আগামী জানুয়ারিতে সম্ভাব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলনের ছক তৈরি করছে জামায়াতে ইসলামী। এজন্য সংগঠন, আন্দোলন ও নির্বাচন- এই তিন কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছেন তারা। জামায়াত-শিবিরের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তারা বলছেন, ২০ দলীয় জোটের ঘোষিত আন্দোলন এখনই চূড়ান্ত রূপ নেবে না। বিশেষ করে ঈদুল আজহার আগে নানা কারণে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সরকার পতন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের পটভূমি তৈরি করতে ধীর লয়ে হলেও আন্দোলন চালাতে হবে। সেই বিবেচনায় নভেম্বর-ডিসেম্ভর চূড়ান্ত আন্দোলন এবং জানুয়ারিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত।
দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এই বার্তা পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। এজন্য ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে জেলা উপজেলা পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে মাঠ পর্যায়ের পুরনো নেতৃত্ব। উপজেলা নির্বাচনের সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি যে কোন সময় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নতুন নেতৃত্বের প্রতি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র মতে, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন-পূর্ববর্তী আন্দোলনে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জামায়াতের। আগামী দিনের আন্দোলনে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চান তারা। এ জন্য এবার আগে জোটের প্রধান দল বিএনপি’র অবস্থান বুঝে আন্দোলনের কৌশল নেবে জামায়াত।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদায়ী বছরের আন্দোলনে দেশব্যাপী সহিংসতা ও জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন জামায়াতের কারাবন্দি শীর্ষ নেতারা। আত্মগোপনে থাকা দায়িত্বশীল নেতারাও এতে বেশ বেকায়দায় পড়েন। দলের ওপর দিন দিন বাড়তে থাকে ক্ষয়ক্ষতির বোঝা। এই ক্ষতি রোধে তারা জরুরি বার্তা পাঠান দায়িত্বশীলদের কাছে। নির্দেশ দেন কৌশলী কর্মসূচি দিতে- যাতে দলের জনশক্তির ক্ষয়ক্ষতি আর না হয়। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতিও যেন আর না বাড়ে।
দশম সংসদ নির্বাচনের পর এই বার্তা দ্রুত পৌঁছে যায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে। সূত্রমতে, জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রতিক্রিয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েন জামায়াতের নীতিনির্ধারণী মহল। এই দুই ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় ১৯৮ শিবির কর্মীর প্রাণহানি ঘটে।
তবে এ সব সহিংসতার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু এবং দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল বাতিল দাবিও যুক্ত ছিল। কিন্তু সেই আন্দোলন সফল না হওয়ায় তোপের মুখে পড়ে জামায়াত। তাই এই ইস্যুতে আসন্ন আন্দোলনে নেতাকর্মীদের লাশের সারি আর বাড়তে দিতে চান না শীর্ষ নেতারা। তারা আইনজীবী এবং কারাগারে সাক্ষাতে যাওয়া নিকটজনের মাধ্যমে সেই বার্তা দিয়েছেন নেতাকর্মীদের কাছে। বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের মামলায় আটক নেতাদের যা হওয়ার হোক- এক্ষেত্রে কেবল আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের এই বার্তার দ্রুত প্রতিফলন দেখা গেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচির পালনের প্রথম দিন ২৯শে ডিসেম্বর রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের গুলিতে এক শিবির নেতা নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে তারা যতটা সম্ভব ঝুঁকিমুক্ত থেকে বিক্ষিপ্ত মিছিল করেছে।
সমপ্রতি সমপ্রচার নীতিমালা এবং গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশে একই চিত্র দেখা গেছে। বিষয়টি স্বীকার করে শিবিরের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, বিগত আন্দোলনে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারও করেছি। কিন্তু সহযোগী ছাত্র সংগঠনের জোরালো ভূমিকা না থাকায় সুফল পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মার্চ ফর ডেমোক্রেসিতে মাঠে নামার জন্য ঢাকায় বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী কমপক্ষে ২০ জনকে স্বয়ং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া ফোন করে মাঠে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু দলের চেয়ারপারসনের ওই নির্দেশ কেউ পালন করেননি। কোন নেতা একবারের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা পর্যন্ত করেননি।
শরিক দলের এক নেতা বলেছেন, শত বাধা-বিপত্তির পরও জামায়াত ওই দিন অর্ধ লাখের বেশি নেতাকর্মী সমর্থক মাঠে নামাতে প্রস্তুত ছিল। এ জন্য ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার অনেক নেতাকর্মীকে আনা হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থকদের নীরবতায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
