সাকা চৌধুরী ১৯৪৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাবের সাদিক পাবলিক স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন সাকা। এরপর আবার উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পাকিস্তানে যান তিনি। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে আইনে পড়া শুরু করলেও তা শেষ না করেই ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসেন (তার বাবার মৃত্যুর পর)।
মুসলিম লীগ থেকে রাজনীতি শুরু করলেও পরে জাতীয় পার্টি ও এনডিপি হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন প্রচণ্ড ভারত বিদ্বেষী এই রাজনীতিক।
ট্রাইব্যুনালে মামলা চলাকালে বিচারককে তিনি একবার বলেছিলেন, “কলকাতার জেলে পাঠাবেন না।”প্রকাশ্যে তার মুখ থেকে কখনো ‘ভারত’বা ‘ইন্ডিয়া’শোনা যায়নি। তিনি সব সময়ই বলতেন ‘হিন্দুস্তান’। একাত্তরের অপরাধের জন্য বিতর্কিত এই রাজনীতিক ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে রাউজানের সাংসদ নির্বাচিত হন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময়ে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হন।
১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে নিজের এলাকা রাউজান থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন সাকা। কিন্তু পরে এরশাদ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন।
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে তিনি নির্বাচন করেন নিজের গঠন করা দল এনডিপি থেকে। পুনরায় রাউজানের এমপি হন।
কিছুদিন পর এনডিপি বিএনপির সঙ্গে একীভূত হয়ে যায় এবং ১৯৯৬ সালে বিএনপির সাংসদ নির্বাচিত হন সালাউদ্দিন। পরের নির্বাচনে ২০০১ সালে তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন সাকা চৌধুরী। এরশাদের শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন সাকা চৌধুরী।
সর্বশেষ ২০০৮ সালের র্নিবাচনে রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি থেকে অংশ নেন সাকা। রাঙ্গুনিয়াতে হেরে গেলেও ফটিকছড়ি, অর্থাৎ চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে বিএনপির সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি।
ফকা চৌধুরীর চার ছেলের মধ্যে সাকা চৌধুরীই সবার বড়। তার সেজ ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি। অপর দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রয়াত সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামাল উদ্দিন কাদের চৌধুরী রাজনীতিতে সারসরি যুক্ত ছিলেন না।
আত্মীয়তা ও পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সূত্রে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফলে নানা নাটকীয় ঘটনার জন্ম দেয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ‘অশালীন’মন্তব্য করে আলোচনা ও নিন্দা কুড়ান তিনি।
বিএনপিতে থেকেও দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচিত হন দলের ভেতরেই।
নবম সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় সাকা চৌধুরী শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘নেই’ উল্লেখ করলে ‘অসত্য তথ্য’ দেওয়ার কারণে পরে তার সদস্যপদ খারিজের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। তবে ‘আইনি সীমাবদ্ধতার’ কারণে বিষয়টি আর এগোয়নি।
সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, দুই ছেলে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরী।
হরতালে গাড়ি পোড়ানোর একটি মামলায় ২০১০ সালের বিজয় দিবসের সকালে সাকাকে আটক করা হলেও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় ১৯ ডিসেম্বর।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিলে ১৮ নভেম্বর তা আমলে নেন বিচারক। এরপর ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু হয়।
প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে ওই বছর ৩ মে শুরু হয় এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ।
সালাউদ্দিন কাদেরের পক্ষে মামলায় সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি নিজেসহ মোট চারজন। অন্য তিনজন হলেন তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু নিজাম আহমেদ, এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাইয়ুম রেজা চৌধুরী এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোমেন চৌধুরী।
সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশনের মোট ৪১ জন। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া আরো চারজনের জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগের মধ্যে নয়টি ঘটনায় সাকা চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
তিনি ও তার পরিবার কীভাবে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীকে নিয়ে হত্যা, লুটপাট চালিয়েছেন, কীভাবে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে নিজের গুডহিলের বাসায় আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়েছেন- তার বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে রায়ে।
১৭২ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়, সাংসদ সালাউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে এ মামলায় প্রসিকিউশন যে ২৩টি অভিযোগ এনেছে, তার মধ্যে নয়টি (২ থেকে ৮, ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগ) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩, ৫ , ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে হত্যা, গণহত্যা ও অপহরণের পর খুনের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এছাড়া হত্যা, গণহত্যার পরিকল্পনা সহযোগিতা এবং লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও দেশান্তরে বাধ্য করার মতো তিনটি অভিযোগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্যকে ২০ বছর কারাদণ্ড এবং অপহরণ ও নির্যাতনের দুটি ঘটনায় দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছর করে জেল।
আটটি অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি। আর কোনো সাক্ষী হাজির করতে না পারায় ছয়টি অভিযোগের বিষয়ে রায়ে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে চলতি বছরের ১৬ জুন শুনানি শুরু হয়। ১৩ দিন শুনানির পর ৭ জুলাই শেষ হয়।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসির রায় বহাল রাখে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
ঔদ্ধত্য, অভিব্যক্তিতে ব্যঙ্গ, আচরণে মারমুখিতা আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিদ্রূপ, এইসব কারণে সব সময়ই সংবাদের শিরোনামে থাকতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার দায়ে সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত রাজনীতিক সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। চূড়ান্ত বিচারে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এই যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী নামেই খবরে এসেছেন বেশি।
শুধু গণহত্যাই নয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, বোয়ালখালী ও চট্টগ্রাম শহরে ধর্ষণ, লুটপাট, হিন্দুদের বাড়ি দখল এবং তাদের দেশান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সাকা চৌধুরী। সেসময় পুরো চট্টগ্রামজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে সাকা চৌধুরী।
ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফজলুল কাদের চৌধুরী ফকা চৌধুরী নামে পরিচিত ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকারও হয়েছিলেন।
পিতার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও রাজনীতি শুরু করেন মুসলিম লীগের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই মুসলিম লীগ সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্ম আর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামেই।
২০১৩ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রাউজানে কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় হিন্দু বসতিতে গণহত্যা এবং হাটহাজারীর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজাফফর ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরণ করে খুনের দায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।
ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
কেএইচ





