বিশ টাকা দরে দেশীয় সাবান কিনে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে কারখানার ছাদে ফেলে তৈরি করা হচ্ছে বিদেশী সাবান জনসন। গার্মেন্ট কারখানার কাপড় ধোয়ায় ব্যবহৃত তরল সাবানের সাথে রঙ ও সেন্ট মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে নামীদামি ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু। নিম্নমানের স্পিরিটের সাথে রঙ মিশিয়ে সিরিঞ্জ দিয়ে খালি কনটেইনারে ভরে তৈরি হয় বডি স্প্রে। শুধু কি তাই, ঢাকার মিটফোর্ডের পারফিউমের দোকান থেকে নির্ধারিত ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু ও বডি স্প্রের অনুরূপ সেন্ট কিনে মেশানো হয় তাতে। এভাবেই তৈরি হচ্ছে স্নো-পাউডার থেকে শুরু করে সাবান, শেভিং ক্রিম, নেইলপলিশ, লিপস্টিক, মেহেদি, তেল, মেকআপসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল প্রসাধনী, যা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন নামীদামি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেও। দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এগুলো নকল। এসব ভেজাল পণ্য কিনে মানুষ প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল প্রসাধনী ব্যবহারে চর্মরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।

জানা গেছে, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নকল প্রসাধনসামগ্রী তৈরির দুই শতাধিক কারখানা রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অন্ধকার ও খুপরি ঘরে এবং ছাদের উপরে তৈরি করা হয় নকল প্রসাধনী। পরে চকবাজারের পাইকারি বাজার থেকে ছড়িয়ে দেয়া হয় সারা দেশে। অবশ্য এসব নকল প্রসাধনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত অভিযুক্তদের কারাদণ্ড দিলেও জেল থেকে বের হয়ে ফের নকল প্রসাধনী তৈরি করছে অভিযুক্তরা। নকল প্রসাধনী পণ্য তৈরিতে একের পর এক কৌশল পাল্টাচ্ছে অসাধু এ ব্যবসায়ীরা। ফলে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে নকল প্রসাধনীতে।

রোববার দুপুরে পুরান ঢাকার চকবাজারের খান মার্কেট ও চকমোগলটুলিতে অভিযান চালিয়ে চকবাজারে দোকান মালিক সমিতির সভাপতির নকল কারখানা ও দোকানে অভিযান চালিয়ে বিপুল নকল প্রসাধন সামগ্রী ও তৈরির যন্ত্রপাতি জব্দ করেছে র‌্যাব। কারখানাটি সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। নকল প্রসাধন তৈরির অভিযোগে মালিকের ছেলেসহ সাতজনকে দুই বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা বলেন, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মফিজের কারখানায় অভিযান চালিয়ে ২০ লাখ টাকা মূল্যের ২০ হাজার পিস নকল পণ্য জব্দ করে সেগুলো সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে ধ্বংস করা হয়। ইতঃপূর্বে তিনবার ওই কারখানায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের কারাদণ্ড দেয়া হলেও জেল থেকে বেরিয়ে তারা একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। অভিযুক্তরা তাদের দোষ স্বীকার করায় পাঁচ মালিক দ্বীন ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, শামীম, হেমায়েত খাঁন ও সাইদ হোসেনকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরো তিন মাসের জেল দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া কারখানার ম্যানেজার সামাদ হোসেনকে দেড় বছরের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং কারখানার কর্মচারী ওমর ফারুককে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

আনোয়ার পাশা বলেন, অভিযানের সময় ওই মার্কেটের দোতলায় পাঁচটি দোকানে স্তরে স্তরে নামীদামি ব্র্যান্ডের শতাধিক প্রসাধন সাজানো ছিল। দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো আসল না নকল। এ ছাড়া তৃতীয় তলার একটি কক্ষে গড়ে উঠেছে কারখানা যাতে জনসন সাবান তৈরি করা হচ্ছিল। এ কারখানার মালিক মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মফিজ। তিনি অসুস্থ থাকায় প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য মার্কেটে আসেন। তার ছেলে সাইদ হোসেন এবং ম্যানেজার সামাদ নকল কারখানা দেখাশুনা করেন। অভিযুক্ত সাইদ হোসেন জানান, মেরিল সাবান পাইকারি হিসেবে ২০ টাকা পিস কিনে এনে এ কারখানার ছাদে ফেলে জনসন সাবান তৈরি করেন তারা।

ম্যানেজার সামাদ জানান, মার্কেটের দোতলায় যে পাঁচটি নকল সামগ্রী বিক্রির শোরুম রয়েছে সেগুলোও সভাপতি মফিজের তত্ত্বাবধানে চলে। তবে সেগুলো অপর আসামিরা মফিজের কাছ থেকে পজেশন কিনে নিজেরা চালাচ্ছেন এবং প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে মফিজকে দিতে হয় বলে অভিযুক্ত দ্বীন ইসলাম, দেলোয়ার এবং শামীম জানান।

র‌্যাব জানায়, মার্কেটের দোতলার শোরুমগুলোতে পেন্টিন, হেড অ্যান্ড সোল্ডার, রিজয়েস, সানসিল্ক, কিয়ার, ডাভ, গার্নিয়ার, ভেসলিন প্রভৃতি নামীদামি ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু পাওয়া যায়।

