্যাচার ও কুটচালের আশ্রয় নিবে। পাশাপাশি যেকোন উপায়ে বিশ্বের তাবত বড় বড় শক্তিকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে নিবে ইসরাইল।

ইহুদীদের এই জটিল কুটনীতি এখনও অনেকের কাছে অজানা থেকে গেলেও হিটলার ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন অন্তত ৮ দশক পূর্বেই। আর সে কারণেই ধীরে ধীরে ইহুদীদের প্রতি হিটলার এতটাই বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন যে ইহুদী নিধণ অভিযান চালিয়েছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে।

প্রথমদিকে হিটলার যে একদমই ইহুদী বিদ্বেষী ছিলেন না, তা তিনি নিজেই তার মাইন ক্যাম্পফ বইয়ের “Years of Study and Sufferings in Vienna” অর্থাৎ “অধ্যয়ন ও ভিয়েনায় যন্ত্রনাময় বছরগুলো”-এই অধ্যায়ে লিখেছেন: “I will not say that the manner in which I first became acquainted with it was particularly unpleasant for me. In the Jew I still saw only a man who was of a different religion, and therefore, on grounds of human tolerance, I was against the idea that he should be attacked because he had a different faith. And so I considered that the tone adapted by the anti-Semitic Press in Vienna was unworthy of the cultural traditions of a great people”.

অর্থাৎ-“প্রথমে আমি যেভাবে এই সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হই, তা খুব একটা অপ্রীতিকর ছিল এটা আমি বলতে চাই না। ইহুদীদের সম্পর্কে আমার অদ্যাবধি মনোভাব এই যে তারা অন্যধর্মী। আর তাইতো মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে শুধুমাত্র অন্যধর্মী হওয়ার কারণে ইহুদীদের ওপর আক্রমন করার বিপক্ষে ছিল আমার অবস্থান। ইহুদী বিদ্বেষী যে সংবাদপত্রগুলো ভিয়েনাতে প্রচলিত ছিল, তার আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।”

কিন্তু যতই সচেতনভাবে তৎকালীন সমাজ-ব্যবস্থা ও বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে থাকেন হিটলার, ততই ইহুদীদের একের পর এক অপকর্ম তার চোখের সামনে প্রতিভাত হতে থাকে। এমনকী বিশ্ব জনমতকে চালিত করার মতো তৎকালীন যেসব গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম ছিল, তার নিয়ন্ত্রনও ইহুদীদের হাতে ছিল (অদ্যবদী একই পরিস্থিতি বিরাজমান) এবং সেটাকে অত্যন্ত কুটকৌশলে ব্যবহার করতো ইহুদীরা। হিটলার তার মাইন ক্যাম্পফ বইয়ে আরও লিখেছেন:

“The deeper my soundings went the lesser grew my respect for that press which I formerly admired. Its style became still more repellent and I was forced to reject its ideas as entirely shallow and superficial. To claim that in the presentation of facts and views its attitude was impartial seemed to me to contain more falsehood than truth. The writers were-Jews”.

অর্থাৎ-“সংবাদপত্রটি (ওয়ার্ল্ড প্রেস) যতবেশি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে থাকলাম, ততই এর প্রতি আমার যে গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল তা হারাতে লাগলাম। নিজের প্রতিই অবাক হলাম কী করে এতদিন এই অসৎ সাংবাদিকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছি! ক্রমে সংবাদপত্রটার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মে গেল। আমি এমনটাই ভাবতে বাধ্য হলাম যে, এদের ধ্যান-ধারনাটাই আসলে ভাসা ভাসা এবং অগভীর। শুধু তাই নয় যে সংবাদগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে সবার কাছে তা সত্য ও নিরপেক্ষ বলে মনে হবে, তাতেও আমি দেখলাম সত্যের চেয়ে মিথ্যার পরিমানই বেশি। আর এর লেখকদের সবাই ছিল ইহুদী”।

বইয়ের একই অধ্যায়ে হিটলার লিখেছেন, “A cold shiver ran down my spine when I first ascertained that it was the same kind of cold-blooded, thick-skinned and shameless Jew who showed his consummate skill in conducting that revolting exploitation of the dregs of the big city. Then I became fired with wrath”.

অর্থাৎ-“এই সত্যটা প্রথম আবিস্কারের পর আমার মেরুদন্ড দিয়ে একটি হিম শীতল স্রোত বয়ে চলে। এই সেই ঠান্ডা মাথার গণ্ডারের চামড়াধারী নির্লজ্জ ইহুদীর দল, যারা ঘৃণ্য কৌশলে শহরের মানুষদের বিদ্রোহের চেষ্টাটাকে প্রতিনিয়তই প্রতারণা করে চলেছে। এই সত্য আবিস্কারের পরে সেই প্রেতাত্মাগুলোর প্রতি আমার মন ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠে”।

বইয়ের আরেকটু পরের দিকে হিটলার লিখেছেন, “I gradually discovered that the Social Democratic Press was predominantly controlled by Jews. But I did not attach special importance to this circumstance, for the same state of affairs existed also in other newspapers. But there was one striking fact in this connection. It was that there was not a single newspaper with which Jews were connected that could be spoken of as National”.

অর্থাৎ-“আমি ক্রমেই বুঝতে পারি যে সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক প্রেসও ইহুদীদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু অন্যান্য প্রেসগুলোরও যে একই অবস্থা, তা আগে বুঝতে পারিনি। সবচাইতে জ্বলন্ত সত্য হচ্ছে, একটা সংবাদপত্রও ছিল না, যাতে ইহুদীরা জড়িত ছিল এবং সেটাকে সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্র বলা যেতে পারে”।

এভাবেই যতই দিন গড়াতে থাকে ইহুদীদের প্রতি ক্রমে ক্রমে মন বিষয়ে উঠে হিটলারের। এমনকী এক পর্যায়ে হিটলারের কাছে খুব যৌক্তিকভাবেই মনে হতে থাকে এই গোষ্ঠীটাকে শেষ করতে না পারলে বিশ্ব থেকে অশান্তি দূর করা সম্ভব নয়। ধারাবাহিকের পঞ্চম পর্বে হিটলারের এই চিন্তার পক্ষে হিটলারেরই অভিমত তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

ঢাকা, ২৪ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি