মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই চলছে ব্যাপক অস্থিরতা। সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের চোখ সরে যায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তিউনিশিয়া, লিবিয়া, মিশর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন আর ইয়েমেন। তবে, সাম্প্রতিক কয়েকটি দিনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ইয়েমেন। আরব সাগরের দীর্ঘ উপকূলব্যাপী অবস্থিত ইয়েমেনে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছিল সেই আরব বসন্তের শুরুতে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক মাস ধরে এই অস্থিরতা নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
গত ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার দেশটিতে শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী হুতিদের উপর বিমান হামলা চালায় প্রতিবেশী সৌদি আরব। ইয়েমেনের হুতি শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী একের পর এক শহর ও অঞ্চল দখল করে চলেছে। হুতিদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ে দেশটির নিয়মিত সরকারি সেনাবাহিনী ও সুন্নীপন্থী মিলিশিয়া বাহিনীগুলো প্রায় কোণঠাসা।
গত মাসে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। প্রেসিডেন্ট আব্দুরাব্বু মানসুর হাদিকে গৃহবন্দী করে রাখে তারা। গৃহবন্দী অবস্থা থেকে পালিয়ে দেশটির বন্দর নগরী এডেনে চলে যান প্রেসিডেন্ট আব্দুরাব্বু। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। হুতিরা এবার এডেনের দিকে এগুচ্ছে। শেষ খবর জানা পর্যন্ত এডেনের নিকটবর্তী দেশটির সবচেয়ে বড় বিমান ঘাঁটিটি দখলে নিয়েছে হুতিরা। হুতিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে সেনাবাহিনীতে থাকা শিয়া যোদ্ধারা। ফলে তাদের শক্তিমত্তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুগুণে।
এমতাবস্থায় প্রতিবেশী সুন্নী সৌদি আরবের কিছুতেই সহ্য হবার কথা নয়। ফলে, যা হবার তাই হয়েছে। তারা অন্যান্য আরব দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে বিমান হামলা শুরু করেছে ইয়েমেনের হুতিদের অবস্থানে। সৌদি আরবের অভিযোগ এবং দৃঢ় বিশ্বাস, হুতিরা শিয়া শাসিত ইরানের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব করার সাহস পাচ্ছে। এদিকে, হুতিদের উপর সৌদি আরবের বিমান হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। এর মানে, ইয়েমেনে এখন মূলত ইরান ও সৌদি আরবের ছায়া যুদ্ধ চলছে। এই ছায়া যুদ্ধের পরিণতি কী এবং তা কোনদিকে মোড় নেয় তা কেউই সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।
ইয়েমেনে প্রথম থেকেই মূলত সৌদি আরবের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। ১৯৩০ সালে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইয়েমেনে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার দেখতে চেয়েছেন সৌদি বাদশাহ। ইয়েমেন যেন সৌদি স্বার্থবিরোধী কিছু না করে এ ব্যাপারে সচেষ্ট ছিল দেশটি। এ ব্যাপারে সময়েই সময়েই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোকে দমনে সহায়তা করা, উপজাতীয় নেতাদের কিনে নেওয়া এবং বিশেষ প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপ করতো সৌদি আরব।
তবে, এবারই সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সর্বোচ্চ স্বার্থের বিষয়টি চলে এসেছে। সৌদি আরব তার প্রতিবেশী ৮টি দেশ নিয়ে একটি যৌথ বাহিনী গঠন করেছে এবং বিমান হামলাও শুরু করেছে। এই যৌথ বাহিনী ইয়েমেনের উপকূল বন্ধ করে দিয়েছে যাতে করে হুতি মিলিশিয়া ও সেনাবাহিনীতে থাকা তাদের সমর্থক যোদ্ধাদেরকে পরাভূত করা যায়। যৌথ বাহিনী প্রেসিডেন্ট মানসুর হাদিকে আবার দেশটির কার্যকরী প্রেসিডেন্ট বানাতে চায়।
হুতিরা সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহর অনুসারী ছিল, যিনি আরব বসন্তের কারণে পদত্যাগে বাধ্য হন। সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় ২০১২ সালে সালেহর পরিবর্তে ক্ষমতায় আসেন আব্দুরাব্বু মানসুর হাদি। কিন্তু সালেহ পদত্যাগ করলেও সেনাবাহিনীতে তার ব্যাপক প্রভাব রয়ে গেছে এখনো। তার অনুগত সেনারাই রাজধানী সানা দখল করতে হুতিদেরকে সহায়তা করে। এরপর এখন হাদির শক্ত ঘাঁটি এডেনের দিকেও অগ্রসর হচ্ছে হুতিরা।
ইয়েমেনে এখন মূলত সৌদি আরব তথা আরব বিশ্বের সঙ্গে ইরানের প্রক্সি যুদ্ধ চলছে। গত এক দশকের মধ্যে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও বাহরাইনে প্রায় একই রকম প্রক্সি যুদ্ধ লক্ষ্য করা গেছে। মূলত ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পরই বিভিন্ন দেশে এই প্রক্সি যুদ্ধ দেখা যায়। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আরব বিশ্বের মূল শক্তি অর্থ্যাৎ সৌদি আরব, মিশর ও উপসাগরীয় দেশগুলো এক অন্যরকম অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। এই অস্থিরতার কারণগুলো হচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর নতুন সরকারে প্রভাব বিস্তার, হিজবুল্লাহ ও হামাস ও সিরিয়ার আসাদ সরকারের প্রতি ইরানের সমর্থন।
এখন দেখার বিষয় ইরান ও আরব বিশ্বের এই ছায়া যুদ্ধের বিস্তার কতটুকু ছড়ায়, আর পরিণতিই বা কী হয়? ইরানও প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগুচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। আর ইরানের ব্যাপারে এক ফোটাও ছাড় দিতে রাজি নয় সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব বিশ্ব।
রয়টার্স থেকে ভাষান্তর: শাহ মোহাম্মদ আতিকুল্লাহ
এমএ





