ধূর্ত পাক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আলোচনার নামে ভিন্ন কৌশল বেছে নেন। আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আমদানিও অব্যাহত রাখেন। একইসঙ্গে সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার ও সৈন্যদের নিরস্ত্র করে গুরুত্বহীন জায়গায় বদলি (ডাম্পিং পোস্টিং) শুরু হয়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ১৭ মার্চের দ্বিতীয় দিনের মতো বৈঠক ছিল নেহায়েতই নীলনকশার অংশ। এ আলোচনা যে ব্যর্থ হবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধিকারের দাবি যে মেনে নেয়া হবে না, তা আগ থেকেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জানতেন। আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না সে সম্পর্কে দেশের রাজনীতিবিদসহ সব সচেতন মহলেরও আশংকা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই আশংকাই সত্য হয়।
তবে এ আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে গোপনে গোপনে পাকিস্তান সরকার যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিল, সে খবর পেয়ে যান বঙ্গবন্ধু। তিনিও প্রতিরোধ ও অসহযোগ আন্দোলন জোরদার করার পাশাপাশি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ও সর্বত্র নির্দেশ প্রদান করেন। সমগ্র দেশেই চলতে থাকে এ প্রস্তুতি।
ধূর্ত ও সুচতুর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যাতে বহির্বিশ্বকে বলতে না পারেন যে, শেখ মুজিব আলোচনায় রাজি নন, সেজন্য বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আলোচনার ফলাফল নিয়ে কিছুটা দ্বন্দ্ব ও সন্দেহ থাকলেও তিনি তা অবাহত রাখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন তার সাদা গাড়িতে কালো ও দলীয় পতাকা উড়িয়ে এবং উইন্ডস্ক্রিনে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা ও নৌকার প্রতীক সেঁটে যান প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমান সুগন্ধা ভবন)। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় দিনের মতো (১৭ মার্চ) বৈঠক ছিল সংক্ষিপ্ত (সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১৯০ মিনিট স্থায়ী)।
এ আলোচনা ছিল ওয়ান টু ওয়ান। এ আলোচনায় দু’জন ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। চারদিকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে অসংখ্য দেশী-বিদেশী সাংবাদিক এবং মুক্তিকামী জনতা ভিড় জমায় প্রেসিডেন্ট ভবনের চারপাশে। বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের সিপাহসালার বঙ্গবন্ধু বৈঠক শেষে বেলা পৌনে ১টার দিকে গম্ভীর চেহারা নিয়ে বেরিয়ে এসে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন- আলোচনা চলছে, আরও চলবে। এ মুহূর্তে কিছু বলার সময় আসেনি। আন্দোলন যেমন ছিল, তেমনই তীব্র আছে এবং থাকবে। আন্দোলন কমার কোনো কারণ এখনও সৃষ্টি হয়নি। প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়েই বঙ্গবন্ধু সোজা চলে যান তার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে। সেখানে গিয়েই তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন।
এদিন ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন থাকায় সকাল থেকেই দলের নেতাকর্মী এবং ভক্তরা বঙ্গবন্ধু ভবনে এসে তাকে জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। বিভিন্ন শিশু-কিশোর সংগঠন, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী তথা সর্বস্তরের মানুষ আসে প্রাণপ্রিয় নেতার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। সাংবাদিক, পেশাজীবী সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবনের সামনে। ফুলে ফুলে ভরে যায় পুরো ভবন।
জন্মদিন উপলক্ষে বাসায় সমবেত হাজার হাজার জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি জীবনে কখনোই জন্মদিন পালন করিনি। কেক কাটিনি। মোমবাতি জ্বালাইনি। যে দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, পথে-ঘাটে অহরহ মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলা হচ্ছে। সেই দুঃখিনী বাংলায় আমার জন্ম দিনই বা কি আর মৃত্যুদিনই বা কি! আপনারা সবাই জানেন, দেশের মানুষের ওপর আজ নির্যাতন-জুলুম চলছে। বাংলার মানুষের আজ কোনো নিরাপত্তা নেই। যখনই ইচ্ছা হয় ওরা গুলি করে আমাদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
জনগণ আজ মৃতপ্রায়। বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষই আমার জীবন। আমি তাদের লোক। বঙ্গবন্ধুর এ আবেগাপ্লুত ভাষণ শেষে গগনবিদারী স্লোগান ওঠে- ‘বঙ্গবন্ধু এগিয়ে চল, আমরা আছি তোমার সাথে; জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ এদিন চট্টগ্রামের বিশাল জনসভা থেকে ন্যাপ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই, শেখ মুজিব দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এখন যার যার কাজ করে যেতে হবে।’
এদিকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ঢাকা শহরসহ প্রায় সব জায়গাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী স্বয়ংক্রিয় ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টহল দিতে থাকে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, টঙ্গী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন শিল্প এলাকার শ্রমিকদের মিছিলের ওপর সেনাবাহিনী বিনা উসকানিতে গুলি চালায়। অসহযোগ আন্দোলনের শুরু থেকে প্রায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। দেশের বিভিন্ন জেলখানা ভেঙে পালিয়ে যায় কয়েক’শ কয়েদি।
বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানালেও পাক সরকার তা কার্যকর করেনি। এ অবস্থায় আন্দোলনরত বাঙালি সেনাবাহিনী দেখেই ফুঁসে ওঠে। কোনো কোনো স্থানে সৃষ্টি করা হয় সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার ব্যারিকেড। বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যরাও মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে।
এআইজে





