কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬)বিদ্রোহী কবি, দেশপ্রেমী, মুসলিম জাগরণের কবি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। ফররুখ আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, মাওলানা আকরম খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম এই ৫ জন ছিলেন বাঙালি মুসলমান কবি ও সাহিত্যিকদের মধ্যে পঞ্চরত্ন যারা মুসলিম জাতিসত্তা নিয়ে ভেবেছিলেন, সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে মুসলিম জাগরণকে বেগবান করতে চেয়েছিলেন।
এদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাই তিনি বিদ্রোহী কবি।
নজরুল ইসলাম জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে তার অভিষ্ঠ লক্ষে পৌছেছেন। বাংলা সাহিত্যে জীবনের এত বিচিত্র অভিজ্ঞতা অন্য কোন সাহিত্যিকের নেই।
কখনো নজরুল ইসলাস মসজিদে সম্মানিত মুয়াযযিন, কখনো থিয়েটারে কাজ করেছেন। কখনো তিনি সৈনিক, আবার কখনোবা সাংবাদিক।
বিদ্রোহী কবির সাহিত্য সাধনার সময়কাল নাতিদীর্ঘ। এত অল্প সময়ে তিনি আমাদের দিয়েগেছেন অনেক। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তার কবিতায় ইসলামী জাগরণ এবং মুসলিমদের করনীয় আর গুনাবলী নিরয়ে বিস্তর সাহিত্যকর্ম রয়েছে।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে যারা সমালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে নজরুল ইসলামের ‘এক আল্লাহ জিন্দাবাদ’ কবিতায় বজ্রের মত প্রতিবাদ মুখর। কবি রিখেছেন,
উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ;
আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।
উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ,
আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অবেদ।
উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদী দর্জা চাই;
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই!
ওরা মরিবেনা, যুদ্ধ বাঁধিলে ওরা লুকাইবে কচুবনে,
দন্ত নখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে ।
ওরা নির্জীব জীব নাড়ে তবু শুধু স্বার্থ ও লোভবশে,
ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে ।
মোরা বাংলার নব যৌবন, মৃত্যুর সাথে সঞ্ঝরী,
উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি।
মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী,
অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী।
ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি ।
মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি।
উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমা ও প্রেম তাহার,
ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার!
আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্কি হেরি মানব
ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব।
হুতুম প্যাঁচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়,
কাকে আর টাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চঞ্চু ক্ষয়।
বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চাই, চাহে জ্যোতি;
তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দুর্গতি।
দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তারা লোভী , তারা গুন্ডাদল
তার দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল ।
ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ্ব চায়,
ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়!
নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান
সর্বক্লৈব্য করিয়েছে দূর তোমাদেরই চির আত্মদান !
ওরা কাঁদা ছুড়ে বাধা দেবে ভাবে-ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ,
মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব- ‘‘আল্লাহ জিন্দাবাদ’’
‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় নজরুল ইসলাম মুসলিম সাম্যের জয়গান গেয়েছেন। ঈদ এমন এক উৎসব যেখানে মুসলিম মিল্লাত সকল বাঁধা, শঠতা ভুলে গিয়ে এক কাতারে শামিল হয়। তিনি বলেন,
ইসলামে বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,
সুখ দুখ সম-ভাগ ক’রে নেব সকলে ভাই।
ঈদ হল মুসলিম জাতির আত্মার মিলন, এই ঈদে ধনী গরীব সকলের আনন্দ করার অধিকার রয়েছে। ইসলামী অর্থনীতিতে ধনী যেমন যাকাত দিবে, আর গরীব মুসলিম সেটা গ্রহণ করে সকলে মিলে আনন্দের স্রোতধারায় ভেসে যাবে। এদিকে ইঙ্গিত করে কবি লিখেছেন,
বুক খালি ক’রে আপনারে সাজ দাও যাকাত,
ক’রো না হিসাবী, আজি হিসাবের অঙ্কপাত!
মুসলিমদের করুণ অবস্থা দেখে নজরুল মর্মাহত হয়েছিলেন প্রবলভাবে। একইভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন এক আমেরিকান নও-মুসলিম, তিনি বলেছিলেন, ‘মেঘ যেমন সূর্যকে আড়াল করে রাখে, মুসলমানরাও তেমনি ইসলামকে আড়াল করে রেখেছে’। নজরুলও আক্ষেপ করে বলেছিলেন-
‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান।
কোথা সে আরিফ, অভেদ যাহার জীবন-মৃত্যু জ্ঞান’।।
আবার মুসলিমদের মুনাফেকী চরিত্র দেখে নজরুল লিখেছেন,
খালেদ!খালেদ! সবার অধম মরা হিন্দুস্তানী,
হিন্দু না মোরা মুসলিম তাহা নিজেরাই নাহি জানি!
সকলের শেষে হামাগুড়ি দিই,-না, না, ব’সে ব’সে শুধু
মুনাজাত ক’রি, চোখের সুমুখে নিরাশ সাহারা ধূ ধূ!
দাঁড়ায়ে নামাজ প’ড়িতে পারিনা, কোমর গিয়াছে টুটি,
সিজদা করিতে ‘বাবাগো’ বলিয়া ধূলিতলে পড়ি লুটি’!
পিছন ফিরিয়া দেখি লাল-মুখ আজরাইলের ভাই,
আল্লা ভুলিয়া বলি, ‘‘প্রভু মোর তুমি ছাড়া কেউ নাই’’।
মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে নিঃশঙ্কচিত্তে নজরুল গেয়েছেন,
‘আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।
আমার নবী মোহাম্মদ; যাঁহার তারিফ জগৎময়।।
আমার কিসের শঙ্কা,
কোরআন আমার ডঙ্কা,
ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।।
বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়। মধ্যবয়সে তিনি পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। এখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবির ওসিয়ত অনুযায়ী তাকে মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।





