‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ/এক সে আকাশ মায়ের কোলে/যেন রবি শশী দোলে/এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।’

আমরা তার কথা বলছি যিনি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬), আপাদমস্তক যিনি সৃজনশীল। যাঁরা এসেছেন তাঁর সংস্পর্শে, তাঁরাই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। মানুষের মনে তিনি ঢুকিয়ে দিয়েছেন অদম্য আশার বাণী।

প্রেমের কবি, বিদ্রোহের কবি,সাম্যের কবি, অসাম্প্রদায়িকতার কবি, মানবতার কবি নজরুলকে বোঝার জন্য কিংবা বোঝানোর জন্য উৎকৃষ্ট উদাহরণ তার সৃষ্টি অসংখ্য এমন চরণ।

বিদ্রোহী হয়ে ওঠা বা বিদ্রোহ প্রকাশের ধরন যে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে উৎক্ষিপ্ত। মানবসত্তা বিকাশের জয়গান মূলত যে কোনো বিদ্রোহী সুরের সঙ্গেই একাট্টা হয়ে অনুরণিত হয় ব্যক্তিমানসে।

এই মহান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট)।

১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ৭৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান। যে দিনটিতে তিনি চলে গিয়েছিলেন সেদিন খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে তারিখটি ছিল ২৯ আগস্ট। কিন্তু বাংলাদেশে বাংলা পঞ্জিকার তারিখগুলো স্থির হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমরা ২৭ আগস্টকেই তাঁর মৃত্যুদিন হিসেবে মানি।

শিল্পী জীবনের সীমিত পরিসরে নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার মূল্যায়ন সময়সাপেক্ষ, তা সন্দেহাতীত। তবে এ কথা বলা যায় প্রেম-দ্রোহ যার মনে-মননে এবং কবিতায় ফুটে উঠতে পারে একই হাতে সে কবি মহাকবি না হয়ে কী পারেন!

কাজী নজরুল ইসলাম তার সময়কে ভেদ করে এগিয়েছেন। যেটুকু কাব্য ও সাহিত্য চর্চার সময় তিনি পেয়েছেন ব্যক্তি জীবনে; কাজ করে গেছেন সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার জন্যই।

গাহি সাম্যের গান-, যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান। এটি নজরুলে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিচ্ছবি।

নজরুলের মানবসত্ত‍া এবং তার বিদ্রোহ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেউ কেউ নজরুলকে বহুবিধ বিশ্লেষণে ভূষিত করেছেন। যার মধ্যে বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি, মানবতার মুক্তিদূত এবং সর্বতোভাবে প্রেমের কবি অন্যতম।

প্রেমের ক্ষেত্রে নজরুলের এই যে দ্বিমুখী বিদ্রোহ এটা তার বিদ্রোহী চেতনাকে প্রাণবন্ত করার আরেকটি দিক। মূলত নজরুল বিদ্রোহ করেছেন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে।

শোষিত, নির্যাতিত, বঞ্চিত, অবহেলিত সর্বোপরি দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের জয়গান তিনি করেছেন সোচ্চারকণ্ঠে। যার কারণে তাকে সাম্যের কবি, মানবতার কবি বলা হয়।

নজরুলের সাহিত্য রচনার কাল ১৯১৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত (বাংলা ১৩২৬ থেকে ১৩৪৯)। কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে দুখু মিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালে। বেড়ে ওঠা চমর দরিদ্রতার মধ্যে।

বিশ শতকের প্রথম চার দশকের মধ্যেই নজরুলের মানস গঠন ও বিকাশ। তার সাহিত্যে তাই প্রতিফলিত হয়েছে প্রথম মহাযুদ্ধের নানা দিক। যুদ্ধের উত্তেজনাকে তিনি অনুভব করেছিলেন ভীষণভাবে।

