পৃথিবীর প্রথম ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল চীনে। ১৬০ খ্রিস্টাব্দে চীনের ইমপেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারের কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন।

সেদিন সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন এমন কয়েকজন ছাত্রনেতা, যাঁরা মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ইমপেরিয়ালে পড়তে এসেছেন তুলনামূলক গরিব পরিবার থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সেই আন্দোলন সেদিন ছুয়েঁ গিয়েছিল সাধারণ মানুষকেও।

ছাত্রদের দেখাদেখি সেদিন সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে স্লোগান দিয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। সরকার বেশ কঠোরভাবেই সেই আন্দোলন দমাতে চেয়েছিল।

সরকারি নীতির প্রতিবাদ করায় সেই আন্দোলনে কারাগারে যেতে হয়েছিল ১৭২ জন ছাত্রকে। সরকারি কারাগারে তাঁদের ভোগ করতে হয় অমানুষিক নির্যাতন আর নিগ্রহ।

১৮৪০ সালে যখন বৃটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিল বাংলার সকল জেলাতে একটি করে সরকারী কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে, একমাত্র তখনই কলকাতার বাইরে সারা বাংলায় ছাত্র সমাজের সংগঠিত কর্মকাণ্ড জেগে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ, বিশেষ করে নব উত্থিত বাংলার মুসলমান ছাত্র সমাজের জন্যে ১৯২১ সালের একটি ঘটনা ছিল অপেক্ষিত।

এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা শুধুমাত্র পূর্ব বাংলা অঞ্চলের মুসলমান ছাত্রদের জন্যে নয়, এ অঞ্চলের সমগ্র মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের জন্যেও তা গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন কেউই হয়তো ভাবতে পারে নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজই একদিন বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রধান ভূমিকা পালন করবে।

ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর এদেশের ছাত্রসমাজই প্রথম অনুধাবন করতে পেরেছিল যে প্রকৃত স্বাধীনতা এখনো আসেনি । ১৯৪৮ সালের ১১ ই মার্চ পূর্ববাংলার ছাত্রজনতা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ঢেকেছিল ।

ঐ দিন পুলিশ বাহিনীকে ওপেক্ষা করে মিছিল ও ব্যারিকেডে সোচ্চার হয়ে ওঠেছিল ছাত্ররা ।

এরপর ভাষা আন্দোলনকে সফল করতে ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঘড়ে তোলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রয়ারী সালাম, বরকত, রফিক,জব্বার সহ আরও নাম না জানা শহীদ ভাইদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

এরপর থেকে ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরেই ১৯৭১ পর্যন্ত পৌঁছে যায় এদেশর মানুষ। ছাত্রদের একটি বিরাট অংশ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছে । আবশেষে, বাংলার কৃষক শ্রমিক ছাত্র জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষের মিলিত সশস্র সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় কাঙ্কিত সেই স্বাধীনতা।

এখনো এদেশের সহজ-সরল মানুষেরা বিশ্বাস করে ছাত্ররা শুধু ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই রাজপথে নামে, আন্দোলন করে। সমাজের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়। ছাত্ররা দেশের কথা ভাবে, দেশের মানুষের কথা ভাবে। একদিন তারা বদলে দেবে এই দেশকে। সোনার বাংলার সফল বাস্তবায়ন হবে তাদের হাতেই।

বৃটিশ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর পাকিস্তানের কাঠামোতে এ দেশে ছাত্র সমাজ একটি সংগঠিত শক্তি হিসেবে সমগ্র রাজনৈতিক ইতিহাসকেই নিয়ন্ত্রণ করেছে। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছাত্ররাই ছিল একমাত্র আপোষহীন শক্তি।

গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় ছাত্রদের এখনো বিকল্প নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যান্য জাতীয় সংকটকালে জনগণের কাছে পাশাপাশি ছাত্ররা তাদের শিক্ষার সংগ্রামকেও উচ্চকিত করে তুলেছ।

আজ বাংলাদেশের শিক্ষার হার যে ৬৫% অর্জন করেছে এটা ছাত্রদের, বলতে গেলে একমাত্র ছাত্রদেরই কৃতিত্ব। কারণ ‘শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার’ এই শ্লোগান সকলের আগে।

বাংলাদেশের ছাত্রদের নিয়ে জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। এই ষড়যন্ত্রের একটি বড় সফলতা জনগণ থেকে ছাত্রদের দিন দিন বিচ্ছিন্ন করে তোলা, ছাত্রদের ঘাড়ে সন্ত্রাসের দায়ভাগ তুলে দেওয়া এবং পরীক্ষায় দুর্নীতির কলঙ্ক লেপন করা।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দিবস। ১৯৪১ সালে লন্ডনে আন্তর্জাতিক ছাত্র সংস্থার এক সম্মেলনে উদ্বাস্তু শিক্ষার্থীদের আহ্বানেসর্বপ্রথম এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘ এ দিবসটিকে বিশেষ দিবসের তালিকাভুক্ত করে। সেই থেকে ১৭ নভেম্বরকে শিক্ষার্থী দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে । স্বল্প পরিসরে হলেও বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দিবস বিশ্বব্যাপী ছাত্রদের কর্মতত্পরতার প্রতিরূপক হিসেবে স্বীকৃত একটি দিন। যা যুগ যুগ ধরে চলমান দুর্নীতি-দুঃশাসন-অপশাসন আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের এক স্বীকৃতি।

তবে বর্তমানে এই দিবসটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি ও কর্মতত্পরতা বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

উল্লেখ্য, ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দিবসের পেছনে তিনটি ঘটনাকে কারণ হিসেবে ধরা হয়। ঘটনাগুলো হচ্ছে-১৯৩৯ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চেকোস্লোভাকিয়ায় জার্মান আগ্রাসনের বিপরীতে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ।১৯৭৩ সালের ১৭ নভেম্বর গ্রিসে ছাত্র বিক্ষোভ এবং ১৯৮৯ সালের ১৭ নভেম্বর চেকোস্লোভাকিয়ায় কম্যুনিস্ট স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বৃহত্তর ঐক্য ও ভেলভেট বিপ্লব।

এমবি