হিমালয়ের পাদদেশ থেকে যে নদীগুলো বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে ধাবিত হয়েছে তার বেশির ভাগই এসেছে ভারতের ভেতর দিয়ে। আর ভারত প্রায় সব নদীতেই বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে দিন দিন মরু অঞ্চলে রূপান্তর করছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি মরণ বাঁধের নাম ফারাক্কা। কোলকাতা বন্দরকে পলির হাত থেকে রক্ষা করার অজুহাতে এটি নির্মাণ করেছে ভারত। বাংলাদেশ তথা উত্তরাঞ্চলের গলার ফাঁস। যার নাম শুনলেই মরা পদ্মা ডুকরে মাথা কুটে মরে বিস্তীর্ণ বালিগর্ভে। এক কালের প্রমত্তা পদ্মা এখন মরুভূমি।

ফারাক্কা বাঁধ মূলত একটি বহুমূখী ব্রীজ, সেই সাথে ড্যাম। যার অবস্থান ২৮.৮০ডিগ্রী উত্তর ও ৮৭.৯৩ পূর্ব। বাংলাদেশের রাজশাহী-চাঁপাই নবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে মাত্র ১১ মাইল (১৮ কিলোমিটার) ভিতরে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর গ্রামের ফারাক্কা নামক স্থানে ভারত ১২৪৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২৩ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন এই অভিশপ্ত বাঁধ ১৫৬ কোটি রূপী ব্যয়ে ১৯৭৪ সালে নির্মাণ করে। ফারাক্কা বাঁধের দৈঘ্য ২২৪৫মিটার ও ১২৩টি গেইট যার মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

গঙ্গা নদীর উপরে দেয়া এ বাঁধটি চালু হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এ সম্পর্কে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন, যা ‘মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি’ নামে পরিচিত। মুজিব-ইন্দিরা যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে। সেজন্য ভারত প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করবে।

যুক্ত ইশতেহারের এই সিদ্ধান্ত অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। ভারত বাংলাদেশের কাছে এ মর্মে ওয়াদা করেছিল যে, ৪১ দিনের নির্ধারিত সময়ে ভারত ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি ফিডার ক্যানেল দিয়ে হুগলী নদীতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ৪১ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোন সমঝোতা বা চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি নিজ দেশের অভ্যন্তরে প্রত্যাহার করে।

বিয়টি এর আগে প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর। তখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গ্রীষ্মকালে গঙা নদী হতে বিপুল পরিমাণ পানি পশ্চিমবঙ্গের ভাগরথি নদী পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অপসারণ করার ভারতীয় পরিকল্পনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভারত জবাব দেয় তাদের এই পরিকল্পনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং এর ফলাফল সম্পর্কে পাকিস্তানি উদ্যেগ শুধু মাত্র তত্ত্বীয় ব্যাপার। সেই থেকে গঙার পানি বন্টন নিয়ে লম্বা আলাপ-আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক আলোচনা করে। কিন্তু এই আলোচনা যখন চলছিল তখন ভারত ফারাক্কা বাঁধের নির্মান কাজ অব্যহত রাখে এবং ১৯৭০ সালে এর কাজ সমাপ্ত করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর গঙার পানি বন্টন নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করে। ১৬ মে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা এক যৌথ ঘোষণার বলেন যে,গঙায় কম পানি প্রবাহের কালে সঠিক পানি বন্টন নিয়ে তারা একটা চুক্তি করবে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের এক সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয় দেশ একটি চুক্তিতে আসার আগে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করবে না।

যদিও বাঁধের একটি অংশ পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ সালে দশ (২১ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে ২১ মে ১৯৭৫) দিনের জন্য ভারতকে গঙা হতে ৩১০-৪৫০ কিউসেক পানি অপসারণ করার অনুমতি দেয়। কিন্তু ভারত ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত গঙা নদী হতে ১১৩০ কিউসেক পানি অপসারণ করে পশ্চিমবঙের ভাগরথি-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে।

