বিচার হয়েছে। অপরাধীর শাস্তি হয়েছে। রায় কার্যকর হয়েছে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে। ঘটনার স্মরণে দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। বছর ঘুরে সেই দিবস বারবার ফিরেও আসছে আমাদের মাঝে। সবাই মিলে ব্যাপক আয়োজনে পালন করছি দিবসটি। প্রতিবাদ জানাচ্ছি ন্যাক্কারজনক সেই ঘটনার। শপথ নিচ্ছি ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামাতে। তবু থামছে না। ভিন্নরূপে বারবার ফিরে আসছে সে ঘটনা। কিন্তু ফিরে আসছে না শুধু ওরা। যারা চলে গেছে।

আজ থেকে ২০ বছর আগের ঘটনা। দিনটি ছিল ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। দীর্ঘ দিন পর মা'কে দেখার জন্য আকুল হয়ে ঘটনার আগের দিন ঢাকা থেকে দিনাজপুরে বাড়ি ফিরছিলো কিশোরী ইয়াসমিন। কিন্তু দিনাজপুরের কোচে না উঠতে পেরে সে পঞ্চগড়গামী একটি কোচে উঠে। এ কারণে কোচের লোকজন তাকে দশমাইল নামক স্থানে নামিয়ে দিয়ে সেখানকার চায়ের দোকানে জিম্মায় দেয়।

নিরাপদ ও রক্ষক ভেবে ইয়াসমিনকে দিনাজপুর শহরে মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য কাক ডাকা ভোরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় দশমাইলের লোকজন। কিন্তু রক্ষকের পরিবর্তে ভক্ষক হয়ে পথিমধ্যে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর নির্মম ভাবে হত্যা করে পুলিশ।

ইয়াসমিনের লাশ দিনাজপুর শহরে থেকে ৫ কিলোমিটার দুরে ব্র্যাক অফিসের পাশে রাস্তায় ফেলে পুলিশ চলে যায়। পরের দিন পুলিশের এই পৈশাচিক ঘটনা জানাজানি হলে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা শহরে প্রতিবাদ মিছিল বের করে, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।

কিন্তু তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে উল্টো নিষ্পাপ কিশোরী ইয়াসমিনকে পতিতা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে প্রতিবাদী জনতা। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ। বিক্ষুব্ধ জনতার উপর লাঠিচার্জ করে এবং এলোপাতারিভাবে গুলি চালায়। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

২৬ আগষ্ট রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা কোতয়ালী থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকলে পুলিশ আবারও তাদের উপর লাঠিচার্জ ও এলোপাতারিভাবে গুলি চালায়। এসময় হাজার হাজার জনতা কোতয়ালী থানার সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে।

২৭ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা একে একে রাজপথে নেমে এসে সকল প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি এবং দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির দাবিতে বিশাল মিছিল বের করে। এসময় মারমূখী পুলিশ শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি চালায়। ফলে সামু, কাদের ও সিরাজসহ নাম না জানা ৭ জন নিহত হয়। আহত হয় ৩ শতাধিক।

পরে বিক্ষুব্ধ জনগণ শহরের ৪টি পুলিশ ফাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। বিক্ষোভের এই সুযোগ নিয়ে কতিপয় স্বার্থান্বেষী ও দুস্কৃতিকারী প্রেস ক্লাব, স্থানীয় ৫টি পত্রিকা অফিস আগুনে জ্বালিয়ে দেয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইয়াসমিন হত্যা মামলাটি দিনাজপুর থেকে স্থানান্তর করা হয় রংপুরে। ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি ৩টি আদালতে ১শ’ ২৩ দিন বিচার কাজ শেষে ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আব্দুল মতিন মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মামলার রায়ে আসামী পুলিশের এএসআই মঈনুল, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার ও পুলিশের পিকআপ ভ্যান চালক অমৃত লাল বর্মনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান ‘৯৫-এর ৬ (৪) ধারায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেন।

আলামত নষ্ট, সত্য গোপন ও অসহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এএমআই মঈনুলকে আরও ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। চাঞ্চল্যকর ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয় ৮ বছর পর অর্থাৎ ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

ওই নৃশংস ঘটনার পর থেকে প্রতিবছর দিনাজপুরসহ সারাদেশে ২৪ আগস্টকে পালন করা হয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। পাশাপাশি ওই ঘটনার জের ধরে ২৭ আগস্ট স্থানীয় সংবাদপত্রে হামলা এবং আগুন দেয়ায় দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করেন স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা।

শুধু ইয়াসমিন নয়, তার মতো অসংখ্য নারী প্রতিনিয়ত নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সুন্দরভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার পরিবর্তে বরণ করতে হচ্ছে মৃত্যুকে। নারীরা শুধু শারীরিক নির্যাতনের শিকারই হচ্ছে না, মানসিকভাবেও নির্যাতিত হচ্ছে। মানসিক নির্যাতনের সংখ্যাটি অনেক বড়। সেটা হতে পারে শিক্ষিত নারীর ক্ষেত্রে অথবা অশিক্ষিত নারীর ক্ষেত্রে। তবে এই সংবাদটি পত্রিকার পাতায় খুব কমই আসে।

বর্তমানে নারী নির্যাতনের অন্যতম একটি কারণ 'যৌতুক'। আইনগতভাবে ১৯৮০ সালে যৌতুক নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকেই নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। অশিক্ষিত নারীর পাশাপাশি শিক্ষিত নারীরাও যৌতুকের বলি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে এমনকি চিকিৎসক কিংবা চাকরিজীবী হয়েও পরিবারে শান্তি পাচ্ছে না নারীরা।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৯৪৫ থেকে ১৯৬০ সালে যৌতুকের হার ছিল ৩% এবং তা ১৯৬০ থেকে ১৯৭৫ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১১%-এ উন্নীত হয়। আইনগতভাবে ১৯৮০ সালে যৌতুক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নিষিদ্ধ করার পর থেকে ক্রমেই যৌতুকের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মূলত হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবেই বাংলাদেশে যৌতুক প্রথার আগমন। তবে মুসলিম বিবাহ সংক্রান্ত আইন-কানুন পরিবর্তন ও মোহরানা বাকি রাখার প্রবণতাকেও যৌতুক প্রথার জন্য দায়ি করা হয়েছে।

বর্তমান সমাজে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পরিবারেও যৌতুকের জন্য মারধরের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যৌতুকের দাবিতে বিষ দিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করারও ঘটনা দেখা যায়। পারিবারিকভাবে নির্যাতনের শিকার অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছে। এ রকম বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন হচ্ছে।

এ সকল প্রতিহিংসা পরায়ণতা পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের গণ্যমান্যদের এসব বিষয়ের আইন সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সবচেয়ে জরুরী হলো সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সবার মধ্যে সচেতনতাবোধ গড়ে তোলা এবং মানুষকে মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করা। যাতে করে ইয়াসমিনের মতো আর কোন নারী পাশবিক নির্যাতনে মারা না যায়।

এআর