একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ও সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক পদক্ষেপ ছিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিশ্বব্যাপী প্রচারের ব্যবস্থা করা।এর ফলে বাঙালীদের সদ্য শুরু হওয়া সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ লাভ করে বিশাল ব্যাপকতা এবং শুরু হয় বিশ্বব্যাপী আমাদের স্বপক্ষে জনসমর্থন অর্জনে ব্যাপক সাড়া।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতাদের দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিবনগর সরকার গঠন করাটা ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়া। যা একদিকে যেমন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সরকার প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে অন্যান্য রাজনৈতিক তৎপরতার স্বপক্ষের কর্মকাণ্ডের বিশ্ব মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারণা।

অন্যদিকে পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক নিরীহ নিরস্ত্র দেশবাসীর ওপর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নৃশংস হামলা চালিয়ে হাজার হাজার লোককে নির্মমভাবে হত্যা করার কাহিনীর ব্যাপক প্রচারণা ও বিশ্বব্যাপী নিন্দার জোয়ার।

আসলে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়েছিল একটা বাস্তবসম্মত ও সময় উপযোগী সাংবিধানিক পদক্ষেপ।এটা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম একটা উজ্জ্বল ঘটনা এবং জাতীয় জীবনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন আওয়ামী লীগ যথাক্রমে ১৬৭ এমএনএ ও ২৯৩ এমপি পদ লাভকারী দল হিসেবে তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক ও জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছিল সেদিন মুজিবনগর সরকার গঠন করে।

বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে তখন সাংবিধানিক পদক্ষেপ হিসেবে এটাই ছিল তাদের জন্য একমাত্র আইনসম্মত রাজনৈতিক উদ্যোগ।আর তাই এর গ্রহণযোগ্যতাও ছিল ব্যাপক এবং প্রশংসিত হয়েছিলও সর্বত্র এবং সর্বমহলে।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝির দিকে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সহযোগীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তার সহকর্মীদের পাকিস্তানের তৎকালীন বিদ্যমান সমস্যাবলী ও ক্ষমতা হস্তান্তরের বিভিন্ন রূপরেখা নিয়ে যখন আলোচনা শুরু হয় তখনই পাক সামরিক চক্র যেমন বঙ্গবন্ধু ও বাঙালীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না বলে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছিল আর ভেতরে ভেতরে বাঙালীদের দমন করার জন্য সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

বঙ্গবন্ধুও কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিলেন।তাই তিনিও অহিংস অসহযোগিতা আন্দোলন যেমন চালিয়ে যাচ্ছিলেন সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে কিভাবে পাক বাহিনীকে পরাস্ত করা যায় এবং কিভাবে ভবিষ্যতে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে সে বিষয়ে তার সহকর্মীদের যথাযথ নির্দেশনা ও কর্মপন্থা ঠিক করে দিয়েছিলেন।

তাই ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতার হবার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং তার সহকর্মীরাও পূর্বের নির্দেশ মোতাবেক কর্মপন্থী গ্রহণে পদক্ষেপ নেয়।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিকতায় ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণের প্রচারণা করা হয়।মুজিবনগর সরকার গঠনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল কয়েক শত দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের কর্মীরা।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর সাবডিভিশনের বৈদ্যনাথতলা আমবাগানে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হয় প্রেসিডেন্ট এবং তার অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় সৈয়দ নজরম্নল ইসলামকে।

প্রধানমন্ত্রী করা হয় তাজউদ্দীন আহমদকে।ক্যাপ্টেন মুনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী এবং কামারুজ্জামানকে করা হয় স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী।পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী করা হয় খন্দকার মোশতাক আহম্মদকে এবং তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং আওয়ামী লীগের এমএনএ এমএজি ওসমানীকে করা হয় সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।

২৫ মার্চ রাত থেকে পাকবাহিনীর জ্বালাও, পোড়াও, হত্যা ও লুটপাটের পৈশাচিক কর্মকাণ্ড শুরু করার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোকেরা আত্মরক্ষার জন্য আত্মগোপন করতে বাধ্য হয় দেশের এখানে সেখানে।

এমনি পরিস্থিতিতে সংশিস্নষ্ট সবাইকে একত্রিত করে একটা সরকার গঠন করা এবং পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অল্প সময়ের মধ্যে বিজয় ছিনিয়ে আনাটা ছিল সত্যিই একটা কঠিন কাজ।আর এই কঠিন কাজটা সুচারুভাবে সুসম্পন্ন করে ঈপ্সিত অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল মুজিবনগর সরকার।

বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা করা বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে তাদের জন্য যথাযোগ্য প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ জোগাড় করা দুনিয়াব্যাপী কূটনৈতিক কর্ম পরিচালনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও সরকারের সমর্থন আদায়ে স্বার্থক হওয়া এবং এমনি একটা বিরূপ পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় রাখার জন্য যথাযোগ্য কর্মসূচি গ্রহণ করার কাজটা কিন্তু খুবই যোগ্যতা, দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে সুসম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছিল মুজিবনগর সরকার।

পাকবাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা এবং দেশব্যাপী ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা সরকার গঠন করার আর একটা বিশেষ দিক ছিল এই কারণে যে জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা যদি সরকার গঠিত না হতো তাহলে দেশব্যাপী বিছিন্নভাবে গঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিত কারা? কারণ তেমনি একটা পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব প্রদানের সঙ্গত এবং স্বীকৃত যোগ্যতার অথবা দাবিদাবিত্বের প্রশ্ন তো ছিলই।একটা স্বীকৃত এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য সরকার গঠিত না হলে পাকিস্তানীরা এমনি একটা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী চরমপন্থী প্রভৃতি নামে অভিহিত করে দুনিয়াব্যাপী প্রচার-প্রচারণা চালাতে এতটুকু দ্বিধা করত না।তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটা হ্রাস পেত।

তাই স্বাভাবিকভাবে মুজিবনগর সরকার গঠন করার ফলে বিশেষ করে মাত্র কয়েকমাস পূর্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রিয় ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত সরকার কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধকে স্বাধীনতাযুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন নামে অভিহিত করার কোন সুযোগ যেমন ছিল না, তেমনিভাবে এই ধরনের সাংবিধানিকভাবে গঠিত সরকারের কর্মকাণ্ডের ক্রমান্বয়ে সমর্থন জ্ঞাপন করা ছাড়া অন্য কিছুর কোন সুযোগও ছিল কম।

সবচেয়ে বড় কথা হলো মুজিবনগর সরকার এবং এই সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাদের বিভিন্ন বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রচারে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানব অধিকার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা মেনে চলার বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী সমর্থনের পালা ভারি হচ্ছিল প্রতিনিয়তই।

আর এইসব কারণেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হবার পূর্বেই লাভ করে কয়েকটা দেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে পাক বাহিনী কর্তৃক মারাত্মকভাবে ধ্বংসাপ্রাপ্ত এই দেশটির পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আশু সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার নিয়ে।

আর দেশটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পরই।

এসএইচ/ এআর