আজ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘভূক্ত সকল দেশ এ বিষয়ে যথাযথ কর্মসুচি গ্রহণ করেছে। বিশ্ব হিসাবে ৭৭৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার খুব কমই সাক্ষরতাসম্পন্ন।
মানব জীবনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন রকম পরিস্থিতি। শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে বলে পারিবারিক মূল্যবোধসমূহ হারিয়ে যেতে বসেছে।
মানুষের জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা কল্যাণকর, কল্যাণমুখী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই জরুরী। কেবলমাত্র, সুশিক্ষাই হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।
একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা সকলের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর ও সদাসচেষ্ট।
দিবসটি পালণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
তবে দেশে স্বাক্ষরতার হার নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যেই।
এ পরিস্থিতিতে দার্শনিক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকগণ মনে করেন, বক্তিগত ও পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পিস একুকেশন বা শান্তির শিক্ষার বিস্তরণ করা উচিত। শান্তিময় সহবস্থান ও মূল্যবোধ সম্পন্ন জাতি গঠনের জন্য এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। পৃথিবীব্যাপী শিক্ষা একটি অন্যতম মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত যা বিভিন্ন মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণায় স্বীকৃত। শিক্ষা ও সাক্ষরতা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ায়, লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে, জ্ঞান ও সম্ভাবনা বিকাশে সহায়তা করে এবং বৃহৎ সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ করতে সহায়তা করে থাকে।
এদিকে উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ অর্জনে বয়স্ক সাক্ষরতার গুরুত্ব এবং এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আশংকাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। কোটি কোটি মানুষকে নিরক্ষর রেখে উন্নয়নের বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না কথাটি বেশীরভাগ মানুষই স্বীকার করলেও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বয়স্ক সাক্ষরতার গুরুত্ব এবং উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই নামে মাত্র।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের মধ্যে ‘সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষার’ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলে হয়তো বয়স্ক সাক্ষরতা বিষয়টি আর প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন আসলেই কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একই সাথে নিরক্ষর মানুষদের এখনই সাক্ষর করে তোলা না গেলে অন্য লক্ষ্যসমূহ অর্জনও পিছিয়ে পড়তে পারে।
তাই বয়স্ক সাক্ষরতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে রীতিমতো ক্যাম্পেইন করার প্রয়োজন রয়েছে। একইসাথে খুঁজে বের করা প্রয়োজন যে যারা বয়স্ক সাক্ষরতায় বিনিয়োগের পরিমান ঠিক করেন (যেমন: দাতা সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকার) তাঁদেরকে বয়স্ক সাক্ষরতার বিষয়ে পুনরায় আগ্রহী করে তোলার পন্থা ও কৌশলসমূহ। আর এই সকল কাজে যেটি সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেটি হলো বয়স্ক সাক্ষরতা নিয়ে আগ্রহী সংগঠন, নিরক্ষর মানুষ এবং নেটওয়ার্কসমূহের একসাথে আসা এবং মিলিতসুরে জোরালো যুক্তিতর্কসহ কথা বলা।
সাধারণত সাক্ষরতা বলতে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্নতাকে বোঝায়। তবে এক সময় শুধু স্বাক্ষর জ্ঞানকেই সাক্ষরতা বলা হতো। কিন্তু দিন দিন এর পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে সাক্ষরতা শব্দের প্রথম উল্লেখ ১৯০১ সালে লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে। তখন স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০’র দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। আর ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার পাশাপাশি সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে সাক্ষরতার আর সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
যে দেশের সাক্ষরতার হার যত বেশি সে দেশ তত উন্নত। স্বাক্ষর জাতি সচেতন জাতি।
শিক্ষা সাধারণত তিনটি উপায়ে অর্জিত হয়।। আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক। যারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত বা যারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি তাদের স্বাক্ষরতার জন্য উপানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা দেয়া হয়।
বাংলাদেশে সরকারি প্রচেষ্টার বাইরে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হারকে বৃদ্ধি করতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। আসুন আমরা সচেতন হই।
এফএফ





