আপনার চোখ দুটি বন্ধ করুন এবং কল্পনায় একটি শিশুকে চিন্তা করুন, যে আপনার খুব প্রিয়। শিশুটি হতে পারে আপনার নিজের পুত্র বা কন্যা, হতে পারে ভাই বা বোন, ভাই বা বোনের সন্তান, হতে পারে নাতি অথবা আপনার বন্ধুর সন্তান। এবার কল্পনায় আনুন ওই শিশুটি সুন্দরভাবে খেলা করছে।

এবার কল্পনা করুন- একটি বোমা আপনার ওই প্রিয় শিশুটির ছোট্ট শরীরের ওপর এসে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে শিশুটির দেহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে চারপাশে উড়ে গেল। যদি আপনি এই দৃশ্যটি কল্পনা করতে না চান তাহলে বুঝা যাবে আপনার মধ্যে মানবীয় বোধ রয়েছে।

তবে, আপনার মনের এই কল্পনাটি ফিলিস্তিনের মানুষজনের জন্যে কিন্তু কাল্পনিক নয়; সেখানকার নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য এটি।

ডিকশনারিতে গণহত্যার অর্থ করা হয়েছে এভাবে- 'কোন একটি জাতি বা গোষ্ঠী বা দলের লোককে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হত্যা করা'। আমরা দেখতে পাব গত প্রায় এক মাস ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলি সেনাবাহিনী হত্যা করেছে প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনিকে, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এদের মধ্যে ৪০০'র বেশি শিশু।

১২ জুলাই, ২০১৪ গাজার বেইত লাহিয়াতে অবস্থিত শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গদের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে বোমা নিক্ষেপ করে ইসরাইল। এতে দুজন বিকলাঙ্গ নারী নিহত হন; যারা নিজেদেরকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে অক্ষম ছিলেন, এমনকি সময় থাকলেও তারা তা পারতেন না।

১৬ জুলাই গাজার সমুদ্রতীরে ফুটবল খেলার সময় ৪ শিশুর ওপর বোমা নিক্ষেপ করা হয়; ওই শিশুরা যেকোন রকম অবকাঠামো থেকে অনেক দূরে খোলা আকাশের নিচে খেলা করছিল। এনবিসি নিউজের গাজা রিপোর্টার আইমান মোহিয়েলদিন এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।

গাজার বহু হাসপাতালে বোমা নিক্ষেপ করেছে ইসরাইল। এমনকি ভবনের ছাদে খেলার সময় শিশুদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি ঈদুল ফিতরের দিন ইসরাইল ১০ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে; এদের মধ্যে ৮ জনই শিশু, যারা মাঠে খেলছিল।

মার্কিন ট্যাক্সদাতারা ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে অর্থায়ন করে যাচ্ছেন, যে বাহিনী ঠান্ডা মাথায় অগণিত মানুষকে খুন করে যাচ্ছে। এমনকি জাতিসংঘ পরিচালিত আশ্রয় শিবিরেও বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। এসব আশ্রয় শিবিরে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, আর যাই হোক জাতিসংঘের চোখের সামনে অন্তত তারা হামলার শিকার হবেন না।

গত ৩০ জুলাই এ ধরনের হামলার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে। এই হামলার পর প্রথমবারের মতো নিন্দা জানায় হোয়াইট হাউস। জাতিসংঘ পরিচালিত ওই আশ্রয় শিবিরে ৩ হাজারেরও বেশি লোক আশ্রয় নিয়েছিলেন। এসব লোকের অনেকেরই বাড়িঘর বোমা হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ-এর জেনারেল কমিশনার পিয়েরে ক্রাহেনবুল জানিয়েছেন, ৩০ তারিখের ওই হামলার আগে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে ১৭ বার যোগাযোগ করে আশ্রয়শিবিরের অবস্থান জানানো হয়। হামলার এক ঘণ্টা আগেও ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সংস্থার কর্মকর্তারা। কিন্তু এরপরও আশ্রয়শিবিরে হামলা করে ইসরাইল। এতে ১৬ জন নিহত ও কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি আহত হন। হতাহতদের অনেকেই নারী ও শিশু।

