ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে।

মুক্তিকামী নিপীড়িত জনগণের পক্ষে জাতির মুক্তিসনদ খ্যাত ৬ দফা এবং পরবর্তীতে ছাত্র সমাজের দেয়া ১১ দফা কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়েছিল এ গণঅভ্যুত্থান।স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। সে সংগ্রামের মাধ্যমে জনতার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় তৎকালীন আইয়ুব সরকার।

ঐতিহাসিক ২০ জানুয়ারি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের আত্মদানের পর ২১, ২২, ২৩ জানুয়ারি শোক পালনের মধ্য দিয়ে ঢাকায় সর্বস্তরের মুক্তিপাগল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ২৪ জানুয়ারি এই অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়।আজ মঙ্গলবার সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস।

পাকিস্তানি সামরিক শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের এদিনে সংগ্রামী জনতা শাসক গোষ্ঠীর দমন-পীড়ন ও সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে মিছিল বের করে।

মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের চোখেমুখে ছিল মুক্তির প্রত্যাশা।ঢাকায় সচিবালয়ের সামনের রাজপথে পুলিশের গুলিবর্ষণে নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণীর ছাত্র কিশোর মতিউর রহমানসহ অন্য একজন নিহত হন।

প্রতিবাদে সংগ্রামী জনতা সেদিন সচিবালয়ের দেয়াল ভেঙে আগুন ধরিয়ে দেয়।বিক্ষুব্ধ জনগণ আইয়ুব মোনায়েম চক্রের দালাল, মন্ত্রী, এমপিদের বাড়িতে এবং তাদের মুখপত্র হিসাবে পরিচিত তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান ও পাকিস্তান মর্নিং নিউজে আগুন লাগিয়ে দেয়।জনগণ আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে ‘আসাদ গেইট’ নামকরণ করে।

আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্র-জনতা যে ফুঁসে উঠেছিলেন, তার একটা যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে এ দিনে।এক সপ্তাহের দীর্ঘ আন্দোলনে ২৪ জানুয়ারি স্বৈরাচার সরকার পিছু হটে।এই গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে রক্তাক্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি মহান স্বাধীনতা অর্জন করে।

সেই দিনের স্মৃতিকে ধারণ করে ১৯৭০ সাল থেকেই এ দিনটিকে গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

এদিকে, গণঅভুত্থান দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।তিনি সবাইকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার।স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেছেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক তাত্পর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা, পরবর্তীতে ১১ দফা ও ঊনসত্তরের গণভুত্থানের পথ বেয়ে রক্তাক্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা অর্জিত হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস আমাদের গণতন্ত্র ও স্বাধীকার অর্জনের চেতনাকে শাণিত করে এবং সকল অন্যায় অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।কারণ, এখন আবারও একদলীয় স্বেচ্ছাচারী শাসন কায়েম করা হয়েছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করে বাক, ব্যক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতা এখন গুম করে ফেলা হয়েছে।

ঊনসত্তরের গণআন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তাদের রুহের মাগফিরাতও কামনা করেন।

দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ছাত্র, পেশাজীবী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

এমবি