স্বপ্ন দেখেছিলেন নবজাগরণের। নজরুল নিয়ে গবেষণার কাজ করা ড. রিটা আশরাফ তার বইয়ে লিখেছেন, এ সময়ে নজরুলের দৃষ্টিপথে ঊদিত হয়েছে ১৯০৫ সালে আয়ারল্যান্ডের ‘সিনফিন’ আন্দোলন উদ্ভূত প্রবল গণ-উত্থান।

নজরুল ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করে লিখেছেন ‘ভায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’ প্রবন্ধ।

১৯২০ সালের খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলন ও রুশ বলশেভিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পটভূমিতে রচিত হয়েছে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস।

নজরুল একই সঙ্গে আলোড়িত হন মোস্তফা কামাল পাশার দ্বারা। কেননা তুরস্কই প্রথম মুসলিমপ্রধান দেশ, যে দেশ থেকে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ, পর্দাপ্রথা বিলোপ ও মোল্লাতন্ত্র দূরীভূত হয়েছিল।

আর এসব কিছুর উদ্যোক্তা ছিলেন মোস্তফা কামাল পাশা। তার স্মরণেই রচনা করেছেন ‘কামাল পাশা’ কবিতা। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছিল ব্রিটিশদের প্রতি বিপ্লবীদের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। এটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল।

এতে সক্রিয় ছিলেন বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্যসেন। নারী বিপ্লবী প্রীতিলতাও ধরা পড়ে গিয়ে সায়ানাইড মুখে দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এ সময় রচিত হয় নজরুলের ‘কুহেলিকা’ উপন্যাস।

শৈশবে নজরুলকে স্বপ্নময় কোনো পৃথিবী তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল কী না তা জানা যায় না। প্রকৃতির কোলে স্বাভাবিক নিয়মেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি।

সেখানে চাঁদ, সূর্য, আকাশ, বাতাস, মাটি, বৃক্ষ-লতাসহ অবারিত প্রকৃতিকে নিজের করে পেয়েছেন। বলা যায়, সরাসরি প্রকৃতির কাছ থেকেই জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছেন তিনি।

আর এর মধ্যেই, সেই কচি বয়সেই কখন যে তিনি জড়িয়ে গেলেন জীবনের কঠোর-কঠিন জটাজালে, তা নিজেও জানেন না। মক্তবে পড়া শেষে সেখানেই আবার খুদে শিক্ষক হন (১৯০৮)।

এর কয়দিন পর হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেমের কাজ করেন। তারপর করেন মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাজ। এরপর যোগ দেন লেটোর দলে। গ্রাম্য কবিয়ালদের সঙ্গে কবিগানের আসরে নিজের প্রতিভার দ্যুতি ছড়ান।

পরে জড়িয়ে যান যাত্রাদলের সঙ্গে। যাত্রা ও পালা রচনায় ঈর্ষণীয় ক্ষমতার পরিচয় দেন ওই বয়সেই। হঠাৎ করেই তার জীবনের এ অধ্যায়ের সমাপ্তি সূচিত হয়। কবি ফিরে আসেন স্কুলে। কিন্তু কয়দিন মাত্র!

আবার গিয়ে যোগ দেন এক কবিয়ালের দলে। তবে সরে গেলেন সেখান থেকেও। এক রেলওয়ে গার্ডের বাসায় কিছু দিন খানসামার কাজ করলেন। এবার গিয়ে কাজ নেন আসানসোলের এক রুটির দোকানে। রুটি বানানোর কাজ। মোটেই কোনো মর্যাদাজনক কাজ নয়।

কিন্তু তা তার কাছে কোনো বিষয় ছিল না। জানাজানি হয়ে গেলো, এ বালকটি কোনো সাধারণ ছেলে নয়। একদিন চোখে পড়ে গেলেন দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ। তিনি তাকে নিয়ে গেলেন নিজের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুরে (১৯১৪)।

সেখানে আবার স্কুলে দিলেন নজরুলকে। নিজের মেধা দিয়ে শিক্ষকদের চমৎকৃত করেন তিনি। চুরুলিয়া ও দরিরামপুরের প্রকৃতি-পরিবেশ পৃথক।

