সোলাইমান নিলয়। সবাই তাকে নিলয় বলেই ডাকেন। অনেকে আবার নিল বলেও ডাকেন। বয়স সবেমাত্র দশের কোটায় প্রবেশ করেছে। মায়ের সঙ্গে কারওয়ান বাজার এলাকার বস্তিতে তার বাস।
স্কুলের পথে কিছু দিন যাতায়াত থাকলেও সেটা স্থায়ী হয়নি। ইচ্ছে না থাকলেও যোগ দিতে হয়েছে কাজে। দু'বেলা খাবারের পাশাপাশি মাস শেষে জোটে কয়েকশ' টাকা। এ নিয়েই চলছে জীবন সংগ্রাম।
মাকে সহযোগিতা না করতে পারলে নিজের পেটেও ভাত জোটে না। তাই রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় ফুটপাতের একটি খাবার হোটেলে কাজ করছে নিলয়। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি তাকে খাবার টেবিলে পানি সরবরাহ করতে হয়।
শুধু নিলয় নয়, এরকম অসংখ্যা শিশু রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে আছে শ্রমিক হিসেবে। এমনকি এর চেয়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও শ্রম দিতে হচ্ছে এসব শিশুকে। শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের অনেকে পরিচিত হয় টোকাই, ছিন্নমূল কিংবা পথশিশু নামে। নেই তাদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ২০১৫ সাল নাগাদ দেশের ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলো থেকে শিশুশ্রম শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনও ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে শিশুশ্রমিক রয়েছে এবং সম্ভবত সংখ্যাটা আরও বেড়েছে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৩৫ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। শিশু শ্রমিক নিয়ে দেশে আইন থাকলেও কমেনি ঝুঁকি। বন্ধ হয়নি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম। এখনও শিশু ঘরে ও বাইরে কলকারখানা, ওয়ার্কশপ, রেস্তোরাঁ, মোটর গ্যারেজ, বাস ও টেম্পো, নির্মাণকাজ, চা বাগান, ট্যানারি, প্লাস্টিক কারখানা, কৃষি ও গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে।
সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগের এক হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমিকের ১২ শতাংশই শিশু শ্রমিক। কম মজুরি, মাত্রাতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে দেশের শিশু শ্রম পরিস্থিতি। শিশুরা এসব কাজে নিয়োজিত থেকে অনেক সময়ই শুধু জীবন ধারণের খোরাকি পেয়ে থাকে।
এই শিশুশ্রম প্রতিরোধ করতে না পারলেও সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর ঘটা করে পালন করা হচ্ছে বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস। ১৯৯৯ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ‘শিশু শ্রম নিরসন সনদ ১৮২’গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর ১২ জুন বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
এবার দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- ‘শিশু শ্রমকে না বলুন, মানসম্মত শিক্ষাকে হ্যাঁ বলুন।' দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সরকারি ও শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ ৮০টি দেশ এ দিবসটি পালন করছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ছয় জন শিশুর মধ্যে একজন শ্রমিক এবং প্রতি তিন শিশু শ্রমিকের মধ্যে দুইজনই গৃহকর্মের সাথে যুক্ত।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই গৃহকর্মী এ সকল শিশুদের সুরক্ষায় তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। আইএলও’র হিসাবে সারা বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি ৬০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করছে।তার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে ১৮ কোটি।আইএলও’র হিসাবে যে সংখ্যা দেয়া হয়, বাস্তবে তার সংখ্যা আরও বেশি।
তবে এতো কিছুর পরেও বহুল আলোচিত শিশু শ্রম এখনো আগের আবস্থায়-ই আছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী একটি শিশুকেও তার জীবিকা নির্বাহের জন্য কোন প্রকার শ্রমে নিয়োজিত করার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে শিশুরা শ্রমে জড়িত হয়ে থাকে।
তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় বয়সের বিভিন্নতার কারণে শিশুদের শ্রম থেকে নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের শহর, নগর বন্দরের বিভিন্ন কল-কারখানা, বাসাবাড়িতে শিশুদের কম মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়।
বাংলাদেশে পরিচালিত অধিকাংশ কার্যক্রমই দুর্বল মনিটরিং-এর কারণে ব্যর্থ হয়৷ তথাপিও সরকারসহ সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা শিশুশ্রমের মতো অমানবিক ক্ষেত্র থেকে শিশুদের পরিত্রাণে যৌথ উদ্যোগ নিতে পারে, গড়ে তুলতে পারে পর্যাপ্ত সচেতনতা ৷
শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন বলছে, শিশুশ্রমের এখনকার প্রবণতার উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো শহরমুখীতার কারণে শিশুরা গ্রামাঞ্চল থেকে শহরের দিকে কেউ পরিবারসহ কেউবা পরিবার ছাড়াই শহরে আসছে।
ওই প্রকল্প সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রধাণত অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে। যেহেতু কোন হালনাগাদ তথ্য নেই, সর্বশেষ জাতীয় জরিপটি হয়েছিল ২০০৩ সালে। শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। কিন্তু এটি চলমান রয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন বলছেন, সাধারণত দেখা যাচ্ছে শিশুরা যেসব জায়গায় থাকে বস্তি এলাকা বা নিম্ন আয়ের মানুষেরা যেখানে থাকে তার আশেপাশের জায়গার অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজগুলোতে তারা যুক্ত হচ্ছে। যেমন-ওয়েল্ডিং, মোটর গ্যারেজ, মোল্ডিংয়ের কাজ এ ধরনের কাজগুলোতে শিশুরা বেশি যুক্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেছেন, এ বিষয়ে আইনী কাঠামোয় অনেক অগ্রগতি হয়েছে, এখন সুষ্পষ্ট নীতিমালা আছে। কিন্তু এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোন কর্মপরিকল্পনা নেই। যেসব শিশুরা কাজে আসার ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন আবদুল্লাহ আল মামুন।
এআর





