একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সন্ত্রাসী দলের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে গঠিত তদন্ত সংস্থার সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মতিউর রহমান টাইমনিউজকে এ সব কথা বলেন।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ বরাবর দাখিল করার প্রস্তুতি চলছে। অপরাধ বিষয়ে তদন্ত শেষ পর্যায়ে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত শুরু করেছি। তবে কবে দাখিল করবো সেটা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না।
তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় এ সংগঠনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন দলিল, তথ্য ও দলটির অন্যান্য তথ্যাদি সংগ্রহ করেছি। এসব দলিল ও তথ্য বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দলটির বিরুদ্ধে অভিযোগ  প্রস্তুত করতেছি।
৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালীন এ দলের ভূমিকা বিষয়ে বিভিন্ন দলিল এবং তার পরবর্তী সময়ে দলটির নানা কার্যক্রমও তদন্ত হচ্ছে বলে জানান তদন্ত অফিস। গতবছর ১৮ আগস্ট তদন্তের বিষয়টি নথিভুক্ত করে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কাজ শুরু করে তদন্ত সংস্থা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মতিউর রহমানকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়।
মতিউর রহমান বলেন, চারটি বিষয়কে সামনে রেখে এ তদন্ত কাজ প্রায় শেষের পথে রয়েছে। এগুলো হলো- মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা। এ ছাড়া ওই সময়ে জামায়াত কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনাগুলোর বিভিন্ন দলিল। ওই সময়ের দেশ-বিদেশে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা, দেশে ও দেশের বাইরের প্রথিতযশা ব্যক্তিদের লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ, নিবন্ধ। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত জামায়াতের কর্মকাণ্ডের বিবরণ, জামায়াত নেতাদের লিখিত বই, তাদের দেয়া বক্তব্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এসব থেকে প্রয়োজনীয় দলিল তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, ডকুমেন্ট ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের পাশাপাশি থাকছে ‘পলিসি উইটনেস’। রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে ট্রাইব্যুনালে সংগঠনটির বিষয়ে ‘পলিসি উইটনেস’ সাক্ষ্য দেবে। তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মতিউর রহমান বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন মামলায় ট্রাইব্যুনালে দেয়া রায়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভুমিকা বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াতের ইসলামীর আমীর গোলাম আযমের মামলা বিচারে সাক্ষ্য হিসেবে বিভিন্ন দলিল পেশ করা হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর বিষয়েও তদন্তে দলিল গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মতিউর রহমান বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার মামলায় রায় হয়েছে। দলটির আরো অনেকের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। এর মধ্যে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ও কার্যকর করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, গোলাম আযমের ৯০ বছর কারাদন্ড দিয়ে প্রথম ট্রাইব্যুনালে দেয়া রায়েও জামায়াতে ইসলামীসহ দলটির অন্যান্য সহযোগী সংগঠনকে সন্ত্রাসী, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলারও তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন মতিউর রহমান।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া মামলাগুলোর রায়ের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীকে অপরাধী সংগঠন বলা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তান রক্ষার নামে সশস্ত্র সহযোগী বাহিনী গঠন করে নিরস্ত্র বাঙালি, হিন্দু সম্প্রদায়, বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য জামায়াতে ইসলামী বিশেষ ভূমিকা রাখে।
জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক টাইমনিউজবিডিকে জানান, জামায়াতের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপক্ষ বরাবর দাখিল করার পস্তুতি চলছে। আশা করি ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে না হলেও এই মাসের মধ্যেই রাষ্ট্রপক্ষ বরাবর দাখিল করবো।
তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে দাখিল করবো কিন্তু সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রচুর সংখ্যক দলিল রয়েছে যার কারণে চেষ্টা করেও প্রতিবেদন প্রস্তুত করা যায়নি।
জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত টাইমনিউবিডিকে বলেন, সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে মামলার তদন্তের নথিপত্র ও দলিল ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির বরাবরে দাখিল করা হবে। তবে এটা বলতে পারি প্রতিবেদন দাখিলের পরে আমরা তা পর্য্যবেক্ষণ করবো, যদি দলটির অপরাধ মিলে তাহলে আদালত আমলে নিবেন।
তিনি বলেন, এই অভিযোগের উপর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জন্য উপস্থাপন করবো। ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করার পরে দলটির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হবে।
জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ব্যারিস্টার তুরন আফরোজ বলেন, জামায়াতে ইসলামী করার কারণেই একাত্তরে গোলাম আযম-নিজামীরা এই অপরাধ করেছে। সেই অনুযায়ী তাদের থেকেও জামায়াত অপরাধ করেছে বেশি। একারণেই জামায়াতের বিচার হওয়া উচিৎ। এই ধরণের সংগঠনের বিচার না করলে দেশে জঙ্গিবাদীদের সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। খুব দ্রুতই এই দলটির তদন্ত শেষ হবে। এই মাসেই তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেন বলেও তিনি আশা করেন।
[b]ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ৪ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জিই//এসএইচ[/b]