সবেমাত্র শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রেখেছেন। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা তখন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন শেষে সক্রিয় হচ্ছিলেন। এর মধ্যে ১৯২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাস মোড়ে সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠনের সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাবদ ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করলে দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালে বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধের পর গ্রেফতার হন সূর্যসেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী।

১৯২৪ সালে বেঙ্গল অর্ডিনান্স নামে জরুরি আইনে বিপ্লবীদের বিনা বিচারে আটক শুরু হয়। চট্টগ্রামের বিপ্লবীদলের অনেক নেতা ও সদস্য আটক হন। তার নিকট-আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন বিপ্লবী দলের কর্মী। তখনো বিপ্লবী দলে মহিলা সদস্য গ্রহণ শুরু হয়নি। এসব ঘটনা ওই কিশোরীর মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ঊষাদির সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিস্তারিত অনেক কিছুই জানতে পারেন তিনি। আর ওই কিশোরী হলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। মা আদর করে ডাকতেন রানী বলে। ছাত্রী হিসেবে ঝলমলে সব রেকর্ড। ১৯২৭ সালে চট্টগ্রামের খাস্তগীর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন এবং ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে।

১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন। পরে কলকাতায় গিয়ে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামে ফিরে নন্দনকানন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পদ গ্রহণ করেন।

ছোটবেলায় যখন দাদা পূর্ণেন্দুর দেয়া বইয়ে ‘ক্ষুদিরামের ফাঁসির’ কথা পড়তেন, তখন ভাবতেন এও কি সম্ভব! মনে তাঁর প্রশ্ন জাগে, আমরা মেয়েরা কি এঁদের মতো হতে পারি না?

১৯৩২ সালের মে মাসে রানীর জীবনে এল সেই স্মরণীয় দিন। জীর্ণ এক ঘরের কোনায় জ্বলছিল একটি প্রদীপ। ঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ‘মাস্টারদা’। প্রথম দেখা মাস্টারদার সঙ্গে। এমন সময় ব্রিটিশ সৈন্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় দু'দিক থেকে গুলি চালাচালি। যুদ্ধে প্রাণ দেন বিপ্লবী নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্যসেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন।

সৈন্যরা যাওয়ার পর মাস্টারদা বললেন, ‘প্রীতি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্কুলের কাজে যোগ দেবে, তাতে গত রাতের ঘটনায় কেউ সন্দেহ করবে না।’ ধলঘাটের যুদ্ধে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ক্যামেরুনও নিহত হন।

মাস্টারদা উপলব্ধি করলেন, মেয়েরাও দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারে। এর আগে সশস্ত্র সংগ্রামে গুটিকয় মেয়ে কর্মী ছিল। কিন্তু এদের কাজ ছিল বিপ্লবীদের খবর আদান-প্রদান, অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখা, চাঁদা তোলা এবং বিপ্লবীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। সামনাসামনি অস্ত্র হাতে শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করেনি।

সূর্য সেন সিদ্ধান্ত নেন ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দিবে ‘প্রীতিলতা’। শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। সাতজনের দলে দলনেতা প্রীতিলতা ছাড়াও ছিলেন-বিপ্লবী কালীকিংকর, শান্তি, সুশীল, মহেন্দ্র, বীরেশ্বর, প্রফুল্ল ও পান্না। অভিযানের আগে পড়া হলো ইশতেহার।

মাস্টারদা বললেন, ‘জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তঋণ, ওদের রক্ত দিয়েই আজ শোধ করতে হবে। এ দায়িত্ব তোমাদের। সবাই দেখবে অপমানের জবাব দিতে আমরা আর পিছিয়ে থাকব না।’

১৯৩২ সাল, ২৩ সেপ্টেম্বর। পরনে মালকোঁচা ধুতি। মাথায় গৈরিক পাগড়ি, গায়ে লাল ব্যাজ লাগানো শার্ট। ইনিই দলনেতা। এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে হাতবোমা। দলের সদস্য সংখ্যা সাত। সবার পরনে রাবার সোলের কাপড়ের জুতো। সবাই প্রস্তুত। দলনেতার মুখে ‘চার্জ’ শুনতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে ইংরেজদের ওপর। তখন লোকজন ক্লাবে মত্ত নাচ-গানে। পিকরিক অ্যাসিডে তৈরি বোমাটি বর্জ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ল; হলঘরে তখন শুধু ধোঁয়া।

দলনেতাই এগিয়ে গেল, এটাই তার প্রথম অভিযান। বোমার বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, শত্রুর মরণ চিৎকার-সব মিলে পরিণত হলো এক দক্ষযজ্ঞে! ঘটে গেল ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা। ২১ বছরের সেই দলনেতা পুরুষ বেশে একজন নারী। বাংলাদেশেরই নারী। নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একজন নারী। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ‘প্রীতিলতা’।

সকলেই নিরাপদে ফিরে এলেন, ফিরলা না শুধু দলনেতা প্রীতি। বহু ইংরেজকে হতাহত করে সফল অপারেশনের পর কাল বিলম্ব না করে প্রত্যাবর্তনকালে হঠাৎ একটি গুলি এসে বিঁধে তার বুকে। এ সময় ইংরেজ সেনারা তাকে ঘেরাও করে ফেললে নিজেদের গোপন আস্তানার কথা ব্রিটিশরা যাতে তার কাছ থেকে জানতে না পারে সেজন্য ধরা পড়ার অপমান ঠেকাতে ‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ খেয়ে আত্মদান করলেন।

পরের দিন পুলিশ ক্লাবের পাশে পড়ে থাকা লাশকে পুরুষ ভেবে মাথার পাগড়ি খুলে লম্বা চুল দেখে শুধু ব্রিটিশ পুলিশ নয়, গোটা ব্রিটিশ সরকারই নড়েচড়ে বসে। আলোড়িত হলো গোটা ভারতবাসী।

ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের আগের দিন প্রীতিলতা তার মাকে লিখেছিলেন, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিত, অবমানিত! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে ?’

আজ সেই ২৩ সেপ্টেম্বর, মহান এই বিপ্লবীর ৭৯তম আত্নাহুতি দিবস। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠন তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করবে। বিনম্র শ্রদ্ধা মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের প্রতি। আমাদের মুক্তির জন্য, পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্ত হতে আবারও প্রীতিলতার বিপ্লবী চেতনায় জেগে উঠার সময় এসেছে।

এমএ/ এআর