সারাবিশ্বের ধ্রুপদী চলচ্চিত্রপ্রেমীরা সত্যজিৎ রায়কে একনামে চিনে। তিনি চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনা ও প্রচারণাপত্র নকশার কাজও করেছেন। সত্যজিতের নির্মাণ কৌশল অনেক বিশ্ববিখ্যাত নির্মাতাকে প্রভাবিত করেছে।
এ ছাড়া তিনি একাধারে কল্পকাহিনী লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। বিখ্যাত এ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসেবে শনিবার (২ মে) সত্যজিৎ রায়ের ৯৪তম জন্মজয়ন্তী।
সত্যজিতের বাবা বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায় ও দাদা শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। সত্যজিৎ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪০ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
সত্যজিৎ রায় ১৯৪৩ সালে শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারে জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৩ সালের দিকে বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা সিগনেট প্রেসের হয়ে অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ করেন। ১৯৪৭ সালে চিদানন্দ দাসগুপ্ত ও অন্যাণ্যের সঙ্গে মিলে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪৯ সালে ফরাসি নির্মাতা জঁ রনোয়ার ‘দ্য রিভার’চলচ্চিত্রটির শুটিংয়ে কলকাতায় আসেন। রনোয়ারকে লোকেশন খুঁজতে সাহায্য করেন সত্যজিৎ। ১৯৫০ সালে ডি জে কিমার তাকে লন্ডনে প্রধান কার্যালয়ে পাঠান। সেখানে তিনমাসে প্রায় ৯৯টি চলচ্চিত্র দেখেন। এর মধ্যে ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী চলচ্চিত্র লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে বা দ্য বাইসাইকেল থিফ তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ওই চলচ্চিত্রটি দেখে সিনেমা হল থেকে বের হওয়ার সময়েই ঠিক করেন চলচ্চিত্রকার হবেন। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
১৯৫২ সালের শেষ দিকে সত্যজিৎ জমানো টাকা খরচ করে বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’র দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। আর্থিক সঙ্কটের কারণে তিন বছরে চলচ্চিত্রটি সম্পন্ন হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হয় ও মুক্তি পায়। মুক্তির পরপরই দর্শক-সমালোচক সবার প্রশংসা লাভ করে ও বহু পুরস্কার জিতে নেয়। পরবর্তী চলচ্চিত্র অপরাজিত তাকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও পরিচিত করে তোলে। অপু সিরিজের শেষ সিনেমা অপুর সংসার ১৯৫৯ সালে নির্মাণ করেন।
১৯৬৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প নষ্টনীড় অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন চারুলতা। অনেক সমালোচকের মতে এটি তার সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্র। এরপর কয়েক বছর কল্পকাহিনী, গোয়েন্দা কাহিনী ও ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র বানান। ১৯৬৭ সালে দ্য এলিয়েন নামের একটি চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লেখেন। নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের যৌথ প্রযোজনার এ চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্পিলবার্গের ইটি দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়ালের সঙ্গে অনেকেই সত্যজিতের লেখা চিত্রনাট্যের মিল খুঁজে পান।
সত্যজিৎ ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেন সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র গুপী গাইন বাঘা বাইন। উপেন্দ্রকিশোরের লেখা ছোটদের জন্য একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে বানান সঙ্গীতনির্ভর চলচ্চিত্র এটি। ১৯৭০ এর দশকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে তিনটি চলচ্চিত্র বানান। কলকাতা ত্রয়ী নামে পরিচিত চলচ্চিত্র তিনটি হল- প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১) ও জনারণ্য (১৯৭৫)। ওই দশকে নিজের লেখা জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদাকে ভিত্তি করে সোনার কেল্লা ও জয় বাবা ফেলুনাথ চলচ্চিত্র দুটি নির্মাণ করেন। ১৯৭৭ সালে শতরঞ্জ কি খিলাড়ি নামের একটি উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৮০ সালে গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রের পরবর্তী পর্ব হীরক রাজার দেশে নির্মাণ করেন।
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় দুটি চরিত্রের স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়। একটি হলো গোয়েন্দা ফেলুদা, অন্যটি বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু। এ ছাড়া তিনি প্রচুর ছোটগল্প লিখেছেন। ছেলেবেলার কাহিনী নিয়ে লেখেন, যখন ছোট ছিলাম (১৯৮২)। চলচ্চিত্রের ওপর লেখা প্রবন্ধের সঙ্কলন হলো- আওয়ার ফিল্মস, দেয়ার ফিল্মস (১৯৭৬), বিষয় চলচ্চিত্র (১৯৮২) ও একেই বলে শুটিং (১৯৭৯)। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা একশয়ের কাছাকাছি। ১৯৬১ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে সন্দেশ নামের শিশুদের পত্রিকাটি আবার চালু করেন। এটি এক সময় উপেন্দ্রকিশোর প্রকাশ করতেন।
কীর্তিমান এ পুরুষ জীবদ্দশায় প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন। সত্যজিৎ রায়ই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সান্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার সে দেশের বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার লেজিওঁ দনরে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ১৯৯২ সালে একাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সাইন্সেস তাকে আজীবন সম্মাননাস্বরূপ একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করে। সরকার প্রদান করেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারতরত্ন।
১৯৪৯ সালে সত্যজিৎ দূর সম্পর্কের বোন ও বহুদিনের বান্ধবী বিজয়া দাসকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির এক ছেলে- চলচ্চিত্র নির্মাতা সন্দীপ রায়।
১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন কীর্তিমান এই মানব। ওই বছরে মৃত্যুর পর দেওয়া হয় মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার।
কেএইচ





