ইকবাল সাহেব ধনী লোক। শহরের প্রাণকেন্দ্রে তাঁর আলিশান বাড়ি। তাঁর একমাত্র ছেলে আরমানের বয়স সাত বছর। প্রতিবছর ঘটা করে আরমানের জন্মদিন পালন করেন।

আরমানের আকিকা আদায় করেননি আজও, কিন্তু সুন্নতে খতনায় ভোজসভার আয়োজন করেছেন ধুমধামে। কমিউনিটি সেন্টারে বিশাল আয়োজন করলেও তাঁর বাড়িটি বাদ যায়নি আলোকশয্যা থেকে।

ইকবাল সাহেবের গরিব প্রতিবেশী সালেম দাওয়াত না পেলেও এলাকার বড়লোকেরা বাদ যাননি তাঁর নিমন্ত্রণ থেকে। আমন্ত্রিত লোকজন আসছেন উপঢৌকন হাতে। কমিউনিটি সেন্টারের প্রবেশদ্বারে একজন বসে আছেন। কে কী দিচ্ছেন তা লিখে লিখে গ্রহণ করছেন।

ইকবাল সাহেবের বাণিজ্যিক ভোজসভা কিংবা আলোকশয্যার মতো অপব্যয়ের আয়োজন আমাদের চারপাশে প্রায়ই হয়ে থাকে। অথচ অপব্যয়ের পথ পরিহার করে মিতব্যয়ের পথ অবলম্বন করাই সুস্থ মানসিকতার কাজ।

মানুষকে মিতব্যয়িতায় উৎসাহিত করতে ৩১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস। মিতব্যয় মানে হলো, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযম বা আয় বুঝে ব্যয়।

'ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন'ও মিতব্যয়িতার অর্থ। ইসলাম অপব্যয় ও কৃপণতার ব্যাপারে সতর্ক করে মিতব্যয়িতার নির্দেশ দিয়েছে বারবার।

ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থার জীবন দর্শন ইসলাম। বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি কোনোটিই অনুমোদিত নয় ইসলামে। পবিত্র কোরআনুল কারিমে মুসলমানদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, 'আমি তোমাদের মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি।' (সুরা বাকারা : ১৪৩)

মধ্যমপন্থা শুধু ব্যয়ের ক্ষেত্রেই নয়; বরং কথাবার্তা, হাঁটাচলা ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ইরশাদ হয়েছে, 'পদচারণে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো।' (সুরা লোকমান : ১৯)

কথাবার্তা, হাঁটাচলায় মধ্যমপন্থার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি 'ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন'-এর ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব রয়েছে ইসলামে।

পবিত্র কোরআনুল কারিমে অপচয় ত্যাগের কঠোর নির্দেশ জারি করে ইরশাদ হয়েছে, 'তোমরা আহার ও পান করো, আর অপচয় করো না; তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।' (সুরা আরাফ : ৩২) রাসুলে কারিম (সা.)ও অপব্যয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন।

একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত সাদ (রা.)-কে অজুতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যয় করতে দেখে বললেন, 'হে সাদ! অপচয় করছ কেন? সাদ (রা.) বললেন, অজুতে কী অপচয় হয়? নবীজি (সা.) বললেন, হ্যাঁ। প্রবহমান নদীতে বসেও যদি তুমি অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করো তা অপচয়।' (ইবনে মাজাহ) অপচয় এবং কৃপণতা কোনোটিই অনুমোদিত নয় ইসলামে।

যারা অপচয় এবং কৃপণতার পথ পরিহার করে মিতব্যয়িতার পথ অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাদের নিজের বান্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইরশাদ হয়েছে, '(রহমানের বান্দা তো তারাই) যারা অপব্যয়ও করে না আবার কৃপণতাও করে না। তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।' (সুরা ফুরকান : ৬৭)

অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ছোট-বড় সবাই এসবের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করলেও সামাজিক ও আর্থিক ভিন্নতার কারণে অনেকে এসবের সংস্থান করতে পারে না। কারো ভোগের পেয়ালা উপচে পড়ে আবার কারো হাঁড়ি শূন্যই থেকে যায়।

কেউ জৌলুস প্রদর্শনে কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিনোদনে খরচ করছে লাখ লাখ টাকা, আর তার পাশের একজন গরিব মানুষ হয়তো টাকার অভাবে ওষুধও কিনতে পারছে না।

উপচে পড়া অতিরিক্ত সম্পদটুকুর অপব্যয় না করে গরিবের শূন্য হাঁড়িতে ঢেলে দিলে একদিকে যেমন অপব্যয়ের গুনাহ থেকে বেঁচে যেত, অন্যদিকে শূন্য হাঁড়িগুলো প্রাণ ফিরে পেত।

ইরশাদ হয়েছে, 'আত্মীয়স্বজনকে তার হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।' (সুরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭)

আয়াতদ্বয়ে প্রথমে আত্মীয়স্বজন ও অভাবী লোকদের হক প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এরপর অপব্যয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ আত্মীয়স্বজন ও অভাবীদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে দিলে অপব্যয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

প্রাচুর্যের সময় খরচের উৎসবে মেতে না উঠে পরবর্তী সময়ে যেন হাত পাতার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে হয়, এ বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে।

পবিত্র কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, 'তুমি একেবারে ব্যয়-কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।' (বনি ইসরাইল : ২৯) অপব্যয় না করে সন্তানদের জন্য কিছু সঞ্চয় করা ইসলামের শিক্ষা।

সন্তানদের কারো মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়া নবীজি (সা.) কখনো পছন্দ করেননি। রাসুলে করিম (সা.) বলেন, 'তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের মানুষের করুণার মুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদের সচ্ছল রেখে যাওয়াই উত্তম।' (বুখারি : ১/৪৩৫; মুসলিম ৩/১২৫১)লেখক : খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ

এসএইচ