দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানের হিরোশিমা শহরে ফেলা হয় বিশ্বের প্রথম পরমাণু বোমা। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে ফ্যাটম্যান নামের নিউক্লিয় বোমার বিস্ফোরণের মর্মান্তিক ঘটনা সারা বিশ্বকে হতবাক করে দেয়।
তখনও ঘুম থেকে জেগে ওঠেনি হিরোশিমার মানুষ। সকাল ৮টা বেজে ১৫ মিনিট।
হঠাৎই দানবের মতো হিরোশিমার আকাশের নীলিমায় উদয় হল মার্কিন বি টুয়েন্টিনাইন বোমারু বিমান এনোলা গ্রে।

কল্পকথার আগুনমুখো ড্রাগনের মতো সেখান থেকে হিরোশিমার একটি হাসপাতালের ১ হাজার নশো ফুট ওপর বিস্ফোরিত হয় বিশ্বের প্রথম আণবিক বোমা লিটল বয়।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই আণবিক বোমার বিষাক্ত ছোবলে মারা গেল ৮০ হাজার মানুষ। আহত হল আরও ৩৫ হাজার। ঘুমের মধ্যে মারা গেল নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবক। মাটির সঙ্গে মিশে গেল বেশির ভাগ দালান-কোঠা।
হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসার জন্য বেঁচে রইল খুব অল্পসংখ্যক চিকিৎসক ও সেবিকা। মুহূর্তের মধ্যে যেন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল ছবির মতো সুন্দর জাপানের ছোট্ট শহর হিরোশিমা।
এখানেই শেষ নয় বছর না ঘুরতেই আণবিক বোমার ভয়াবহ তেজস্বক্রিয়তায় মারা যায় আরও ৮০ হাজার জাপানি। কেন চালানো হল এই হামলা ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের আত্মসমর্পণের আহ্বানে জাপান সাড়া না দেওয়ায় তাঁর নির্দেশেই ঠান্ডা মাথায় হিরোশিমায় চালানো হয় নারকীয় এই হামলা। এর উদ্দেশ্যে ছিল দু’টি।
এক হল জাপানিদের জব্দ করা, আরেক হল যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। এখনও সে দিনের সেই হামলার দু:সহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে হিরোশিমার মানুষ।
আণবিক বোমা হামলার এত বছর পরও শহরে জন্ম নিচ্ছে বিকলাংগ শিশু, ক্যনসারসহ দুরারোগ্য ব্যধিতে ভুগছে বহু মানুষ।
হিরোশিমা দিবস এলেই তাই পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা --আর নয় যুদ্ধের নামে মারণাস্ত্রের ঝনঝনানি আর নয় কোনও ঠান্ডা মাথার হত্যাযজ্ঞ।
যদিও পরিহাস এটাই যে , এখনও যখন যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে কোনও আলোচনা হয়, তখন মনে করা হয়, আগামী বিশ্বযুদ্ধ হবে আণবিক যুদ্ধ। যদিও সেই যুদ্ধের বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সব পক্ষই।
জানা যায়, পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। পরে ২৫ জুলাই জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে এটি ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬ আগস্ট বিশাল আকৃতির বি-২৯ ইনোলা গে বিমান লিটল বয় নামে একটি ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বোমা নিয়ে হিরোশিমার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। বোমাটি লম্বায় ছিল ৩ মিটার এবং ব্যাস ছিল ৬০ মিটার।
ওই দিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে প্লেন থেকে বোমাটি নিচের দিকে নিক্ষেপ করা হলে হিরোশিমা শহরের মাটি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার ওপরে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের মুহূর্তকালের মধ্যে সব দৃশ্যপট পাল্টে গিয়েছিল।
সেদিন প্রায় ১৪০,০০০ লোক নিহত হয়েছিলেন। আর তার প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ অগ্নিদগ্ধ কিংবা আহত হয়ে পরে পারমাণবিক তেজষ্ক্রিয়তায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।
হিরোশিমার এ ভয়ঙ্কর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র তিনদিন পর তিনিয়ন দ্বীপ থেকে বি-২০ নামে একটি প্লেন দ্বিতীয় বোমাটি নিয়ে নাগাসাকির উদ্দেশে রওনা হয়।
এ বোমাটির নাম দেয়া হয়েছিল ফ্যাটম্যান। বোমাটি ছিল গোলাকার প্লুটোনাম মিসাইল, যা লম্বায় ছিল ৪ মিটার এবং ব্যাস ছিল ২ মিটার। নাগাসাকি শহরে ৯ আগস্ট বেলা ১১টা ২ মিনিটে বোমাটি মাটি থেকে ৫০০ মিটার উপরে বিস্ফোরিত হয়।
নিমেষে ঝরে গিয়েছিল প্রায় ৭৪,০০০ প্রাণ। আহত হয় ৭৪,৯০৯ জন। আর এর জন্য ভোগান্তির শিকার হয় প্রায় ১,২০,৮২০ জন।
.jpg)
প্রতিবছর স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৮টায় হিরোশিমার পিসপার্কে নীরবতা পালন ঘণ্টাধ্বনি আর প্রার্থনার মধ্যদিয়ে ভয়াবহ সেই দিনটিকে স্মরণ করে জাপানের মানুষ। এ বছরও তা ব্যতিক্রম হয় নি।
১১ হাজারেরও বেশি মানুষ আনবিক বোমার আঘাতে নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি আকাশে পায়রা উড়িয়ে প্রার্থনা করেন বিশ্ব শান্তির জন্য। দিনটি উপলক্ষে পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন।
হিরোশিমা-নাগাসাকির অভিজ্ঞতার আলোকে পৃথিবী থেকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হোক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
নিশ্চিত হোক বারুদের গন্ধমুক্ত সুন্দর পৃথিবী, যেখানে নতুন প্রজন্মের জন্য থাকবে নিশ্চিত নিঃশ্বাস এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
এমকে/এসএইচ