ভারতকে পানি অপসারণে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়ে, বাংলাদেশ এই বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করে। ২৬ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ভারতকে বাংলাদেশের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়টির সুরাহার করার নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। কয়েকবার বৈঠকের পর উভয় দেশ ৫ নভেম্বর ১৯৭৭ সালে একটি চুক্তি করে।

চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও ভারত পরবর্তি পাঁচ বছরের (১৯৭৮-৮২) জন্য শুষ্ক মৌসুমে গঙার পানি ভাগ করে নেবে। ১৯৮২ এর অক্টোবরে উভয় দেশ ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে পানি বন্টনের একটি চুক্তি করে। নভেম্বর ১৯৮৫ সালে আরও তিন (১৯৮৬-৮৮) বছরের জন্য পানি বন্টনের চুক্তি হয়। কিন্তু একটি দীর্ঘ চুক্তির অভাবে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য গঙার পানি ব্যবহারে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

কোনো চুক্তি না থাকায় ১৯৮৯ সালের শুষ্ক মৌসুম থেকে ভারত একতরফা প্রচুর পরিমাণ পানি গঙা থেকে সরিয়ে নেয়, ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশর নদ-নদীতে পানি প্রবাহের চরম অবনতি ঘটে। ১৯৯২ সালের মে মাসে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারত বাংলাদেশকে সমান পরিমাণ পানি দেবার ব্যাপারে সম্ভাব্য সকল কিছু করবে। ফলে এরপর দুই দেশের মধ্য কোন মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয় নাই।

১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রীজ অঞ্চলে মাত্র ২৬১ কিউসেক পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়, যেখানে ফারাক্কা-পূর্ব সময়ে একই অঞ্চনে ১৯৮০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হত। ১৯৯৩ সালের মে মাসে যখন উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আবার মিলিত হন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশেকে দেওয়া তার কথা রাখতে ব্যর্থ হন। অবশেষে, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গঙার পানি বন্টন চুক্তি" সই করেন কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী কখনই ভারত পানি সরবরাহ করছে না।
১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ফারাক্কার পানি বণ্টন সম্পর্কিত ‘ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি’ সম্পাদিত হয়। ১৯৭৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদী পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা ছিল (১) ফারাক্কা পয়েন্টে শুকনা মওসুমে বাংলাদেশ শতকরা ৬০ ভাগ পানি পাবে। (২) ২১ শে এপ্রিল থেকে শুকনা মওসুমে প্রতি দশদিনের সার্কেলে বাংলাদেশ পাবে ৩৪ হাজার ৫শ’ কিউসেক পানি এবং ভারত পাবে ২০ হাজার ৫শ’ কিউসেক পানি। (৩) বাংলাদেশ তার নির্ধারিত হিস্যার শতকরা ৮০ ভাগের নীচে কখনোই পাবে না। ১৯৮২ সালের অক্টোবরে দু’বছর মেয়াদী ও ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে তিন বছর মেয়াদী (১৯৮৬-৮৮) সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়।

এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী একটি পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারী থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি ভাগাভাগি হবে এবং ভারত নদীটির পানি প্রবাহের মাত্রা গত ৪০ বছরের গড় মাত্রায় বজায় রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। যেকোন সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা পাবে। কিন্তু ভারত কখনোই এ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানি দেয়নি।

আজ ১৬ মে। ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের এই দিনে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে মরণ বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে হাজার হাজার জনতার লংমার্চ হয়। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে এই দিন বাংলার সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকন্ঠ দিল্লির মসনদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। যার প্রকম্পন উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে যায়। আজো এই দিনটি শোষণ, বৈষম্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও দাবী আদায়ের পক্ষে বঞ্চিতজনের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে আয়োজিত ফারাক্কা লং মার্চ দিবস সেই আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে আজো বাঙালীকে সোচ্চার হতে আহবান জানাচ্ছে। গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বণ্টনের ন্যায্য হিস্যার দাবীতে এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় পালন করার মাধ্যমে মওলানা ভাসানীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি ছিল। তা না হলেও স্বল্প পরিসরে দেশপ্রেমিক জনতা এই দিনটিকে স্মরণ করে ভারতের পানিসহ বিভিন্ন আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে প্রতি বছর।