অভিযুক্ত দ্বীন ইসলাম জানান, ব্যবহার করার পর খালি কনটেইনার সংগ্রহ করে তাতে গার্মেন্টের লিকুইড সাবান এবং সেন্ট মিশিয়ে ভরে আসলের মতো নকল স্টিকার লাগিয়ে প্যাকিং করা হয়। তারা ৩১০ টাকা মূল্যের পেন্টিন ১০০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন। এগুলোর গায়ে ৩১০ টাকার নকল স্টিকার লাগানো থাকে। কিন্তু অসাধু দোকানদার সব জেনে বুঝে তাদের কাছ থেকে কম দামে এগুলো কিনে নিয়ে গিয়ে খুচরা দোকানে গায়ের মূল্যে অর্থাৎ ৩১০ টাকায় বিক্রি করেন। সাধারণ মানুষ এগুলো আসল ভেবে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। এ দোকানগুলোতে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বডি স্প্রে পাওয়া যায়। ডু ইট, ফগ, এক্স, কুল, মেক্সিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বডি স্প্রে রিফিল করে এখানে পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছিল।

অভিযুক্ত শামীম জানান, বডি স্প্রের খালি কনটেইনার সংগ্রহ করে স্পিরিট এবং কাছাকাছি সেন্ট মিটফোর্ড থেকে সংগ্রহ করে তা মিশিয়ে সিরিঞ্জের মাধ্যমে এগুলোতে ঢুকিয়ে দিয়ে গ্যাস লাইটারের গ্যাস ভরে রিফিল করা হয়। আসল বডি স্প্রের সেন্টের কাছাকাছি সেন্ট ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষ এগুলোর আসল নকল বুঝতে পারেন না। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফেইস ওয়াশ, সাবান, লোশন, পাউডার, স্কিন ক্রিম ইত্যাদি নকল পণ্য পাওয়া যায়। এগুলো নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হয় বলে ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।

ওই এলাকার এক কর্মচারী জানান, এ এলাকায় অনেক ভেজাল পণ্য তৈরির কারখানা রয়েছে। আর এগুলো সাধারণত অন্ধকার ও খুপরি ঘর দেখে বেছে নেয়া হয়। যেখানে লোকজনের চলাচল কম থাকে। এসব কারখানায় কোনো পরীক্ষাগার বা বিশেষজ্ঞ ছাড়াই তৈরি হচ্ছে শীতের প্রয়োজনীয় সব প্রসাধনী।

চকবাজার সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, অবৈধ ওই সব কারখানা থেকে পণ্য এনে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন হাত ঘুরে নকল প্রসাধনী দেশের বড় সুপার শপ, বিপণিবিতান, শহরতলি ও গ্রামে যাচ্ছে। ছোট ছোট দোকানগুলোতে এসব পণ্য অনেকে নকল মনে করলেও বড় বড় শপিংমলগুলোতে অনায়াসেই নকল পণ্যগুলো কিনে ঠকছে ক্রেতা। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন এসব পণ্য কিনে। নগরীর প্রসাধনসামগ্রীর পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইউনিলিভার, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, কোহিনূর কেমিক্যাল থেকে শুরু করে বিদেশ থেকে আমদানি করা নামকরা ব্র্যান্ডের পণ্য অবলীলায় নকল হচ্ছে। এ ছাড়া জনসন, মেরিল, ভ্যাসলিন, নিভিয়া, ডাভ, লাক্স, মাস্কসহ বিভিন্ন লোশন, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বডি লোশন, পন্ডস বডি লোশন, সানস্ক্রিন লোশন, কোল্ড ক্রিম, ফেড আউট ক্রিম, ওলে ক্রিম, গার্নিয়ার লোশনের নকলে সয়লাব বাজার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকার লছমানগঞ্জ, বুড়িশুর, মান্দাইল, কালিন্দি এলাকায় শতাধিক নকল কসমেটিকস কারখানা রয়েছে। অপর দিকে পুরান ঢাকার চকবাজার, মৌলবীবাজার, বড়কাটরা, সদরঘাট, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, রহমতগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, ইসলামবাগ, বংশাল, শ্যামপুর, কদমতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, পোস্তগোলা, ধোলাইখাল, ফরিদাবাদ, ইসলামপুর, সোয়ারীঘাট, দেবীদাস লেন, কামালবাগ, শহীদনগর, টঙ্গীসহ রাজধানীর পাশের নারায়ণগঞ্জের পাগলার বেশ কয়েকটি জায়গায় নকল প্রসাধন তৈরির গুদাম ও কারখানা রয়েছে।

পুরান ঢাকার চকবাজার, মরিয়ম পাজা, আফতাব, মনসুন খান পাজা, তাজমহল মার্কেটসহ অন্যান্য জায়গায় নকল প্রসাধনী বিক্রি হয়। এ ছাড়া গুলিস্তান, স্টেডিয়াম মার্কেট, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, মহাখালী, গুলশান, মিরপুর বিপণিবিতান ও ফুটপাথে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নকল প্রসাধনী। বিভিন্ন মহলায় ঘুরে ঘুরে ফেরিওয়ালারাও বিক্রি করছেন এসব নকল পণ্য।

অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাব-১০ এর মেজর সোহেল হাসান বলেন, নকল প্রসাধন সামগ্রীতে বিশ্ব মানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লেভেল লাগিয়ে জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। এরা ক্ষতিকর কিছু কেমিক্যাল মিশিয়ে এসব নকল প্রসাধনী তৈরি করছে। এতে মানুষ শুধু প্রতারণার শিকার হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে। যেসব অসাধু ব্যক্তি এ ধরনের অপতৎপরতা চালাচ্ছে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা জানান, নকল প্রসাধনসামগ্রীতে বিভিন্ন কেমিক্যাল মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ব্যবহারের ফলে এলার্জি, ক্ষত, কিলয়েড (চামড়া কালো হয়ে যাওয়া), একজিমায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমনকি দীর্ঘদিন নকল কসমেটিক ব্যবহারের ফলে স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে। সূত্র: নয়া দিগন্ত।

কেএইচ