জামায়াত নেতারা বলেন, গত আন্দোলন বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাসে-ট্রেনে হামলায় নিরীহ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জামায়াতকে দায়ী করা হয়েছে। অথচ সরকারবিরোধী আন্দোলনে আমাদের কর্মীরা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। তবু আমাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের এক জেলা জামায়াতের আমীর বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যে হিসেবে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন সেটা কতটা সফল হবে, এতে সরকারের পতন হবে কিনা- তা এখনই বলা যাবে না। ‘জেলা পর্যায়ে আন্দোলন নিয়ে জোটে এখনও কথা হচ্ছে না’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিএনপি’র আন্দোলন জামায়াত-নির্ভর নয়। তবে পরিস্থিতি বলবে কি করতে হবে। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিতে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেনি বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তৃণমূলের এই নেতা।
তিনি বলেন, বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া ২০ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে জেলা পর্যায়ে নেতানির্ভর দল এলডিপি ও কাজী জাফরের কিছু অনুসারী আছেন। কিন্তু অন্য কোন দলের অস্তিত্ব নেই। তবু সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ইস্যু তৈরি করতে পারলে আন্দোলন জমবে। তবে এত অল্প সময়ে জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে খানিকটা সন্দেহ আছে। তবে জামায়াত তার শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করবে বলে জানান তিনি।
ফেনী জেলা জামায়াতের আমীর নাজিম ওসমানী বলেন, আমরা আন্দোলনের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকি। তবে ঈদের পর আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত বিশেষ কোন নির্দেশনা না এলেও যে কোন সময় মাঠে নামার প্রস্তুতি আমাদের আছে।
ফরিদপুর জেলা জামায়াত আমীর শামসুল ইসলাম বলেন, এ সরকারকে কুপোকাত করতে হলে সব দলকে সব শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। কখন কোন কৌশল লাগবে সেটা বুঝতে হবে। একদলীয় নেতার শাসনে যেমন আওয়ামী লীগ চলে, খালেদা জিয়াও তেমন ভূমিকা নিলে আন্দোলন কঠোর হবে। কি করতে হবে তা যদি তিনি জেলা নেতাদের বলে দেন তাহলে আন্দোলন সফল হবে।
কেন্দ্র থেকে আন্দোলনের বিষয়ে এখনও কোন নির্দেশনা আসেনি জানিয়ে এই জামায়াত নেতা বলেন, জোটবদ্ধ আন্দোলন করেছি, এখনও করছি। আগামীতেও করবো। সরকার পতনের আন্দোলনে আমরা সক্রিয় ভূমিকা রাখবো। ‘আন্দোলন সব সময়ই কোন না কোন ইস্যুভিত্তিক হতে হয়- এই অভিমত ব্যক্ত করে তিনি বলেন, হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, সেভেন মার্ডার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বড় বড় ইস্যু চলে গেল। সেগুলোকে ধরে আন্দোলন করা যেতো। এখন ইস্যু হতে পারে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি।
এদিকে আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপি’র আন্তরিকতায় সন্তুষ্ট নয় ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় খাবি খেতে থাকা দলটির আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপি গা-ছাড়া ভাব দেখানোয় তাদের মধ্যে খানিকটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জোটবদ্ধ আন্দোলন আশা করেছিলেন তারা।
তবে জামায়াতের এই প্রত্যাশা ও অসন্তুষ্টির জবাবে বিএনপি’র তৃণমূল নেতারা বলছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার জামায়াতের নিজস্ব এজেন্ডা। কারও ব্যক্তি অপরাধের দায় বিএনপি নেবে না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর বিএনপি কোন কর্মসূচি দেয়নি মন্তব্য করে তারা বলছেন, সে ক্ষেত্রে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের দায় নেয়ার প্রশ্নই আসে না। এ ইস্যুতে জোটবদ্ধ আন্দোলনের কোন সুযোগ নেই। কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার বিএনপিও চায়। তাই জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গড়ার অর্থ এই নয় যে, তাদের সব এজেন্ডায় গাঁটছড়া বাঁধতে হবে।
ফরিদপুর জেলা বিএনপি সভাপতি জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমিও চাই। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে আন্দোলন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কোন দূরত্ব তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেন শাহজাদা মিয়া।
তিনি বলেন, তবে এবারের আন্দোলনের ঢেউ আগে ঢাকায় উঠতে হবে। এর প্রভাব সারা দেশে পড়বে। ঢাকা নিরুত্তাপ থাকলে সারা দেশে আন্দোলন করে লাভ হবে না। বিষয়টি শীর্ষ নেতাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। (উৎসঃ মানবজমিন)
ঢাকা, ২৪ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, কেবি