ঘটনাস্থল থেকে ইউএনআরডব্লিউ-এর মুখপাত্র ক্রিস গানেস টেলিভিশনে হামলার বিবরণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ৩০ তারিখের আগেও ২৪ জুলাই এরকমই জাতিসংঘের আরেকটি আশ্রয়শিবিরে ইসরাইলি বোমা হামলায় ১৩ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হন। ২৪ তারিখের হামলাটিই প্রথম নয়; এর আগেও এরকম তিনটি হামলা চালায় ইসরাইল।

২৪ তারিখের ওই হামলার খবর পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন মিডিয়ায় প্রচারিত হয়নি। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে এই দৃশ্য সরাসরি দেখানো হয়েছে। ওদিন মার্কিন কর্তৃপক্ষ ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছে। তারা ইসরাইলের দাবির সাথে একমত হয়ে বলেন যে, হামাস তার রকেটের সংগ্রহ জনবহুল এলাকায় মজুদ করে রেখেছে, যাতে করে বেসামরিক লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

মানবতার শত্রু ইসরাইল প্রধান দোসর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও বলে, ইসরাইল কেবলমাত্র হামাস যোদ্ধা ও তাদের এসব রকেট ধ্বংস করার জন্য ওসব এলাকায় হামলা চালায়। আর এর ফলেই ঝুঁকির মুখে পড়ে বেসামরিক জনগণ। আর পশ্চিমা মিডিয়াগুলোও এ তথ্য ফলাও করে প্রচার করে।

পশ্চিমা মিডিয়া যে ইসরাইলের শিখিয়ে দেয়া বুলিই ফলাও করে প্রচার করেছে এর প্রথম প্রমাণ হলো- যেদিন প্রচার করা হলো যে বেসামরিক লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে হামাস, সেদিন গাজায় পশ্চিমা ওইসব মিডিয়ার কোন রিপোর্টার ছিল না। অন্যদিকে, বিবিসি'র মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বাওয়েন গাজা থেকে রিপোর্ট করেন যে, মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সত্য নয়।

দ্বিতীয় প্রমাণ হলো- জাতিসংঘ পরিচালিত আশ্রয়শিবিরে নিরীহ বেসামরিক লোকজনের ওপর বারবার হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। যদিও ওইসব আশ্রয় শিবিরের ব্যাপারে জাতিসংঘ ইসরাইলি বাহিনীকে বারবার সতর্ক করেছে। এ ছাড়া, সমুদ্রতীরে খোলা আকাশের নিচে ও খোলা মাঠে যেখানে কোন অবকাঠামো বা ভবন নেই সেখানেও খেলারত শিশুদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়েছে।

তৃতীয়ত, ইসরাইল দাবি করেছিল গাজায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরতরা বহিরাগত। কিন্তু এটা একেবারেই মিথ্যা। হামাস, ইসলামিক জিহাদ, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি), আল-আকসা ব্রিগেডসহ অন্যান্য প্রতিরোধ গ্রুপগুলোর যোদ্ধারা সবাই গাজার অধিবাসী। এর মানে তারা তাদের পরিবার নিয়েই গাজায় থাকেন। গাজাতেই রয়েছে তাদের জীবিকার সংস্থান, দোকানপাট, ব্যবসা, স্কুল, কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়।

কোন ব্যক্তি কী নিরপেক্ষ মনে এটা বিশ্বাস করতে পারবেন যে, তারা তাদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী ও প্রিয়জনদেরকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে? তারা সেখানে তাদের অস্ত্রশস্ত্র মওজুদ করে রেখেছে? একটু চোখ খুললেই ইসরাইলের এই মিথ্যাচারটি ধরা পড়বে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, হামাস ও অন্যান্য গ্রুপগুলো বেসামরিক লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, ইসরাইলের অবশ্যই উচিত ছিল সেখানকার বেসামরিক লোকজনের ওপর আক্রমণ না করা।

যুদ্ধের নীতিগত দিক থেকে গাজার প্রতিরোধ বাহিনী তাদের সঠিক অবস্থানে ছিল। ইসরাইলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তাদের ৬৩ সেনা ও ৩ বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও সাড়ে নয় হাজারেরও বেশি আহত হয়েছেন।

