৭১'র মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলতি মাসেই জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলার রায় আসছে বলে আভাস দিয়েছেন প্রসিকিউশন পক্ষ। এ বছরের ২৪ মার্চ মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হবার পর নতুন করে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়েছে। এ রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে নিজামীর মামলার প্রায় তিন বছরের বিচারিক কার্যক্রমের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
নিজামীর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী একান্ত সাক্ষাৎকারে টাইম নিউজবিডিকে জানান, এ মাসের মধ্যেই নিজামীর রায় আসতে পারে বলে প্রসিকিউশন পক্ষ আশা করছে। তবে রায় কখন হবে সেটা আদালতের ব্যাপার।
অন্য আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও নিজামীর মামলা পরিচালনা করে তৃপ্তি পেয়েছি। আমরা তার বিরুদ্ধে সব কয়টি অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি কাদের মোল্লার মত তাকেও আদালত সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত করবেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397223483.jpg[/img]
আসামী পক্ষের আইনজীবী আসাদ উদ্দিন টাইম নিউজবিডিকে জানান, প্রসিকিউশন নিজামীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ও প্রমাণ করতে পারেনি। যে সকল সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা হয়েছে তাদের কোন গ্রহণ যোগ্যতা নেই। তারা স্থানীয় দালাল, চোর ও বাটপার । যে সকল দালিলিক তথ্য আদালতে দেয়া তার কোন বাস্তবতা নেই। নিজামী সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ, তার পক্ষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররাও সাক্ষ্য দিয়েছেন। অবশ্যই নিজামী খালাস পাবেন।
২৪ মার্চ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -১ চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য পুনরায় অপেক্ষমান রাখেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397223978.jpg[/img]
২০ নভেম্বর তৎকালীন বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর দ্বিতীয় দফা অপেক্ষমান (সিএভি) রাখে ট্রাইব্যুনাল।
তারও আগে ১৩ নভেম্বর এ মামলায় আসামি পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন অসমাপ্ত রেখেই রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখে ট্রাইব্যুনাল। পরে ১৪ নভেম্বর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের আদেশ পুর্নবিবেচনার আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তাদেরকে আরেকবার সুযোগ দেন। এরপর আসামিপক্ষ ২০ নভেম্বর তাদের যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন করেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর আমির সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ।
এরপর ট্রাইব্যুনাল-১ এর প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২৮ মে মানবতাবিরোধী অপরাধে হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরকিল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি অভিযোগ গঠন করেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397224017.jpg[/img]
নিজামীর বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ আগস্ট থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রসিকিউিশনরে সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মুক্তযিোদ্ধা, অধ্যাপক, সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদসহ মোট ২৬ সাক্ষী।
অন্যদিকে ২১ অক্টোবর নিজামীর পক্ষে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তার পক্ষে প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন পাবনার মুক্তিযোদ্ধা কে এম হামিদুর রহমান। তিনি ১৯৬৮-৬৯ সময়ে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তার ছেলেসহ নিজামীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন চারজন।
২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগের মামলায় মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে একই বছরের ২ আগস্ট এক আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
উল্লেখ্য, নিজামীর রায়টিই হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১০ম রায়। এর আগে উভয় ট্রাইব্যুনাল থেকে নয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বিচারিক আদালত দশ ট্রাক অস্ত্রমামলায় নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতকরেন।
[b]নিজামীর বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ[/b]
নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৪(১), ৪(২) ধারায় মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর মধ্যে ৪(১) ও ৪(২) ধারায় আনা হয় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (উর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) অভিযোগ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1397224124.jpg[/img]
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, পাবনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালাতেন। ৭১'র ৪ জুন পাকিস্তানি সেনারা তাকে অপহরণ করে নূরপুর পাওয়ার হাউসের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিজামীর উপস্থিতিতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ১০ জুন তাকে ইছামতী নদীর পাড়ে অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১'র ১০ মে বেলা ১১টার দিকে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় নিজামী বলেন, শিগগিরই পাকিস্তানি সেনারা শান্তি রক্ষার জন্য আসবে। ওই সভার পরিকল্পনা অনুসারে পরে বাউশগাড়িসহ দু’টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ করে রাজাকাররা।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১'র মে মাসের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প ছিল। রাজাকার ও আলবদর বাহিনীও সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। নিজামী ওই ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র করতেন।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১'র ১৬ এপ্রিল বেলা ১১টার দিকে নিজামীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা ঈশ্বরদী উপজেলার আড়পাড়া ও ভূতের বাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় ২১ জন নিরস্ত্র মানুষ মারা যায়।
অষ্টম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩০ আগস্ট নিজামী নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলে গিয়ে সেখানে আটক রুমী, বদি, জালালদের হত্যার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের প্ররোচনা দেন।
দশম অভিযোগে বলা হয়েছে, পাবনার সোনাতলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র কুণ্ডু প্রাণ বাঁচাতে ভারতে চলে যান। নিজামীর নির্দেশে রাজাকাররা তার বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়।
১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১'র ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে ইসলামী ছাত্রসংঘ আয়োজিত সভায় নিজামী বলেন, পাকিস্তান আল্লাহর ঘর। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তিনি প্রিয় ভূমির হেফাজত করছেন। দুনিয়ার কোনো শক্তি পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারবে না।
১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমি হলে আল মাদানীর স্মরণসভায় নিজামী বলেন, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে শত্রুরা অস্ত্র হাতে নিয়েছে। তিনি পাকিস্তানের শত্রুদের সমূলে নির্মূল করার আহ্বান জানান।
১৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে ছাত্র সংঘের সভায় নিজামী বলেন, হিন্দুস্তানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে রাজাকার, আলবদররা প্রস্তুত।
১৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে রাজাকারদের প্রধান কার্যালয়ে এক সুধী সমাবেশে নিজামী প্রত্যেক রাজাকারকে ইমানদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আল্লাহর পথে কেউ কখনো হত্যা করে, কেউ মারা যায়। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ছাত্র সংঘের সদস্য, রাজাকার ও অন্যদের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের উসকানি ও প্ররোচনা দেন।
১৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১'র মে মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজাকার ক্যাম্প ছিল। নিজামী প্রায়ই ওই ক্যাম্পে গিয়ে রাজাকার সামাদ মিয়ার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করতেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়।
১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭১'র ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রাক্কালে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে আলবদর বাহিনী। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আলবদর সদস্যরা ওই গণহত্যা ঘটায়। জামায়াতের তত্কালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে ওই গণহত্যার দায় নিজামীর ওপর পড়ে।
[b]ঢাকা: কেএ ৯ এপ্রিল (টাইম নিউজ) / / জেআই[/b]





