স্বাধীনতার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চলছে নানামুখী অপতৎপরতা। ক্রমেই যেন বিস্তার লাভ করছে ষড়যন্ত্রের জাল।
শান্তিচুক্তি পূর্ববর্তী পৃথক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে উপজাতিদের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদি গোষ্ঠি।
চুক্তি পরবর্তী সময়ে নতুন কৌশলে ‘আদিবাসী’ নামক অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে এ তৎপরতা জোরদার করছে একই গোষ্ঠি।
গোপন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের এমন বিচ্ছিন্নতাবাদি দাবির পক্ষে কিছু গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ বুঝে না বুঝেই সাফাই গাইছেন। এমনকি সরকারের কিছু এমপি-মন্ত্রীও সরকারি সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ বিদেশি শক্তির চাপে বাংলাদেশের অখন্ডতা ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা ২০০৭ সালে ‘আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র’ বিশ্লেষণ করে বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তথা স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
এর ফলে বাংলাদেশের এক দশমাংশের পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে। তারা যদি মনে করেন বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠণ করবেন তাও পারবেন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকলেও তারা যে অঞ্চলে বাস করে সেই অঞ্চলের ভূমির মালিকানা বাংলাদেশের হবে না এবং সে অঞ্চলে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। যদিও তারা আদিবাসী স্বীকৃতির যোগ্য নন।
এদিকে আদিবাসী বিষয়ে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মানদন্ড বিবেচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের আদিবাসী (Indigenous) অভিহিত না করে উপজাতি (Tribal) হিসেবে অভিহিত করে আসছে বাংলাদেশ। শান্তিচুক্তি ও সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনীতেও তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি/উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করে সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, জাতিসংঘ ফোরামে ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোও তাদের উপজাতি জনগোষ্ঠিদের কখনও আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে না। এ দুটি শব্দকে সমর্থক হিসেবে ব্যবহৃত করা জাতিসংঘে আদিবাসী সম্পর্কে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিপন্থি।
এ হিসেবে ৯ আগস্ট জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করে না বাংলাদেশ। এরপরও কিছু গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ে জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার দুটি চার্টার ১৯৫৭ (১০৭) ও ১৯৮৯ (১৬৯) এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রে’ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএলওর এই সংজ্ঞাটি যদি বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা আদিবাসী নয়; উপজাতি।
সেই বিচারে বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ বা আদি-বাসিন্দা হচ্ছে এদেশের বাঙালি কৃষক সম্প্রদায়, যারা বংশ পরম্পরায় শতাব্দির পর শতাব্দি মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। আদিতে তারা প্রকৃতি-পূজারী, পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন।
ইতিহাসবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ৪৫টি বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এতদঞ্চলে আগমন কয়েকশ’ বছরের বেশি পূর্বে নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান। সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আশ্রয় নেন। ত্রিপুরাদের আদি বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমা জনগোষ্ঠী এসেছে বার্মা থেকে।
তারা বিভিন্ন স্থান থেকে বিতাড়িত হয়ে এদেশের নানা স্থানে আশ্রয় নিয়ে আনুমানিক তিনশ’থেকে পাঁচশ’ বছর পূর্ব থেকে বাংলাদেশের ভূখন্ডে বসবাস করতে শুরু করেন। এর বাইরে বাকি উপজাতিদের অধিকাংশেরই বৃহত্তর অংশ রয়েছে প্রতিবেশী ভারতে। ক্ষুদ্রতর একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে আগে-পরে বাংলাদেশে এসেছে।
ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী বলেন, ইউরোপ-আমেরিকার কিছু সংস্থা এখন দেশে দেশে ‘আদিবাসী’ খুঁজে বেড়াচ্ছে। খ্রীষ্ট-ধর্ম প্রচারে অতি-উৎসাহী কিছু চার্চ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে মাত্র ৫ হাজার জনসংখ্যার কোন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির সন্ধান পেলেই তাকে টার্গেট করে কাজ শুরু করছে। দান দক্ষিণা দিয়ে টার্গেট জনগোষ্ঠির কাছে তাঁরা হয়ে ওঠেন ত্রাণ-কর্তা।
শিক্ষাবিদ ও সমাজ উন্নয়ন গবেষক অধ্যাপক মাহফুজ আহমেদ বলেন, জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ জারি হওয়ার পর হঠাৎ করে তারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করতে শুরু করেন। এরকম হঠাৎ করে আদিবাসী হতে চাওয়ার নজির বিশ্বে আর কোথাও নেই।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুর রবের অভিমত, ‘এক শ্রেণীর মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। এক কথায় বললে এরা মূর্খ। এদের কারো এনথ্রোপলজি, সোসিওলোজি, ইতিহাস, ভূগোল এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও উপজাতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। আর যারা জেনে বুঝে এ কাজ করছে তারা বিভিন্ন পারিতোষিক, বৃত্তি, উচ্চ বেতনের চাকরি প্রভৃতির লোভে করছে।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক বলেন, উপজাতিরা যদি আদিবাসী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় তাহলে বাংলাদেশের জন্য তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে। এর ফলে তারা এমন কিছু অধিকার পাবে যা বাংলাদেশ সংবিধানের পরিপন্থী।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ না করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। সেই বিজ্ঞপ্তি আমরা মেনে নেইনি। সরকারের ভেতরে একটা গ্রুপ রয়েছে যারা আদিবাসী ধারণার পক্ষে বলে জানান তিনি।
গোপনীয় প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বাঙালীদের উচ্ছেদ ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজতর হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ উপজাতী অনেকেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট সীমান্তবর্তী এলাকায় (মিজোরাম, মনপুর, নাগালন্ড, ত্রিপুরা) একই অবস্থা।
আদিবাসী স্বীকৃতির মাধ্যমে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে ও বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চল ও মায়ানামারের একাংশ নিয়ে বিদেশি চক্র খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনে তৎপর রয়েছ।
ইউএনডিপি, এডিপি, ডানিডাসহ বিভিন্ন বিদেশি চক্রের প্ররোচণায় প্ররোচিত হয়ে কতিপয় বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, বামপন্থি ও স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন এনজিওর কর্মকর্তাবৃন্দ বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, আদিবাসী সম্মেলন, আদিবাসী মিছিল, আদিবাসী র্যালি, আদিবাসী সংস্কৃতিক উৎসবপালনসহ টিভি রেডিও ও সংবাদপত্রে নতুন নতুন খবরের সূত্রপাত ঘটাচ্ছে।
মাহমুদ





