জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে বাংলাদেশের সমর্থন আদায় করেছে জাপান। এমনকি জাপানকে সমর্থন দিতে গিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ।
অপরদিকে, বাংলাদেশের এই আন্তরিকতাকে স্মরণে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশকে ৬০০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়ার পুরনো অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও সাগরকেন্দ্রিক বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদশকে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।
একইসঙ্গে, বাংলাদেশের ইতিবাচক ভূমিকার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
এছাড়া, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড-স্পেশাল ইকোনমিক জোন) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ, তাকে স্বাগত জানান এবং বিগ-বি (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন শিনজো আবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের (৫, ৬ সেপ্টম্বর ২০১৪) ঢাকা সফরের মধ্যদিয়ে দুই দেশের এটাই মূল অর্জন বলে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে। এই অর্জনের মধ্যদিয়ে জাপান কতটা লাভবান হলো এবং বাংলাদেশ কী পেল-এই মুহুর্তে চলছে তার নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ধারণা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা ও বলিষ্ঠ সমর্থনের প্রেক্ষিতে ২০১৬-১৭ মেয়াদে জাতিসংঘের অস্থায়ী সদস্যপদে জাপানের প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন ও বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণায় জাপান বাংলাদেশের জন্য বিশেষ কোন সুবিধার ঘোষণা দিবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল চলতি বছরের ২৫ থেকে ২৮ মে শেখ হাসিনার চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান থাকাকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে ৬শ কোটি ডলারের সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিন মাসের মাথায় বাংলাদেশ সফরে এসে আবারও সেই প্রতিশ্রুতিরই পুনর্ব্যক্ত করলেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী।
তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের দুই দিনের ঢাকা সফরে দৃশ্যমান প্রাপ্তি জাপানের পক্ষে যেভাবে গেল তার বিপরীতে বাংলাদেশ অর্জন কতটুকু? শুধু পুরনো প্রতিশ্রুতির প্রতিধ্বনি এবং কিছু আশ্বাস ছাড়া জাপানের কাছ থেকে বাংলাদেশ এবার কী পেল?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও জাতিসংঘ মহাসচিবের সাবেক বিশেষ দূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে তেমন কিছু না পেলেও অনেক কিছু পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, জাপানের প্রতিশ্রুতি আর চুক্তির মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। অনেক দেশের প্রতিশ্রুতির যেমন কোন বাস্তবায়ন নেই, প্রতিশ্রুতি কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যেই ঘোরপাক খায়। কিন্তু জাপানের বেলায় এটা কখনো দেয়া যায় না। জাপান কাউকে কোন প্রতিশ্রুতি দিলে তার বাস্তবায়নে দেশটি যথাযথ পদক্ষেপ নেয়। এটাই জাপানের ঐতিহ্য।
টাইমনিউজবিডিকে দেয়া সাক্ষাতকারে রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি জাপান। জাতিসংঘের ৫ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে জাপান বর্তমানে নানামুখী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ লক্ষ্য অর্জনে আগামী ২০১৬-১৭ মেয়াদে জাতিসংঘের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ দেশটির জন্য জরুরী। তাই এই মুহুর্তে বাংলাদেশের সমর্থন আদায় ছিল জাপানের জন্য একটি বড় অর্জন।
অপরদিকে, জাতিসংঘের অস্থায়ী সদস্যপদ প্রত্যাহারের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। কারণ এই সদস্য পদ পাওয়া না পাওয়ার ওপর জাপানের মতো বাংলাদেশের কোন বড় অর্জন আটকে থাকার কোন সম্ভাবনা নেই। পাশাপাশি অস্থায়ী সদস্য পদ এর আগেও বাংলাদেশের ছিল, ভবিষ্যতেও এই পদ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাশেদ আহমেদের পরামর্শ, এখন বাংলাদেশের উচিত জাপানকে তার প্রতিশ্রুতির কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়ে যত বেশি সম্ভব অর্থ সহায়তা আদায় করা। এক্ষেত্রে, শেখ হাসিনার জাপান সফরকালে অবকাঠামো উন্নয়নে ৬শ কোটি ডলার সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি জাপান দিয়েছিল তার ভলিয়ম বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
এছাড়া, শুল্কমুক্ত পণ্য বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক জাপানের বাজারে প্রবেশের সুযোগসহ সম্ভাব্য সব খাত থেকেই সুবিধা আদায়ে কুটনৈতিক তৎপরতা চালানোরও পরামর্শ দিলেন রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ।
উল্লেখ্য, চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ২০০৮ সালেই ‘চায়না প্লাস’ নীতি ঘোষণা করে জাপান। এ নীতিমালার কারণে সম্ভাবনার বিশাল দুয়ার খুলে যায় বাংলাদেশের জন্য। ২০১০ সালে আরো একধাপ এগিয়ে পণ্যের কাঁচামাল সংক্রান্ত তিন স্তর থেকে শর্ত দুই স্তরে নামিয়ে আনে জাপান।
এছাড়া, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে জাপানিদের পছন্দও কিছুটা নেমে আসে এবং বাংলাদেশী পোশাকের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অভাব, বাণিজ্যিক কূটনীতিতে দুর্বলতা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ভাবমর্যাদার অভাবে শূন্য জায়গা দখলে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর ৩৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরী পোশাক আমদানি করে জাপান। এর ৮০ শতাংশই আসে চীন থেকে। এ ক্ষেত্রে সদ্যবিদায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ কোটি ডলার অর্থাৎ দেড় শতাংশের মতো। আগের অর্থবছরে ছিল ৪৭ কোটি ডলার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান টাইমনিউজবিডিডটকমকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। বর্তমান সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে মানতে অনেকেই নারাজ।
তিনি বলেন, এই মুহুর্তে জাতিসংঘের অস্থায়ী সদস্যপদের জন্য আবেদন করলেও পশ্চিমাদের ভেটো ও অন্যান্য অনেক দেশের বিরোধীতার মুখে তা শেষ পর্যন্ত কতটা টিকতো তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তাই নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জাপানকে সমর্থন করা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে।
তিনি বলেন, জাপানের জন্য বাংলাদেশের এই ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে জাপানের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা আদায়ে বাংলাদেশকে উদ্যোগী হতে হবে।
অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান আরও বলেন, বাংলাদেশের এই ভূমিকার প্রেক্ষিতে জাপান সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তা আদায় করা সম্ভব। তবে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা কুটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিবে তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে।
দুই দিনের সফর শেষে আজ (রোববার, ৭ সেপ্টম্বর ২০১৪) নিজ দেশে ফিরে যান জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে দুই দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ ও মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ সহায়তাদানকারী দেশ জাপানের কাছ থেকে বাংলাদেশ এখন কতটা বাড়তি সুবিধা আদায় করতে পারবে, কুটনৈতিক দরকষাকষিতা বাংলাদেশ কতটা নিজেদের পারঙ্গমতা দেখাতে সক্ষম হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ঢাকা, কেবি, ৭ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম





