জাতীয় সমাজসেবা দিবস আজ (২ জানুয়ারি)। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে দিবসটি পালন করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন।এবারের প্রতিপাদ্য ‘সমাজসেবার উদ্ভাবন, এবার সেবায় ডিজিটাইজেশন’।
অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়া এবং পরের বিপদে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা একটি মহৎ গুণ। আমি তিনবেলা পেট পুরে খেতে পারি। বাসার নৈশ প্রহরী কুকুরকে নিত্য টাটকা গোশত খাওয়াই। দুই বেলা শাহী খাবার খেতে দেই। শ্যাম্পু ছাড়া গোসল হয় না।
অথচ পাশের বস্তিতে খাবার না পেয়ে অবোধ শিশুরা চিৎকার করে কাঁদে। ফল-ফ্রুটস খেতে খেতে আমার আদরের দুলালের অরুচি ধরে যায়। অথচ বাড়ির বুয়ার অভুক্ত সন্তানদের মুখে মৌসুমী ফলটি পর্যন্ত ওঠে না।
ফ্যাশন বদলের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের শীতবস্ত্র আর গ্রীষ্মের পোশাক বদল হয়। অথচ অদূরের গাঁয়েই কি-না শীতবস্ত্রের অভাবে গরীবের প্রাণ যায়।
ইসলাম মানব সমাজে বৈষম্য ও প্রভেদের কোনো সুযোগ রাখে নি। ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে।
অনাহারীর কষ্টের ভাগিদার হতে এবং দুখী বান্দার দুঃখে সমব্যথী হতে আল্লাহ তা‘আলা রমযানের সিয়াম ফরয করেছেন। দুঃখীর অভাব মোচনে যাকাত ফরয ও সাদাকুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে।
১) আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“এমন কে আছে যে, আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।” (সূরা আল -হাদীদ, আয়াত- ১১)
২)আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর আল্লাহ সংকীর্ণ করেন ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরানো হবে।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত- ২৬১)
৩) আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত- ২৬১)
৪) আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম করয দেয়, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।” (সূরা আল-হাদীদ, আয়াত- ১৮)
৫) আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শ্রবণ কর, আনুগত্য কর এবং তোমাদের নিজদের কল্যাণে ব্যয় কর, আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়, তারাই মূলত সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম ধৈর্যশীল।” (সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত- ১৬-১৭)
৬) আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর রূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত- ২০)
৭)আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“আর তাদের ধনসম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক।“ (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত-১৯)
৮)আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেছেন,“আর যাদের ধন-সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত হক, যাচ্ঞাকারী ও বঞ্চিতের।”(সূরা আল-মা‘আরিজ, আয়াত: ২৪-২৫)
এ ধরনের আরো অসংখ্য আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা মানবের সেবা ও সমাজের কল্যাণের নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন।
মানব ও সমাজসেবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আস্বস্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন,
১) আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাকে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে যায়।”(মুসলিম-৭০২৮, আবূ দাঊদ-৪৯৪৮, তিরমিযী-১৪২৫)
২) অপর হাদীসে রয়েছে, প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি, না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি, না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি’।
সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ‘সেই ব্যক্তি যার হঠকারিতা থেকে প্রতিবেশি নিরাপদ নয়।’ জিজ্ঞেস করা হলো, হঠকারিতা কী? তিনি বললেন, ‘তার অনিষ্ট বা জুলুম’।” (মুসনাদ আহমদ- ৮৪১৩, মুসনাদ বাযযার-২০২৬)
সম্পদের অপচয় করা অথচ নিকটস্থ অসহায়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করাও এক ধরনের জুলুম। একে অপরকে সাহায্য করা, একে অন্যকে যৎসামান্য হলেও কিছু দেয়াও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
৩) আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “হে মুসলিম নারীগণ, এক প্রতিবেশি যেন তার অপর প্রতিবেশির পাঠানো দানকে তুচ্ছজ্ঞান না করে, যদিও তা ছাগলের পায়ের একটি ক্ষুর হয়।” (বুখারী-২৫৬৬, মুসলিম-২২৬)
৪) রাসূলুল্লাহ (সা.) দারিদ্রক্লিষ্ট বনী আদম এবং অসহায় নারীদের সাহায্যে উদ্বুদ্ধ করেছেন ব্যাপকভাবে। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।’ (বর্ণনাকারী বলেন,) আমার ধারণা তিনি আরও বলেন, ‘এবং সে ওই সালাত আদায়কারীর ন্যায় যার ক্লান্তি নেই এবং ওই সিয়াম পালনকারীর ন্যায় যার সিয়ামে বিরাম নেই।” (বুখারী-৬০০৭, মুসলিম-৭৬৫৯)
মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে ইসলামের অতি আগ্রহ এবং অনন্ত প্রেরণার স্বাক্ষর হিসেবে আর কিছু নয় কেবল নিম্নোক্ত হাদীসে কুদসীই যথেষ্ট হতে পারে।
৫) আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “কেয়ামত দিবসে নিশ্চয় আল্লাহ তাআ’লা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করো নি। বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক। আপনিতো বিশ্বপালনকর্তা কিভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব?’
তিনি বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাও নি। তুমি কি জান না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে।?’
‘হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাও নি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কি জান না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাও নি। তুমি কি জান না যে, তুমি যদি তাকে আহার করাতে বে আজ তা প্রাপ্ত হতে।?’
‘হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাও নি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামীন তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাকে তুমি পান করাও নি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।” (মুসলিম-৬৭২১, সহীহ ইবন হিব্বান-৭৩৬)
এত সব আয়াত ও হাদীসকে সামনে রাখলে কোনো মুসলিমের পক্ষেই সমাজসেবা বিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। আমরা যদি ইসলামের বিধান গুলো মেনা চলি সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারি তবেই আমদের দুনিয়াতে শান্তি এবং পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাব।
জাতীয় সমাজসেবা দিবস আজ (২ জানুয়ারি)। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে দিবসটি পালন করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন।এবারের প্রতিপাদ্য ‘সমাজসেবার উদ্ভাবন, এবার সেবায় ডিজিটাইজেশন’। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, দুস্থদের মাঝে ঋণ বিতরণ এবং শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে ২ জানুয়ারিকে ‘জাতীয় সমাজসেবা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেতৎকালীন সরকার।
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ এক বাণীতে বলেন, সমাজসেবা অধিদফতর দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক ক্ষমতায়নে সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ভাতা ও উপবৃত্তি কার্যক্রম, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও ভাতা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। শিশু সুরক্ষা, সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধসহ প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষায় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও কমিউনিটি ক্ষমতায়নে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণীতে বলেন, দেশের দুস্থ, অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নতুন নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়তে অবদান রাখবে।
উল্লেখ্য, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ক্ষমতায়নে সমাজসেবা অধিদফতর সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক সুরক্ষাভাতা ও উপবৃত্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আবাসন ও ভরণপোষণসহ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন, শিশু সুরক্ষা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে ৫০টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
এমবি





