গাজায় ইসরাইলি হামলা আজ মঙ্গলবার ( ১৫ জুলাই, ২০১৪ ) অষ্টম দিনে পৌঁছালো। মঙ্গলবার অস্ত্রবিরতি ঘোষণা দিয়ে বিকেল থেকে আবারো হামলা শুরু করেছে ইহুদিবাদী এ রাষ্ট্রটি। মঙ্গলবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৯২ জন ফিলিস্তিনি।
ইসরাইল, ইহুদি ও ফিলিস্তিন নিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাকের একটি নিবন্ধ টাইমনিউজের পাঠকদের জন্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। গতকাল (১৪ জুলাই) প্রকাশিত হয়েছে নিবন্ধের প্রথম অংশটি। আজ দ্বিতীয় অংশটি প্রকাশ করা হলো-
ইসরাঈলের ইতিহাস :
৬৩৬ খৃষ্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে ফিলিস্তিন সর্বপ্রথম ইসলামী খিলাফতের অধিকারভুক্ত হয়। অতঃপর দীর্ঘ চারশ বছর পর ১০৯৬ সালে ক্রসেডাররা মুসলামানদের হাত থেকে ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। পুনরায় ১১৮৭ সালে গাজী সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর নেতৃত্বে মুসলামানরা জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে। ১৫১৭ সালে সুলতান প্রথম সেলিম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রটি মামলুক সুলতান কানজুল ঘোরীর নিকট থেকে উসমানীয় খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
১৯১৮ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন কার্যত ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। ইতিমধ্যে উসমানীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে আরব ভূখন্ডে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ধীরে ধীরে শুরু হতে থাকে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মক্কার ইমাম বা শাসক ছিলেন শরীফ হুসাইন। তিনি এ আন্দোলনের গতিবৃদ্ধিতে বিস্তর ভূমিকা রাখেন। ঠিক এই সময়ের কিছু আগেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জায়নিজম (Zionism) নামে একটি আন্দোলন শুরু হয়। এই জায়নিজম আন্দোলনের উদ্ভব হয় ভিয়েনা শহরে। থিওডর হারজল নামক একজন হাঙ্গেরীয় ইহুদী সাংবাদিক ভিয়েনার ইহুদীদের নিয়ে শুরু করেন জায়োনিস্ট আন্দোলন। ১৮৯৭ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডে প্রথম ‘আন্তর্জাতিক জায়োনিস্ট কংগ্রেস’ আহবান করেন (অধ্যাপক কে আলী, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, পৃঃ ৩৩৮)।
এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ইহুদীদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি তৈরী করা। এই উদ্দেশ্যকে সামান রেখে থিওডর দাবী করলেন, প্যালেস্টাইন ছিল ইহুদীদের আদি নিবাস। অতএব সব ইহুদীকে সেখানে ফিরে যেতে হবে, গড়তে হবে পৃথক আবাসভূমি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা শরীফ হুসাইন প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি তুরস্কের বিরুদ্ধে বৃটেনকে সহযোগিতা করবেন। আর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে আরব সাম্রাজ্য গড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিলাতে এসিটনের দারুণ অভাব দেখা দেয়। ওই সময় জায়োনিস্ট আন্দোলনের কুখ্যাত নেতা ও রসায়নবিদ হাইম ওয়াইজম্যান। যিনি বিলেতের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে বলেন, তিনি এসিটন উৎপাদন করতে পারবেন। ব্রিটিশ সরকারকে তিনি এ বিষয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করতে রাজি তবে শর্ত হচ্ছে যে, যুদ্ধে জিতলে প্যালেস্টাইনে গড়তে দিতে হবে ইহুদীদের বিশেষ আবাসভূমি। (এবনে গোলাম সামাদ, ইহুদীদের জাতীয় পরিচয়, নয়া দিগন্ত, ১৯ জানুয়ারী ২০০৯, পৃঃ ৬)।
ইহুদীদের দাবী অনুযায়ী ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার নানা স্বার্থকে সামনে রেখে ইহুদীদের জাতীয় আবাসভূমি সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এটাকে ‘বেলফোর ঘোষণা’ (Belfour Declaration) বলা হয় (মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস, পৃঃ ৩৩৮)। এখান থেকেই শুরু ফিলিস্তিন সমস্যার। যাহোক প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হারার পর ফিলিস্তিন চলে আসে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে বহু ইহুদী ইউরোপ থেকে গিয়ে প্যালেস্টাইনে বসবাস করতে শুরু করে। তারা কিনতে শুরু করে জলাভূমি। ইহুদীরা এসব জলাভূমি সেচে বের করে আবাদি ভূমি। এরকম একটি জলাভূমি সেচে তারা তৈরী করে তেল আবিব শহর এবং প্রতিষ্ঠা করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। ক্রমে ক্রমে আরবগণ নিজ দেশে পরবাসীতে পরিণত হতে থাকে।