অপরদিকে, গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হামলায় ইসরাইলের পক্ষে নিহতদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ বেসামরিক নাগরিক। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্যমতে, ইসরাইলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের কমপক্ষে ৬৪ শতাংশই বেসামরিক। আর খোদ জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই সংখ্যা ৮০ শতাংশেরও বেশি। এর মানে, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবেই বেসামরিক ফিলিস্তিনিদেরকে হত্যা করেছে।

তবে, ইসরাইলের বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পিছনে তারা নিঃসন্দেহে যুক্তি দেখাবে, হামাসের ছোঁড়া রকেট আয়রন ডোমের কারণে ক্ষতি করতে পারেনি। তা না হলে ইসরাইলেও ব্যাপক বেসামরিক লোকের প্রাণহানি হতো। কিন্তু ইসরাইলের এই দাবিটিও যে ভূয়া হবে, তা বুঝা যাবে ইসরাইলেরই সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা দেবকাফাইলের ওয়েবসাইটের একটি তথ্য থেকে।

২৩ তারিখে 'আইডিএফ কমান্ডার্স: টাইম ফর ডিসিসিভ ওয়ার মুভ আফটার আইডিএফ ভিকটরিজ ইন শেজাইয়া, ই. রাফাহ এন্ড খান ইউনিস' শিরোনামের ওই লেখায় বলা হয়েছে- "গত ১৬ দিনে গাজা থেকে প্রায় ২,০০০ রকেট ছোঁড়া হয়েছে ইসরাইলে। যদিও ইসরাইলের আয়রন ডোমে এসব রকেটের অনেকগুলোই প্রতিরোধ করা গেছে, তার মানে এই নয় যে রকেট ইসরাইলের মাটিতে আঘাত হানেনি। হামাস ইসরাইলের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বিমান বাহিনীর ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে। এর মানে ইসরাইলেরই গোয়েন্দা সংস্থা স্বীকার করে নিয়েছে, হামাস সুচিন্তিভাবে ইসরাইলের বেসামরিক স্থাপনা ও জনগণের ওপর রকেট হামলা করেনি।

এ ছাড়া, ইসরাইলের বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটে যেসব মন্তব্য ও শ্লোগান রয়েছে তা থেকেও বুঝা যায় ইসরাইলের লক্ষ্য শুধু হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধারাই না; বরং সামরিক-বেসামরিক সমস্ত ফিলিস্তিনিরাই। সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর শ্লোগানের মধ্যে রয়েছে- 'গাজায় কোন বেসামরিক লোক নেই', 'ইসরাইলের নির্বোধ নেতৃত্ব, স্থলবাহিনীর কোন প্রয়োজন নেই, গাজাকে সমান করে দাও', 'দুই রাষ্ট্রের প্রস্তাবের সুরাহা হোক: একটি জীবিত (ইহুদি) আরেকটি মৃত (আরব)। এখন সময় এসেছে জীবিত ও মৃতের এই দুই জাতি গঠনের'।

শুধু গাজার নিরীহ জনগণই নয়; ইসরায়েলি নৃশংসতার শিকার হয়েছেন অন্যান্য দেশের নাগরিকেরাও। ২০০৩ সালে মার্কিন মানবাধিকার কর্মী রাসেল কোরেয়াকে বুলডোজার দিয়ে পিস্ট করে দেয় ইসরাইলি বাহিনী। একই বছর ব্রিটিশ কর্মী টমাস হার্নডালকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে ইসরাইলি বাহিনী; একই বছরে আরেক মার্কিন কর্মী ব্রায়ান অ্যাভেরিকে মুখে গুলি করে হত্যা করে।

২০১০ সালে গাজায় ত্রাণ নিয়ে যাওয়া তুরস্কের ১০ ত্রাণকর্মীকে হত্যা করে ইসরাইল। ১৯৬৭ সালে মার্কিন জাহাজ ইউএসএস লিবার্টিতে ইসরাইল হামলা চালালে ৩৪ জন মার্কিন নাবিক নিহত ও ১৭০ জন আহত হন। এসবই হচ্ছে ইসরাইলের নৃশংসতার চিত্র।

সূত্র: দ্যা প্যালেস্টাইন ক্রুনিকল (ইংরেজি থেকে অনূদিত ও সম্পাদিত, মূল লেখক: রিফাত আউদেহ)

ঢাকা, ৮ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএমএ, কেবি