"সাক্ষরতা আর দক্ষতা টেকসই সমাজের মূলকথা"-এ স্লোগানকে সামনে রেখেই পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস।

আজ ৮ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো নিরক্ষর মানুষের মধ্যে অক্ষরজ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে জাতিসংঘ এবং ইউনেস্কোর সদস্য হিসেবে সকল উন্নত এবং উন্নয়শীল দেশ প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচিরমাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদ্যাপন করে আসছে।

এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে আজ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ বাংলাদেশসহ জাতিসংঘভূক্ত সকল দেশ এ বিষয়ে যথাযথ কর্মসুচি গ্রহণ করেছে।

এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো খরঃবৎধপু ধহফ ঢ়বধপব. এ প্রতিপাদ্যের আলোকে শ্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সাক্ষরতাই উন্নতি, আসবে দেশে শান্তি’। মানব জীবনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন রকম পরিস্থিতি।

শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে বলে পারিবারিক মূল্যবোধসমূহ হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষের জ্ঞান, বিবেক-বুদ্ধি, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বিকাশই হচ্ছে শিক্ষা।

শিক্ষা কল্যাণকর, কল্যাণমুখী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য খুবই জরুরী। কেবলমাত্র, সুশিক্ষাই হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।

শিক্ষা সকলের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর ও সদাসচেষ্ট। দিবসটি পালণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকার ঘোষিত ‘রূপকল্প-২০২১’ এর অন্যতম লক্ষ্য ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়া যা অত্যন্তসময়োপযোগী। এ লক্ষ্য অর্জনে সকল স্তরের নাগরিককে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

স্বাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে শুধু লেখাপড়া নয়, মানুষের জ্ঞান, সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায় যা সুস্থ সমাজ ও উন্নত দেশ গঠনে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদের কোন বিকল্প নেই।

বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং দেশের নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

এর আলোতে সরকার ইতোমধ্যে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ এবং ‘ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করেছে।

তবে দেশে স্বাক্ষরতার হার নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যেই।

২০১১ সালে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবসে ও দিবসের প্রাক্কালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী, সচিব ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক স্বাক্ষরতার হার নিয়ে তিন ধরনের তথ্য দিয়েছিলেন।

মন্ত্রী বলেছিলেন, বর্তমানে দেশে স্বাক্ষরতার হার ৫৮ শতাংশ। “শিশু জরিপের তথ্যানুযায়ী এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে” বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। এর আগের দিন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দেশে স্বাক্ষরতার হার ৫৩ শতাংশ।

অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছিলেন, দেশে সাক্ষরতার হার ৫৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত স্মরণিকায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে জনগোষ্ঠীর স্বাক্ষরতার হার ৪৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ৭ বছরের ঊর্ধ্বে জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৫৩ শতাংশ। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ নিরক্ষর বলে বিবিএস’র ওই জরিপে বলা হয়।

এদিকে দেশে তিন কোটির ওপরে নিরক্ষর জনগোষ্ঠী রয়েছে। দেশের এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতার আওতায় আনতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

২০০৯ সালের জরিপের দেখা যায় দেশে নিরক্ষরের সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৭০ লাখ। সরকারের সাক্ষরতা কর্মসূচি কার্যকর থাকায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ নিরক্ষর কমে এসেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১০ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৫৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। বিদ্যালয়গামী শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তির হার ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

এদের মধ্যে ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে। তবে মিড-ডে মিল (দুপুরের খাবার) কর্মসূচি চালু থাকা বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার ৯৬ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে দার্শনিক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকগণ মনে করেন, বক্তিগত ও পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পিস একুকেশন বা শান্তির শিক্ষার বিস্তরণ করা উচিত।

শান্তিময় সহবস্থান ও মূল্যবোধ সম্পন্ন জাতি গঠনের জন্য এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। পৃথিবীব্যাপী শিক্ষা একটি অন্যতম মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত যা বিভিন্ন মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণায় স্বীকৃত।

শিক্ষা ও সাক্ষরতা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ায়, লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে, জ্ঞান ও সম্ভাবনা বিকাশে সহায়তা করে এবং বৃহৎ সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণ করতে সহায়তা করে থাকে।

এদিকে উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ অর্জনে বয়স্ক সাক্ষরতার গুরুত্ব এবং এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আশংকাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

কোটি কোটি মানুষকে নিরক্ষর রেখে উন্নয়নের বিভিন্ন লক্ষ্য (যেমন : সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ) অর্জন সম্ভব না কথাটি বেশীরভাগ মানুষই স্বীকার করলেও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বয়স্ক সাক্ষরতার গুরুত্ব এবং উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই নামে মাত্র।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের মধ্যে ‘সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষার’ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলে হয়তো বয়স্ক সাক্ষরতা বিষয়টি আর প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন আসলেই কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

একই সাথে নিরক্ষর মানুষদের এখনই সাক্ষর করে তোলা না গেলে অন্য লক্ষ্যসমূহ অর্জনও পিছিয়ে পড়তে পারে। তাই বয়স্ক সাক্ষরতায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে রীতিমতো ক্যাম্পেইন করার প্রয়োজন রয়েছে।

একইসাথে খুঁজে বের করা প্রয়োজন যে যারা বয়স্ক সাক্ষরতায় বিনিয়োগের পরিমান ঠিক করেন (যেমন: দাতা সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকার) তাঁদেরকে বয়স্ক সাক্ষরতার বিষয়ে পুনরায় আগ্রহী করে তোলার পন্থা ও কৌশলসমূহ।

আর এই সকল কাজে যেটি সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেটি হলো বয়স্ক সাক্ষরতা নিয়ে আগ্রহী সংগঠন, নিরক্ষর মানুষ এবং নেটওয়ার্কসমূহের একসাথে আসা এবং মিলিতসুরে জোরালো যুক্তিতর্কসহ কথা বলা।

সাধারণত সাক্ষরতা বলতে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্নতাকে বোঝায়। তবে এক সময় শুধু স্বাক্ষর জ্ঞানকেই সাক্ষরতা বলা হতো। কিন্তু দিন দিন এর পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে সাক্ষরতা শব্দের প্রথম উল্লেখ ১৯০১ সালে লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে।

তখন স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০’র দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো।

আর ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার পাশাপাশি সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়।

বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।

আবার আর এক তথ্য মতে সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৬২ দশমিক ৬৬ ভাগ।

তবে ইউনেস্কোর তথ্য মতে, বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৪৭ দশমিক ৫০ ভাগ। সাক্ষরতার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম।

প্রথমে জর্জিয়া। এদেশের সাক্ষরতার হার ১০০ ভাগ। যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কিউবা, ইস্টোনিয়া ও পোল্যান্ড।

এদের সাক্ষরতার হার ৯৯ দশমিক ৮০ ভাগ। ৯৯ দশমিক ৭০ ভাগ সাক্ষরতা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বারবাডোস।

তবে বিশ্বের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ১৮তে। এ দেশের সাক্ষরতার হার ৯৯ ভাগ।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১৪৭ ও ১৬০তে। এ দেশ দু’টিতে সাক্ষরতার হার যথাক্রমে ৬১ ও ৪৯ ভাগ।

সাক্ষরতায় সর্বনিম্নে অবস্থানকারী দেশ বারকিনো ফ্যাসো। ১৭৭তে অবস্থানকারী এ দেশটির সাক্ষরতার হার ২৩ দশমিক ৬০ ভাগ।

এসএইচ