অ্যাজমা বা হাঁপানিএকটি দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ। সাধারণত শিশু বয়স থেকেই এটি হতে দেখা যায়। অ্যাজমা হলে শ্বাসনালি বেশিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই সময় শ্বাসনালি বিভিন্ন উত্তেজনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাতাস যাওয়া-আসার পথে বাধার সৃষ্টি করে। এতে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট হয়।

অ্যাজমার কিছু লক্ষণ

কফ: বুকে কফ হওয়া অ্যাজমার একটি প্রচলিত লক্ষণ। কফের প্রকোপ সাধারণত রাতে ও ভোরে বাড়ে। কখনো কখনো খুব বেশি কফ হয়। ঘন ঘন কাশি হয়, ঠান্ডা লাগে।

ছোট শ্বাস: শ্বাস ছোট হয়ে যাওয়া অ্যাজমার আরেকটি লক্ষণ। অ্যাজমা হলে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়।

বুকের ভেতর শব্দ হওয়া: অ্যাজমা হলে বুকের ভেতর বাঁশির মতো সাঁই সাঁই শব্দ হয়। বিশেষ করে শ্বাস ছাড়ার সময় এই সমস্যা হয়।

কথা বলতে ও ঘুমাতে অসুবিধা:বুক ভার লাগা, শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা হওয়া ইত্যাদি ছাড়াও অ্যাজমা হলে কথা বলতে অসুবিধা হয়। এ ছাড়া রাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কারণে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয়।

বুক ভার লাগে: বুকে ভার লাগা বা বুকের ভেতর চাপ অনুভূত হওয়া এ রোগের আরেকটি লক্ষণ। এই কারণে শ্বাস ভালোভাবে নেওয়া যায় না।

ডা. মো. আজিজুর রহমান বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বলেন,হাঁপানি চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উত্তেজক পদার্থ, যা থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তা থেকে দূরে থাকা। সাধারণত এগুলো হলো ধুলাবালি ও ধুলার পোকা (ডাস্ট মাইট), ঝুল, পাখির পালক, পশুর লোম, ফুলের রেণু, বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া, কারখানার ধোঁয়া, সুগন্ধি, রাসায়নিক ইত্যাদি।

এ ছাড়া ঠান্ডা হাওয়া, ভাইরাস সংক্রমণ, পরিবেশদূষণ, কিছু ওষুধ, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা আবেগজনিত কারণেও হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। হাঁপানি নির্ণয়ে রোগের ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস ও বুকের শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া স্পাইরোমিটার দিয়ে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা দেখা হয়।

হাঁপানির চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও ইনহেলার ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় এগুলো ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া মেনে চলতে হবে কিছু নিয়ম। যেমন হাঁপানি রোগী পশুপাখি, ধুলাবালি, ঝুল ইত্যাদি থেকে দূরে থাকবেন, ধূমপান করবেন না।

উলের কম্বল, পালকের বালিশ ব্যবহার করবেন না, সপ্তাহে এক দিন গরম পানিতে তোয়ালে, বালিশের কভার, চাদর ইত্যাদি ধুয়ে নেবেন। কড়া সুগন্ধি বা যেকোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আগে সতর্ক হোন। হাঁপানি সম্পূর্ণরূপে নিরাময় বা নির্মূল করা যায় না, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে ভালো থাকা যায়।

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস অ্যালার্জি ও অ্যাজমা রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, চিকিৎসকের সহায়তা ও তত্ত্বাবধানে অ্যাজমা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা যায়। এতে দিনের কোন সময় কোন ওষুধ গ্রহণ করতে হবে এবং কোন পরিবেশ-পরিস্থিতিতে রোগের ঝুঁকি বাড়ে তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ডাক্তারের নির্দেশিত ওষুধগুলোই সেবন করুন। এতে শ্বাসনালীর প্রদাহ ও ফুলে ওঠা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগ নিয়েও সুস্থ থাকা যায়।

যে কারণে রোগের ঝুঁকি বাড়ে তা কীভাবে ম্যানেজ করতে হবে সে ব্যাপারে রোগীকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে।

রোগীর সঙ্গে অ্যাজমা কার্ড থাকবে, যাতে তিনি যে একজন অ্যাজমা রোগী তা নির্দেশিত থাকবে এবং মারাত্মক অ্যাজমায় আক্রান্ত হলে তার চারপাশের লোকজনের করণীয় সম্পর্কে লেখা থাকবে।

অ্যাজমা বা হাঁপানি খুবই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রোগ। শিশুদের ক্ষেত্রে ৮০%-এর বেশি অ্যাজমাই অ্যালার্জিজনিত, তাই অ্যালার্জি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ তিনিই অ্যালার্জি টেস্ট করে বলে দিতে পারবেন শিশুর অ্যালার্জির কারণ কি। অ্যালার্জি শনাক্ত করলেই অ্যালার্জি জনিত রোগের সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে অ্যাজমা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

প্রতিবছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালিত হয়। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব অ্যাজমা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো 'অ্যাজমার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই'।

এ দিবসের লক্ষ্য অ্যাজমা আক্রান্তদের জন্য সচেতনতা, সেবা এবং সমর্থন গড়ে তোলা। বিশ্ব অ্যাজমা দিবস হলো (GINA -The Global initiative for asthma) কর্তৃক সমর্থিত যা বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সচেতনতা গড়ে তোলার ব্যাপারে সাহায্য করতে কাজ করছে।

বিশ্ব অ্যাজমা দিবস ওয়ার্ল্ড অ্যাজমা ফাউন্ডেশন কর্তৃকও সমর্থিত। বিশ্ব অ্যাজমা দিবস ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো চালু হয়। প্রথমবার দিবসটি স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব অ্যাজমা সম্মেলনের সঙ্গে একই দিনে উদযাপন করা হয়। ৩৫টিরও বেশি দেশ এতে যোগদান করেছিল।

এমবি