কেউ বানাচ্ছেন চাটাই, কেউবা আবার ডালী-কুলা। বাদ যাচ্ছে না চালন-মাদুরও। কেউ বানাচ্ছেন ডোল-পলো আর কেউবা বানাচ্ছেন খেলনাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য। ক্লান্তি যেন কারো ধার ধারে না। নিবির যত্নে চলছে বুনন। বিভিন্ন আকার ও শৈলীতে কাটা নতুন বাঁশের সুগন্ধ ও সোনালী রং পরিবেশকে দিয়ে চলেছে ভিন্নমাত্রা। পুরো গ্রামটি যাতবারই ঘুরে ঘুরে দেখা যাবে এই নান্দনিক দৃশ্যে চোখ জুড়িয়ে যাবে।

এই নান্দনিক দৃশ্য প্রত্যন্ত একটি গ্রামের। দুর্গাপুর নামে যার পরিচয়। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ভাতগ্রাম ইউনিয়নে গ্রামটির অবস্থান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন উয়ন্নয় ঘটেনি গ্রামটিতে। তবে তারা বাঙালীর ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত সামগ্রী তৈরীতে নিপুণ শিল্পী। কেবল তা-ই নয়, গ্রামটিতে বসবাসকারী পাঁচ শতাধিক পরিবারের বড় একটি অংশেরই পেশা এই ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প। দুর্গাপুরে যুগ যুগ ধরে এই পরিবারগুলোর নারী-পুরুষ বাঁশের উপকরণ তৈরীতে পারদর্শী। মূলত বাঁশের সঙ্গে এসব পরিবারের মানুষের নিবিড় সম্পর্ক।

দুর্গাপুরে তাদের তৈরী চাটাই স্থানীয় পাইকাররা ক্রয় করে। পরে তা বিভিন্ন হাট-বাজারসহ নানা স্থানে বিক্রি করা হয়। কখনো কখনো তা খুচরাভাবেও বিক্রি করা হয়। আর এই পাইকারী ও খুচরাভাবে বিক্রি লব্ধ টাকা দিয়ে অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের চেয়ে বেশ ভালভাবেই জীবনযাপন করছেন দুর্গাপুরের বাঁশশিল্পের কারিগররা।

দুর্গাপুর গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে, কিংবা বাড়ীর পাশ দিয়ে যাওয়া কাঁচা রাস্তা, অথবা বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় বসে বাঁশের নানা উপকরণ তৈরী করছেন তারা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে দলগতভাবে খোশগল্প ও মোবাইলে গানও শুনছেন কেউ কেউ। গ্রামটির প্রায় সব বাড়ির একই অবস্থা। ঘুরে-ফিরে মনে হলো- এই গ্রামে এমন কোনো বাড়ি পাওয়া মুশকিল যেখানে বাঁশের উপকরণ তৈরী করা হয় না।

গ্রামবাসীর অনেকে জানান, সকালে অনেককে বের হয়ে পড়তে হয় বাঁশ সংগ্রহে। আবার এর মধ্যে বাকীদের শুরু হয় বাঁশ কাটা, চাঁচা, চাটাই বাঁধা, শুকানো ও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ তৈরীর কাজ। এ দিকে সংসারের রান্নার কাজ শেষ করে নারীরাও বসেন বাঁশের উপকরণ তৈরীর কাজে। ছেলে-মেয়েরাও সাধ্যমতো সহযোগিতা করে এ কাজে। এভাবেই তাদের সকাল থেকে সন্ধ্যা বয়ে যায়।

বাঁশের কারিগর আরকার মিয়া (৪০) এ বিষয়ে টাইমনিউজবিডি'কে জানালেন, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তিনি এ কাজ করেন। এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের আলোয় তাদের কাজ সাড়তে হয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলে আরও বেশি কাজ করা সম্ভব হতো বলেও তিনি জানান।

বাড়ীর উঠানে বসে কাজ করছিলেন বাঁশের কারিগর রুমি বেগম (৩৩)। তিনি জানালেন, আগে সহজে বাঁশ সংগ্রহ করা যেত। এখন বাঁশের সংকটসহ দাম বেড়েছে। সে কারণে লাভ কমে গেছে।

বাঁশের আরেক কারিগর আকবর আলী (৫৫) টাইমনিউজবিডি'র কাছে অনুযোগের সুরে জানালেন, রাস্তা-ঘাট খারাপ থাকায় বাঁশের তৈরী জিনিসপত্র অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া কষ্ট হওয়ায় পাইকাররা কম আসেন।

গ্রামের ফুয়াদ আমিন জানান, বাঙালীর ঐতিহ্য, নান্দনিক শৈলী ও পরিবেশবান্ধব এই বাঁশ শিল্পটি প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে অনেকেই আশংকা করেছিলেন হারিয়ে যাওয়ার। কিন্তু গ্রাম ও মফস্বল-শহরগুলোতে বিশেষত এই পণ্যগুলোর চাহিদা ও আকর্ষণ আজও অমলীন। সেই কারণেই হয়ত দুর্গাপুরের মতো নাম না জানা আরও বহুগ্রামের মানুষের পছন্দীয় পেশা আজ বাঁশশিল্প। ঐতিহ্যে- সৌন্দর্যে-জীবিকায় আজও তাই ক্ষুদ্রশিল্পটির জয়যাত্রা।

টিজে// এআর