ইতিহাস বলে, ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল মাওলানা আব্দুল হামীদ খান ভাসানী ফারাক্কা সমস্যা সমাধানের জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে পত্র লিখেন। ১৯৭৬-এর ৪ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভাসানীকে লিখিত পত্রে ফারাক্কা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন কথা না বলায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৬ মে মাওলানার নেতৃত্বে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয়। ওইদিন রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে লং মার্চের যাত্রা শুরু হয়। যা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়।

দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে মানুষে মানুষে ভরে যায় রাজশাহীর রাজপথ। ভারত বিরোধী নানা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয় জনপদ। বেলা ২টার সময় হাজার হাজার মানুষের স্রোত গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে পৌঁছায়।

সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে রাত্রি যাপনের জন্য সে দিনের মত শেষ হয়। মাঠেই রাত যাপন করার পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। শিবগঞ্জে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরী করে মহানন্দা নদী পার হয় মিছিল। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয় এই লংমার্চে। দু’দিনে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই লংমার্চ শেষ হয় ১৭ মে। ঐদিন তিনি ঐতিহাসিক সোনামসজিদে আছরের ছালাত আদায় করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখে কর্মসূচীর সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

কানসাট হাই স্কুল ময়দানে ফারাক্কা মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণার সময় মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য আমাদের আন্দোলন, আমি জানি, এখানেই শেষ নয়’। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আরো বলেন, ‘ভারত সরকারের জানা উচিত, বাংলাদেশীরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না, কারও হুমকিকে পরোয়া করে না। ... যেকোন হামলা থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করা আমাদের দেশাত্মবোধক কর্তব্য এবং অধিকার’।

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের পরিণতি:
ফারাক্কা বাঁধের কারণে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। সাহারা মরুভূমির গবেষক মার্কিন ভূবিজ্ঞানী ড. নরম্যান ম্যাকলিয়ড বলেছেন, ‘সাহারাতে ঠিক যেভাবে একদিন মরুভূমির বিস্তার শুরু হয়েছিল, বরেন্দ্র এলাকায় ঠিক সেভাবেই বিপদটা শুরু হয়েছে’। ফারাক্কার কারণে প্রমত্তা পদ্মায় বছরের প্রায় ৮ মাসই পানি থাকে না। এ বাঁধের কারণে পদ্মা নদী রাজশাহী শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। বিস্তীর্ণ চর ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চল হিসাবে পরিচিত রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার প্রকৃতি ও আবহাওয়া রীতিমত বদলে যাচ্ছে। এসব অঞ্চলে বিশেষত রাজশাহীতে গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড গরম এবং শীতকালে প্রচন্ড শীত বিরাজ করে। নদীর পলি কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নীচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হচ্ছে ব্যাহত।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে সুদীর্ঘ ৩৬ বছরে ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের জীবন ও জীববৈচিত্র্যই কেবল ধ্বংস করেনি; বরং ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এ দেশের কৃষি, শিল্প, বনসম্পদ ও প্রাণী বৈচিত্র্য। শুষ্ক মৌসুমে গঙার পানি অপসারণের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। এতে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস, বনজ, শিল্প, নৌ পরিবহন, পানি সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক লোকসানের সম্মুক্ষিন হতে হয়। প্রত্যক্ষ ভাবে বাংলাদেশশর প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়; যদি পরোক্ষ হিসাব করা হয়, তাহলে বাংলাদেশর ক্ষতির পরিমাণ অনেক গুণ ছাড়িয়ে যাবে।

ফারাক্কা পরবর্তি সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গঙা নদীর (পদ্মা) প্রবাহে চরম বিপর্যয় ঘটে। প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর নাব্যতা কমে যায়। ফলে প্রায় বাংলাদেশর বর্তমানে প্রায়ই বড় বন্যা সম্মুক্ষিন হতে হচ্ছে। বাংলাদেশর গড়াই নদী এখন সম্পূর্ণ ভাবে বিলুপ্ত।

