১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১। বাংলার দামাল ছেলেদের আক্রমনে পাক হানাদার বাহীনির মনোবল ভেঙ্গে যায়। একাত্তরের এদিন অধিকাংশ জেলা পাক বাহীনির হাত থেকে মুক্ত হয়। বাংলার আকাশে উড়তে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
এদিন রাতে হিলি ও খাদিমনগরে ভয়াবহ যুদ্ধের পর দখলমুক্ত হয় বগুড়া ও ময়মনসিংহ। মুক্ত হয় কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, জামালপুরসহ অনেক জেলা। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর, উপকূলীয় অবকাঠামো, নৌযান ইত্যাদি নিষ্ক্রিয় করতে ভারতের নৌবাহিনীর বিমান ও যুদ্ধজাহাজের চূড়ান্ত তৎপরতা শুরু হয়।
এদিকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী নিয়ন্ত্রিত মধুপুরে যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানি ব্রিগেডের সঙ্গে প্রচন্ড যুদ্ধ চলে যৌথ কমান্ডের। পশ্চাদপসরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে পাকিস্তানিদের জন্য। আকাশ ও স্থলে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে দিশাহারা হয়ে নদীপথে পালানোর চেষ্টা করে পাকসৈন্যরা। কিন্তু আগে থেকেই সর্বত্র সতর্ক প্রহরা বসিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। তাই পালাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে পাক সেনারা।
একাত্তরের এ দিনে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতিনিধি ভোরেন্টসভকে হুশিয়ার করে বলেন, ১২ ডিসেম্বর মধ্যাহ্নের আগে ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুশিয়ারি সামান্যতম মনোবল ভাঙতে পারেনি মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর। এই হুশিয়ারির পর চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে পাক হানাদারদের ওপর আরও আক্রমনাত্মক হামলা চালায় মুক্তিপাগল বাঙালী। যুদ্ধ চলছে, আর একের পর এক মুক্ত হচ্ছে আমাদের প্রিয় জম্মভুমি।
একাত্তরের এদিন ঢাকার আশপাশের মানুষ পেয়েছিল মুক্তির স্বাদ। মুক্তিবাহিনীর মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিজয়। ঢাকা বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে চারদিক থেকে ট্যাঙ্কসহ আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে বাংলার বীর মুক্তিসেনারা এগিয়ে আসছিল। পথে পথে যেসব জনপদ, গ্রাম, শহর-বন্দর পড়ছিল সর্বত্রই মুক্তিসেনারা নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে ওড়াতে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠান। তবে পরাজয় ঠেকানোসহ আত্মসমর্পণ না করার জন্য পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তখনও শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী পরাজয় সুনিশ্চিত বুঝে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের কাছে এক তারবার্তা পাঠান। এতে ছিল আত্মসমর্পণের প্রস্তাব। আরো ছিল পাকিস্তানি সেনা ও বেসামরিক অবাঙালি নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের অনুরোধ। তবে পাকবাহিনীর পরাজয়ের প্রকৃত অবস্থাটি বোঝার চেষ্টা করেননি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান।
তিনি পাল্টা তারে উ থান্টকে অনুরোধ করেন যেন ফরমান আলীর অনুরোধ রক্ষিত না হয়। তাছাড়া জাতিসংঘে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতা জুলফিকার আলীকেও এর প্রতিবাদের নির্দেশ দেন তিনি। এদিকে জেনারেল মানেকশ তারবার্তায় রাও ফরমান আলীকে জানান, পালিয়ে যাওয়ার যে কোনো প্রচেষ্টার পরিণাম হবে ভয়াবহ। বাঙালি সেনারা একে একে দখল করে নিচ্ছিলেন দেশের বিভিন্ন এলাকা। আর প্রতি মুহূর্তে রচিত হচ্ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়।
এমআর