নিজ এলাকা বর্ধমানের লাল মাটির রুক্ষ পরিবেশ ও গাছপালার ফিকে সবুজের বদলে দরিরামপুর তথা ময়মনসিংহের নরম-সরস মাটি এবং গাঢ় সবুজ-শ্যামলিমা নজরুলের চোখে মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে দিয়েছিল।

বছরখানেকের কিছু বেশি সময় ছিলেন সেখানে। তারপর উড়াল দিলেন। তিনি আর কখনো দরিরামপুরে পা রাখেননি, কিন্তু মধুর স্মৃতি বোধহয় সারা জীবনই তাকে ঘিরে ছিল।

এরপর নিজ গ্রামে ফিরে গেলেন নজরুল। সেখোনে এক পরিচিত লোকের সহায়তায় ভর্তি হলেন রাণীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে। সেখানে ভালো ছাত্র হিসেবে আবার তার কদর জুটলো। রানীগঞ্জে এসে তিনি বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে (পরবর্তীকালে প্রখ্যাত লেখক ও চলচ্চিত্রকার)।

প্রবেশিকা পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে নিয়তির সচল চাকা এবার তাকে ঠেলে নিয়ে গেল আরেক জগতে। সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন নজরুল (১৯১৭)। কেন, তার সঠিক ব্যাখ্যা নেই।

হতে পারে দারিদ্র্য আর ভ্রাম্যমাণ জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন তিনি। পড়াশোনা তাকে আর ধরে রাখতে পারছিল না। হতে পারে অজানা জীবন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।

এও হতে পারে যে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাঙালি তরুণ-যুবকদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য সরকারি উদ্যোগে যে ব্যাপক প্রচারণা চলছিল তাতে আকৃষ্ট হয়েই তিনি সেনা দলে নাম লেখান।

সৈনিক জীবন তাকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এটি ছিল তার জীবনের অন্যতম একটি দিক। তবে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর নজরুল সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

এরপর নবযুগে সাংবাদিকতার পাশাপাশি বেতারে কাজ করেছেন নজরুল। এ সময় তার সৃষ্টিকর্ম আরও বেশি বিস্তৃত হয়। এমতাবস্থায় ১৯৪২ সালে কবি নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হারিয়ে ফেলেন বাকশক্তি। তবে তার অসুস্থতার বিষয় সুস্পষ্টরূপে জানা যায় ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে। এরপর তাকে মূলত হোমিওপ্যাথি এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করানো হয়।

কিন্তু এতে তার অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কবি নিভৃতে ছিলেন। ১৯৫২ সালে কবি ও কবিপত্নীকে রাঁচির এক মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল নজরুলের আরোগ্যের জন্য গঠিত একটি সংগঠন যার নাম ছিল নজরুল চিকিৎসা কমিটি। এছাড়া তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি সহযোগিতা করেছিলেন। চার মাস রাঁচিতে ছিলেন কবি।

নজরুল নিভৃতে থাকলেও তার কবিতা ও গান আমাদের মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে তথা মুক্তি সংগ্রামে ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় লাভের পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) তাকে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়।

একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ওই বছরই ২৯ আগস্ট নজরুল মৃত্যুবরণ করেন। চলে যান পৃথিবী ছেড়ে।

নজরুল লিখেছিলেন ‘মসজিদেরই কাছে আমায় কবর দিয়ো ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই...’ সেই ইচ্ছে পূরণে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অন্তিমশয়নে সমাহিত করা হয়।

কবির এ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচি নিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, আবৃত্তি ও আলোচনা সভা।

নজরুল ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে সকাল সাতটায় কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হবে। বিকেল চারটায় নজরুল ইনস্টিটিউট শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করেছে আলোচনা সভা, নজরুল পুরস্কার প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে বাদ ফজর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সকাল সাতটায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জমায়েত, সেখান থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে কবির কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ।

সকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল আলাদাভাবে কবির কবরে শ্রদ্ধা জানাবে। বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন ও বিশ্ব কবিতা কংগ্রেস শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। তিন দিনের কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।

এমকে