কবি সুকান্ত এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। মালালা ইউসুফজাই এবং কৈলাস সত্যার্থীসহ অনেকেই শিশুর অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ সারাবিশ্বে শিশু-নির্যাতন রোধ ও শিশু-অধিকার বাস্তবায়নে নানাবিধ কর্মসূচি পালন করছে। বাংলাদেশ সরকারও শিশু-নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিশু-অধিকার রক্ষার জন্যে স্বতন্ত্র্য মন্ত্রণালয় করেছে।
এর ধারাবাহিকতায় শিশু সুরক্ষায় ২০১১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির নামে নির্যাতনকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। যৌন হয়রানি বন্ধে হাইকোর্টের গাইডলাইন, বাল্যবিবাহ রোধ এবং পথশিশুদের অধিকার সুরক্ষায় হাইকোর্টে পৃথক দুটি জনগুরুত্বপূর্ণ রিট চলমান রয়েছে। শিশুদের সুরক্ষায় পাস হয়েছে শিশু আইন ২০১৩। তার পরও দেশে শিশুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ছয়টি জাতীয় পত্রিকার খবর পর্যালোচনা করে ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি ২০১৩’ প্রতিবেদনে বলছে, বছরটিতে ২৬৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে মারা যায় ১২ জন। গুরুতর আহত হয় ২৩৯ জন শিশু। ধর্ষণ ছাড়া অন্যান্য যৌন নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয় ১৫০টি। তবে ২০১২ সালে ১৫৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। অর্থাৎ সংখ্যাটি না কমে বরং বেড়েছে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বছরটিতে ৯০ শিশু অপহরণের শিকার হয়। অপহরণের পর খুন করা হয় দুজনকে। পারিবারিক কলহ, মুক্তিপণ না পেয়ে, জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও মা-বাবার পরকীয়ার জেরে ৩৩৫ শিশু খুন হয়। অশ্লীল ভিডিওচিত্র ছড়ানোর ভয়ে বা অন্যান্য কারণে আত্মহত্যা করে ১৬৬ শিশু। বিভিন্ন অপরাধী কর্মকাণ্ডে ২৪৫ শিশুকে সম্পৃক্ত করা হয়। এর মধ্যে মারা যায় ১৭৬ জন। বছরটিতে পাচার হয় ৪২ শিশু। অ্যাসিডদগ্ধ হয় ১০ শিশু। রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে ৪১ শিশু মারা যায়। ১০৭ শিশু গুরুতর আহত হয়।
পর্যালোচনায় দেখাযায় ফয়জুলের বয়স ১০ বছর। কাজ করত রাজধানীর একটি ভাতের হোটেলে। একদিন একটি কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলে সে। এ অপরাধে হোটেলের মালিক তাকে লাঠি দিয়ে বেদম মারে। মারের চোটে মফিজুল একসময় অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে জ্ঞান ফিরে এলে মফিজুল সেখান থেকে পালিয়ে আসে।
বাড়ির কাজ করে নিয়ে আসেনি শিক্ষার্থী সায়েম (৮)। এ জন্য শ্রেণীশিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ড মোছার ডাস্টার দিয়ে তার মাথায় জোরে আঘাত করেন। শুধু তা-ই নয়, কানে ধরে ১০ বার উঠবস করান। রাজধানীর একটি স্কুলে সম্প্রতি এ ঘটনা ঘটেছে। সায়েমের বাবা-মা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
রানী (১২) দুই বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করছে রাজধানীর মালিবাগের একটি বাড়িতে। এই দুই বছরে প্রায় প্রতিদিনই সে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কাজে সামান্য ভুলচুক হলেই গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী ও তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে তাকে মারধর করে। তবু সে এই বাড়িতে কাজ করছে। কারণ তা না হলে যে তার বাবা-মাকে না খেয়ে থাকতে হবে।
পাঁচ বছরের মেয়েকে পাশের বাড়ির ভাবির জিম্মায় রেখে কাজে গিয়েছিলেন মা। ওই ভাবির ভাই এক ফাঁকে মেয়েটিকে নির্জন কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করে। সামাজিক কেলেঙ্কারির ভয়ে মেয়েটির পরিবার কোনো মামলা-মোকদ্দমার ঝামেলায় যায়নি।
আমাদের দেশে শিশুরা প্রতিনিয়ত এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তবে দিন বা বছরে আসলেই কত শিশু নির্যাতিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারি কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন এনজিও এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে কিছু খণ্ডিত চিত্র পাওয়া যায়।
চট্টগ্রামের দৌলতপুরের রোজিনা আকতার মনেকরেন, সরকার শিশুনির্যাতন প্রতিরোধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের পরও শিশুনির্যাতন ও পাশবিক কায়দায় হত্যার মতো ঘটনা কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। মাতৃগর্ভেও শিশু নিরাপদ নয় এখন। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই এমনটি হচ্ছে।
