আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই শুরু হচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান। যেখানে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই মাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে নিত্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী হওয়ার কথা, সেখানে রমজান মাস আসার আগে থেকেই তা বাড়তে থাকে। দাম বৃদ্ধি অনেকটা লাগামহীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রমজানে যে সব পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে, সেগুলোর দাম অনেকটাই মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যায়।
একদিকে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পায়, অপর দিকে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মজুদ গড়ে তুলে। আর তারই প্রভাব পড়ে বাজারে। বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের সরকারি ঘোষণা, ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি, জনগণের আশাবাদ কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না, মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। সরকার বলছে চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট মজুদ আছে, সঙ্কট সৃষ্টি হবে না। ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অতিরিক্ত মুনাফা করবেন না। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, ছোলা ও ডালসহ প্রায় প্রতিটি পণ্যেরপাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাম। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে এসব পণ্যের প্রায় সবগুলোতে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত।
নিত্য প্রয়োজনীয় এসব দ্রব্যের বাড়তি দামে অনেকটাইঅস্বস্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। আর এ জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু সিন্ডিকেট এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং টিম মাঠে না থাকাকেই দায়ী করছেন তারা।
কাঁচাবাজারগুলোতে সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় দাম অনেকটা স্বভাবিক রয়েছে। স্বাভাবিক রয়েছে চালের দামও। আর কোম্পানীভেদে ভৌজ্য তেলের দামও স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন দোকানীরা।
রাজধানীর হাতিরপুল, নিউমার্কেট,পলাশী এবংআজিমপুরসহ কয়েকটি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯০টাকা থেকে ৯৫ টাকায়। গত এক সপ্তাহ আগে এসব ছোলা বিক্রি হতো ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে ছোলার দাম বেড়েছে ১৫ থেকে২০ টাকা।
ছোলার সঙ্গে মসুর ডালের দামও বেড়েছে। খুচরা বাজারে দেশি মসুর ডাল মানভেদে ১৪০ টাকা থেকে ১৫০টাকায়, অস্ট্রেলিয়ার নিম্ন মানের মসুর ১০৫ থেকে ১১৫ টাকা, এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের মসুর ডাল ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও খেসারি ৯০থেকে ১০০ টাকা, মুগ ডাল দেশি সবচেয়ে ভাল মানের ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা।
প্রতি কেজি পেঁয়াজ (দেশি) ৪০থেকে ৫০টাকায় এবং ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ ২২ টাকা থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রসুন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে ২২০ টাকা, দেশি ছোট রসুন ১১০ থেকে ১২০ টাকা। বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। পাঁচ লিটার ব্র্যান্ড ভেদে ৪৫০ থেকে ৪৭০ টাকা এবং পামওয়েল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা লিটার। চিনি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০থেকে ৬২টাকায়।
নগরীর সবজি বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৫০ থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, টমেটো ২৫ থেকে ৩০ টাকা, শসা ২৫ থেকে ৩০টাকা, আলু ২০ থেকে ২৫টাকা, বেগুন ৪০থেকে ৫০টাকা, করলা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, কাকরোল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, পটল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, ধুন্দল ৩০ টাকা, কাগজি লেবু প্রতি হালি ২০ টাকা।
রমজানের আগে দেখা যায়, টিসিবি তড়িঘড়ি করে কিছু পণ্য নিয়ে বাজারে আসে। কিন্তু তা আসলে মরুভূমিতে এক ফোঁটা পানি দেয়ার মতো। এতে বাজার প্রভাবিত হয় না। দেখা যায়, বাজারে চাহিদা আছে ২ লাখ টন ময়দা। টিসিবি হয়ত ১০ হাজার টন নিয়ে বাজারে এল।
এতে জনকল্যাণও হয় না বাজারও প্রভাবিত হয় না। যা হয় তা হলো রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা। শুধু রমজানের সময় নয়, পণ্যদ্রব্যের মূল্য অন্য সময়েও বাড়ে। টিসিবি যতদিন দুর্বল থাকবে ততদিন বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলতেই থাকবে।
টিসিবিকে শক্তিশালী করতে হবে : রমজান মাসে মূল্যবৃদ্ধির কারণ বলতে গিয়ে এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির বলেন, এটা একটা অদ্ভুত বিষয়। এ সময় হটাৎ করে খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা বিপুল পরিমাণ বেড়ে যায়। মানুষ এ সময় খরচ করার জন্য যেন উদার হয়ে যায়। খাদ্যদ্রব্য কিনতে সে অনেক অর্থ ব্যয় করে। খাওয়া দাওয়াতে কোনো ধরনের সংযম থাকে না বরং বেড়ে যায়। এই চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এবং এর সুযোগে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।
তিনি বলেন, বাজারের সরবরাহ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। আমদানিকারক, মিলমালিক, পাইকারি বিক্রেতা এবং খুচরা বিক্রেতা-এরকম নানা হাত ঘুরে একটি পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। এর প্রতিটি স্তরেই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ব্যবসায়ীরা লাভ করবে এটা স্বাভাবিক কিন্তু অতি মুনাফা যেন না করতে পারে সেজন্য সরকারের একটি ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।
তিনি আরো বলেন, সরকারকে যে কোনো মূল্যে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। বাজারে কিছু ব্যবসায়ীর যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি হয়েছে তা ভাঙতে হবে। এটা করতে হলে প্রথমেই টিসিবিকে শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে যে নীতি দ্বারা টিসিবি পরিচালিত হয় তা দিয়ে তাকে শক্তিশালী করা যাবে না। এছাড়া সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যেন বাজারে আরো ব্যবসায়ী আসতে পারেন।
এমই/কেবি





