পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)-এর হাতে রয়েছে আড়াই হাজার মামলা। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা রয়েছে কমপক্ষে ১ হাজার। এতো মামলা তদন্ত করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে সিআইডি। তদন্ত কাজ সম্পাদনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
সিআইডির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন,এতোগুলো মামলা তাদের কাছে জট মনে হচ্ছে না। তবে গুরুত্বের বিচারে কমও না। ইতোপূর্বে আরও বেশি মামলা ছিল। তবে বর্তমানে সমস্যা হলো এক সঙ্গে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা সিআইডির তদন্তাধীনে থাকায় তদন্ত কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে,কোনো ঘটনার তদন্তের স্বার্থে পুলিশ কর্মকর্তা এবং সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা,অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পলাতক অপরাধীর পরিচিতি সংগ্রহ,সনাক্তকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে সাহায্য করে থাকে সিআইডি।
তবে বিশেষ ধরনের অপরাধ ও পেশাদার অপরাধীর তথ্য সংগ্রহের কাজকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে সিআইডি। যাতে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে অন্য তদন্ত কাজ সম্পাদনায় সহযোগীতা করা যায়।
অপরাধী ও অপরাধকে সনাক্তকরণের জন্য সিআইডির নয়টি বিভাগ আছে। তাহলো ফিংগার প্রিন্ট ব্যুরো,ফুট প্রিন্ট ব্যুরো,হ্যান্ড রাইটিং ব্যুরো,ব্যালেস্টিক ব্যুরো,মাইক্রো এ্যানালাইসিস ব্যুরো,কেমিকেল এ্যানালাইসিস ব্যুরো,জালনোট শাখা,ফটোগ্রাফিক ব্যুরো,সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো।
সিআইডির উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে,সিআইডিতে ডাকাতির মামলা, দস্যুতা,সরকারি যতো নোট/স্ট্যাম্প,রেভিনিউ জালিয়াতি,পয়জনিং ক্রাইম,মলম পার্টি, মার্ডার,ইন্সুরেন্স জালিয়াতি,ব্যাংক জালিয়াতি,ড্রাগ,কিডন্যাপিং ও চাঁদাবাজির মামলা তদন্ত করে থাকে।
তবে এসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা গুলোই শুধু সিআইডি তদন্ত করে। সম্প্রতি মানি লন্ডারিং,হুন্ডি ব্যবসা,কিডন্যাপিং ও রেমিট্যান্স জালিয়াতির বিষয়গুলোর দেখাশোনার দায়িত্বও দেয়া হচ্ছে সিআইডিকে।
মামলার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,সিআইডির হাতে থাকা এক হাজারের বেশি চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা বছরের পর বছর 'মৃত মামলা' হিসেবে পড়ে আছে। এসব মামলার তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই,নেই আসামি গ্রেফতারের উদ্যোগ। কবে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়া হবে তাও কেউ জানে না।
তবে সরকারের অতি আগ্রহের কারণে গত কয়েক বছরে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা,জেলহত্যা মামলা,২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের মতো বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষ করে সিআইডি।
সিআইডির বার্ষিক অপরাধ মনিটরিং প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে,২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সিআইডির হাতে মোট এক হাজার ৭৫৬টি মামলা তদন্তাধীন আছে। এর মধ্যে এক হাজার ৩৬টি মামলা ৩ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা টাইমনিউজবিডিকে বলেন,সিআইডির হাতে থাকা হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের প্রায় এক হাজার মামলার মধ্যে ৭৫৬টি মামলার কী অগ্রগতি হয়েছে কর্মকর্তারা তা সঠিক জানেন না। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক মামলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা মনিটরিং সেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। কোনো কোনো কর্মকর্তা পরিদর্শক থেকে পদোন্নতি পেয়ে অন্যত্র চলে গেলেও নতুন কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এসব কারণে পুনরায় মামলায় জট দেখা দিয়েছে।
রাজধানী ঢাকার মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা গেছে, পূর্বের মামলার জট সেরে উঠলেও আড়াই হাজার মামলার মধ্যে কমপক্ষে ১ হাজার গুরুত্বপূর্ণ মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত রিপোর্ট শেষ করতে বিভিন্ন পর্যায়ের চাপও রয়েছে। তবে আড়াই হাজার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রয়েছেন মাত্র ৫শ' জন। হিসাব করে দেখা যাচ্ছে জন প্রতি ৫ টি করে মামলার তদন্ত কাজ করতে হচ্ছে তাদের। গুরুত্বপূর্ণ মামলা দেখতে হচ্ছে ২টি করে। গুরুত্ব বিবেচনায় এ পরিমাণ মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে খেই হারার দশা সিআইডির।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিআইডির এডিশনাল ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (অর্গানাইজড ক্রাইম) মো. শাহ আলম টাইমনিউজবিডিকে বলেন,মামলা যা আছে তা জট বলা যায় না। আবার মামলার পরিমাণ ও গুরুত্ব বিবেচনায় কমও না। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করে বলেন,জাল নোট ও হিরোইনের যেসব মামলা ছিল তা তদন্ত শেষ দিকে। তবে গত দুই বছরে অনবরত অবৈধভাবে স্বর্ণের আমদানির ঘটনায় গোল্ডের মামলা বেড়েছে।
তিনি বলেন,গত ১৭ এপ্রিল ইরান থেকে অপহৃত ১২ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছে সিআইডি পুলিশ। দুবাই এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তাদের ঢাকায় আনা হয়। এ নিয়ে কয়েকমাসে মোট ৪২ জনকে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। ইরান,গ্রিস ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে চাকরি দেয়ার নামে এসব বাংলাদেশিকে ইরানের বন্দর আব্বাসে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। আর নির্যাতিতদের সঙ্গে স্বজনদের কথা বলিয়ে দিয়ে অপরাধীচক্র অনেক অর্থ হাতিয়ে নিতো। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলাও তদন্ত করছে সিআইডি।
তিনি বলেন,মানবপাচার সংক্রান্ত কমপক্ষে মামলা রয়েছে ৫৫ টি। খুনের অনেক পুরোনো মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হইনি তথ্য উপাত্তের অভাবে। তবে সিআইডির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই। খুব শিগগিরই মামলার চাপ কমবে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) আশরাফুল ইসলাম বলেন,মামলা ইতোপূর্বে আরও বেশি ছিল তা কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে সরকারিভাবে কিছু মামলা অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হচ্ছে। আবার হত্যা,খুন, মানি লন্ডারিং,হুন্ডি ব্যবসা,কিডন্যাপিং ও রেমিট্যান্স জালিয়াতির মতো ঘটনার মামলা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সময় বেশি লাগছে। আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ বলে পাঁচ শতাধিক মামলা মনিটরিং করার জন্য জোর তাগিদও দিয়েছে। এসব মিলিয়ে একটা সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তও মনিটরিং করা হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট জমা হবে বলে দাবি করেন তিনি।
[b]ঢাকা,জেইউ,৩০ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ// এসআর[/b]
টাইম ফোকাস
আড়াই হাজার মামলায় খেই হারাচ্ছে সিআইডি
পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেসটিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)-এর হাতে রয়েছে আড়াই হাজার মামলা। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা রয়েছে কমপক্ষে ১ হাজার।