যদি দোষীরা অপরাধ অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেতো তাহলে কেউ দরিদ্র্যতার সুযোগে কোনো অসহায় শিশুকে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন ও হত্যা করতে পারতো না। আইনের ফাঁকফোঁকর ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্থলোভী সদস্যদের সহায়তায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় এ ধরনের জঘন্য অপরাধগুলো ঘটছে দেশে প্রতিনিয়ত, প্রতিদিন। কয়েকদিন আগে কিছু পশুচরিত্রের মানুষের নির্মমতার শিকার হয়েছিল সামিউল আলম রাজন নামে সিলেটের এক দরিদ্র শিশু। এ হত্যাকান্ড ঘটনা দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্নহয়েছে।
মানুষ কত বেশি পশুচরিত্র ধারন করলে, মানুষের নির্মমতা কত ভয়ঙ্কর হলে, মানুষ কত বেশি অসভ্য ও পাশবিক হলে এমনটি হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। চরম পাশবিক এই ঘটনার নিন্দা ও ঘৃণা জানানোর ভাষা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমরা শুধু বলতে চাই যারা এই পৈশাচিক অপরাধটি করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, যাতে আগামিতে অন্য কেউ এ ধরনের ঘটনার জন্ম দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।
নারী ও শিশু নির্যাতন অসুস্থ সমাজের লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজ পরিদর্শন শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মত বিনিময়কালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বিগ্ন ইউনিসেফ বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেইবেডার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুরা প্রকাশ্যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমনকি প্রকাশ্য নির্যাতন করে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, কত বর্বর মানুষ হতে পারে দেখে অবাক হয়ে যাই। মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ...এটা কীভাবে সম্ভব! এই ঘটনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
এরশাদ বলেন, এতো গেল একটা ঘটনা, পত্রপত্রিকা খুললেই শিশু নির্যাতনের খবর দেখা যায়। গত তিন বছরে সারা দেশে ৭৬৭টি শিশু মারা গেছে। কেন এসব হচ্ছে? কারণ- যারা করছে তারা জানে তাদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না। আমার আবেদন- এদের কঠোর শাস্তি দিন, ফাঁসি দিন, দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামি সাবেক সেনাশাসক এরশাদ বলেন, কারা এসব করছে তা আমরা জানি। যদি সুবিচার হতো, তাহলে এর প্রকোপ অনেক কমে যেত। তবে আমার মনে হয় না এ রকম (সুবিচার) কিছু হবে।
এরশাদ বলেন, বিচারহীনতার জন্য দায়ী সমাজ। এই সমাজ এ রকম ছিল না। আমরা কখনো নিষ্ঠুর ছিলাম না। সমাজে পরিবর্তন দরকার।
এদিকে, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান এমরানুল হক চৌধুরী বাধ্যবাধকতা ও নিষ্ক্রিয়তাকে দয়ি করে বলেছেন,শিশু নির্যাতনের ঘটনা যাতে না ঘটে বা ঘটার পর যথাযথ যে ধরনের প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন সরকার সেদিকে নজর দেয়নি। থানায় শিশুবান্ধব কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়নি। মহিলা অধিদপ্তরের মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাদের শিশুদের বিষয়টি দেখার বাধ্যবাধকতা নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী ও শিশুবিষয়ক যে কমিটি আছে তা সক্রিয় নয়।
এ নিয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে প্রচুর আইন আছে কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রটা জটিল। তিনি জানান, ইতোমধ্যে কিছু সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এই মন্ত্রণালয়ের সাথে রিলেটেড আইন মন্ত্রনালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো তিন মাস পরপর মনিটর করার সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং প্ল্যান বাংলাদেশ শিশু গবেষকদের মাধ্যমে প্রতিবেদন তৈরি করা শুরু করেছে ২০১০ সাল থেকে। ২০১২ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত চতুর্থ প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। এদের ২০ ভাগ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। ১৪ শতাংশের বেশি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার। দেশের বিভিন্ন বস্তিতে যেসব শিশু বড় হচ্ছে তাদের অবস্থা আরও নাজুক।
এএইচ