ব্রিটিশ সরকারের নীতির ফলে আরবদের অসন্তোষ বেড়ে চলল। এ অসন্তোষ আত্মপ্রকাশ পেল আরব-ইহুদী দাঙ্গার মধ্য দিয়ে। ১৯২১, ১৯২৯ ও ১৯৩৬ খৃষ্টাব্দে আরব ও ইহুদীদের মধ্যে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তাতে অসংখ্য লোক হতাহত হয়। ব্রিটিশ সরকার সামরিক শক্তির সাহায্যে এসব দাঙ্গা বন্ধ করে। ১৯৩৬ সালে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ব্রিটিশ সরকার একটি ‘রয়েল কমিশন’ (Royal Commission) নিয়োগ করে। কিন্তু এই কমিশনের প্রস্তাব আরব-ইহুদী উভয়ই প্রত্যাখ্যান করে। ফলে কোন সমাধান ছাড়াই আরব-ইহুদী সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনের অবস্থার পরিবর্তন হলো। আরব ও ইহুদীরা কিছু সময়ের জন্য সংগ্রাম হতে বিরত হয়ে মিত্রশক্তির খেদমতে আত্মনিয়োগ করলো। এ সময় ইহুদীরা আমেরিকার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তাদের সাহায্য লাভ করে। আমেরিকারও মধ্যপ্রাচ্যে একটি শক্তিশালী ঘাঁটির প্রয়োজন ছিল। সে মনে করল আরব-ইহুদী দ্বন্দ্ব তার সে প্রয়োজন মেটাতে পারে। সুতরাং সে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জাতীয় আবাসভূমি সৃষ্টির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানালো।
১৯৪২ সালে ডা. হাইম ওয়াইজম্যান ও আরও কয়েকজন ইহুদী নেতা আমেরিকার সাথে এক বৈঠকে মিলিত হয় এবং সেখানে বিটমোর প্রোগ্রাম (Bitmore Programme) নামে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। এ প্রস্তাব অনুসারে ইহুদী সাধারণতন্ত্র হিসাবে ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার দাবী করা হয়। এ সংবাদে সমগ্র আরব জাহান ক্ষেপে ওঠে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৫ সালে আরব লীগ গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে আরব লীগের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাশ হয় ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে ইসরাইল নামে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এর প্রেসিডেন্ট হন হাইম ওয়াইজম্যান।
জাতিসংঘের অবিচারে হতাশ হয়ে আরব বিশ্ব সশস্ত্র পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। আরব লীগের সমস্ত সদস্য অস্ত্রশক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালে ইহুদী ও আরবদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বাধে। আরবগণ যখন নিশ্চিত বিজয়ের পথে তখন জাতিসংঘ ৪ সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি করতে বলে। এই সুযোগে ইসরাঈল আমেরিকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করে। অন্যদিকে উদ্বাস্তুবেশে আমেরিকাও সৈন্য পাঠায়। ফলে ইহুদীরা প্রভূত শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়। অতঃপর পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে আরবরা আর পেরে উঠেনি। ইহুদীরা ফিলিস্তিনের একটি অংশ অধিকার করে ইসরাঈল নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে দীর্ঘ ষড়যন্ত্র-সংগ্রামের পর ইহুদীরা একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হয়।
৬০ বছরের রক্তস্নাত পথ :
ইসরাঈল নামক অবৈধ রাষ্ট্রটির জন্মলাভের পর থেকেই তার ভিতরে লুকানো পশুবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ ক্রমেই ঘটতে থাকে। ১৯৪৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত দীর্ঘ ৬১ বছরে ইসরাঈল যে বর্বরতা ও পাশবিকতা দেখিয়েছে তা মানুষ কোন দিন কল্পনাও করেনি।
১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন-ইসরাঈল যুদ্ধের সময় পশ্চিমতীর জর্ডানের এবং গাজা মিশরের দখলে চলে আসে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ৬ দিনের ভয়াবহ যুদ্ধে ইসরাঈল পুনরায় সেগুলো দখল করে নেয়। ১৯৮২ সালে ইসরাঈল লেবাননে আগ্রাসন চালিয়ে ১৭ হাজার ৫০০ মানুষকে হত্যা করে। এদের বেশীর ভাগই ছিলেন নিরীহ জনসাধারণ। ওই একই বছর লেবাননের শাবরা-শাতিলা গণহত্যায় ১৭০০ নিরীহ মানুষ নিহত হয়। লেবাননে ইসরাঈলের উপর্যুপরি আক্রমণে ইয়াসির আরাফাত তাঁর পিএলও-এর ঘাটি বৈরুত থেকে তিউনিশিয়ার রাজধানী তিউনিসে সরিয়ে আনেন। তাতেও রক্ষা হয়নি। তিউনিসেও ১৯৮৬ সালে হামলা চালিয়ে বহু লোককে হত্যা করে ইসরাঈল।
এরপর ১৯৯৬ সালে কানা গণহত্যায় নিহত হয় ১০৬ সাধারণ লেবাননী জনগণ। এরা ছিল জাতিসংঘ আশ্রিত এবং নিহতদের অনেকেই ছিল শিশু। ২০০৬ সালে তারা লেবাননের মারওয়াহিন গ্রামের অধিবাসীদের ঘরবাড়ী ছেড়ে চলে যেতে বলে। সবাই তা মেনে নিয়ে রাস্তায় নামতেই হেলিকপ্টার থেকে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয় (রবার্ট ফিস্ক, কেন পশ্চিমা বিশ্বকে তারা ঘৃণা করে, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ৭ জানুয়ারী, ২০০৯ অনুবাদ: মু. আবু তাহির, নয়া দিগন্ত, ১১ জানুয়ারী ২০০৯,পৃঃ ৬)।
ঢাকা, ১৫ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) এমএ