ফারাক্কা বাঁধের ফলে বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলের মাটির লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীরা খুলনার রুপসা নদীর পানিতে ৫৬৩.৭৫ মিলিগ্রাম/লিটার ক্লোরাইড আয়নের উপস্থিতি পেয়েছেন। তাছাড়া, মিঠা পানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে লবন, ভূ-অভ্যন্তরস্থ পানিতে প্রবেশ করছে।

কৃষির অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। পানির স্তর অনেক নেমে যাওয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের জি-কে সেচ প্রকল্প মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সেচযন্ত্র গুলো হয়ত বন্ধ হয়ে আছে অথবা সেগুলোর উপর তার ক্ষমতার চাইতে বেশি চাপ পড়ছে। এই প্রকল্পের অন্তর্গত প্রায় ১২১,৪১০ হেক্টর জমি রয়েছে। মাটির আর্দ্রতা, লবনাক্ততা, মিঠা পানির অপ্রাপ্যতা কৃষির মারাত্বক ক্ষতি করেছে।

পানি অপসারণের ফলে পদ্মা ও এর শাখা-প্রশাখাগুলোর প্রবাহের ধরণ, পানি প্রবাহের বেগ, মোট দ্রবনীয় পদার্থ (Total dissolved solids) এবং লবনাক্ততার পরিবর্তন ঘটেছে। এই বিষয় গুলো মাছের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গঙার পানির উপর অত্র এলকার প্রায় দুইশতেরও বেশি মাছের প্রজাতি ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ী নির্ভর করে। ফারাক্কা বাঁধের জন্য মাছের সরবরাহ কমে যায় এবং কয়েক হাজার জেলে বেকার হয়ে পরে।

শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের ৩২০ কিলোমিটারের বেশি নৌপথ নৌ-চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে, কয়েক হাজার লোক বেকার হয়ে পড়ে, নৌ-পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। সেই সাথে নদীতে স্রোত না থাকার ফলে পলি পরে নদী হয়ে যাচ্ছে ভরাট আবার যখন বর্ষা মৌসুমে পানি আসছে ভরাট নদীর ফলে দেশ হচ্ছে বন্যার সম্মুখীন।
ভূ-অভ্যন্তরের পানির স্তর বেশিরভাগ জায়গায়ই ৩০ মিটারের বেশি কমে গেছে। তাছাড়া বিভিন্ন দ্রবিভুত পদার্থের, ক্লোরাইড, সালফেট ইত্যাদির ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণেও পানির স্তর কমছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিল্প, পানি সরবরাহ ইত্যাদির উপর। মানুষের বাধ্য হয়ে ১২০০ মিলিগ্রাম/ লিটার দ্রবিভুত পদার্থ সম্পন্ন পানি পান করছে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO = World heath organization) ৫০০ মিলিগ্রাম/লিটারের কম দ্রবিভুত পদার্থ সম্পন্ন পানিকেই মানুষের পান করার জন্য উপযুক্ত বলে ঘোষণা করেছে।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়; ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পলি জমে তলা ভরাট হয়ে যাওয়ায় ফিডার ক্যানেল উপচে পানি উঠে মুর্শিদাবাদে সৃষ্টি করছে বন্যা। অন্যদিকে ভাঙছে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ যেলার কালিয়াচক থানার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, মালদহ প্রভৃতি জেলার লাখ লাখ বনু আদমের স্বপ্নসাধ ভেসে যাচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে তাদের ফসল ও বাড়ীঘর। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে তারা উদ্বাস্ত্ত হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছে পার্শ্ববর্তী যেলাগুলোতে। ফলে সেখানে নিয়মিত এর বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং চলছে।

তাই এখনো সময় আছে ফারাক্কার অশুভ প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনমত এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার। কাদা ছোড়াছুড়ির বিভেদাত্মক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থে সরকার, বিরোধী দল সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে এ সম্পর্কে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের ক্ষয়-ক্ষতির কথা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের দ্বারস্থ হতে হবে। তবুও পদ্মার বুকে মরুর কান্নাকে আর দীর্ঘায়িত করতে দেয়া যাবে না।

এআর