১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১। চারদিক থেকে পরাজিত ক্লান্ত পাক-বাহিনী বুঝে ফেলে যুদ্ধে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। তাই সব আশা ছেড়ে দিয়ে শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে বিদেশি দূতাবাসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেন পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস কর্মীরা সেই প্রস্তাব পাঠিয়ে দেন দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে। সেখান থেকে প্রস্তাবটি পাঠানো হয় ওয়াশিংটনে। ওয়াশিংটন ইসলামাবাদে মার্কিন দূতাবাসের কাছে জানতে চায়, নিয়াজীর এই প্রস্তাবে পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সমর্থন আছে কিনা?

নিয়াজী তার প্রস্তাবে বলেন, 'আমরা যুদ্ধ বন্ধ করেছি। তবে বাংলাদেশে অবস্থানরত গোটা পাক বাহিনীকে চলে যেতে দিতে হবে, কাউকে গ্রেফতার করা চলবে না।' কিন্তু ভারত সরকার এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।

ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের পাক বাহিনীকে এই আশ্বাস দিতে রাজি হয় যে, যুদ্ধবন্দিরা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার পাবেন। পাক জেনারেল নিয়াজীর শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পেয়ে ভারতীয় বাহিনী মনে করে, এটি তার কৌশল। নিয়াজীর প্রস্তাবকে তাদের কাছে মনে হলো, এটি যুদ্ধবিরতি; আত্মসমর্পণ নয়। তাই মিত্র বাহিনী বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ ছাড়া কোন শর্তেই রাজি নয়।

পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজীর দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের জবাবে মিত্র বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেক'শ পাকিস্তানিদের জানিয়ে দেন, শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মতি দেয়া হবে না।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ১৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানের তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় জেনারেল নিয়াজীকে নির্দেশ দেন, ভারতের সেনা বাহিনীর প্রধান পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের জন্য যেসব শর্ত দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য তা মেনে নেয়া যেতে পারে।

ইয়াহিয়া খানের এই নির্দেশ শুনে সেনানিবাসে নিজ কক্ষে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন কথিত পরাক্রমশালী পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী। কিছুটা তটস্থ হয়ে রাত ২টার মধ্যে বাংলাদেশের সব জায়গায় অবস্থানরত হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে তারবার্তা পাঠান। এই দিনটি মূলত দখলদার বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের দিনক্ষণ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়।

এদিকে এই দিনে মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে মোকাবেলা করার জন্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ভারতীয় নৌবাহিনীর সমর্থনে সোভিয়েত রণতরীর ২০টি জাহাজ ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপর মার্কিন রণতরী সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে ফেলে। পাকিস্তানের মনে যুদ্ধে সাহায্য পাওয়ার যেটুকু আশা ছিল, সেটাও শেষ হয়ে যায়।

এমআর/ এআর