বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে,পরিবর্তিত হচ্ছে সমাজ কাঠামো,বিকশিত হচ্ছে সভ্যতা। পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে মানুষের জীবনযাত্রায়। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য, বন্ধ হয়নি নারী নির্যাতন। নারী’ এই শব্দটি প্রাচীন কাল থেকে প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ নানাভাবে নির্যাতিত ও শোষিত হচ্ছে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং সমাজের উন্নয়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও সাধারণভাবে তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকারের দিক দিয়ে এখনো পুরুষের সমকক্ষ নয়। অথচ এই নারীর কারণেই একটি সন্তান পৃথিবীর আলো দেখতে পায়, একটি সুন্দর জীবনের শুভ সুচনা হয়।

অথচ নারীদের জীবন আমাদের এই সমাজে শুধুই একজন সামান্য নারী হিসাবে চিহ্নিত, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমাদের সমাজে নারী পুরুষ উভয়ই সমান অধিকারী। কিন্তু এই অধিকার নারীরা কতটুকু পায়? তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিকার থেকে বঞ্চিত। আইয়্যামে জাহেলিয়াত যুগে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করা ছিলো লজ্জার বিষয়। ফলে লজ্জা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য কন্যা সন্তানকে জীবিত কবর দিতে লজ্জাবোধ করতো না।

হিন্দু ধর্মে যত তাড়াতাড়ি অর্থাৎ ১৬ বছরের পূর্বে বিয়ে দেওয়াকে বলা হতো ‘গৌরী দান’। আমাদের দেশে নারী নির্যাতন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ক্ষুধা, দারিদ্র, অপুষ্ঠি, অশিক্ষা, বেকার সমস্যা এই সকল সাধারণ সমস্যার পাশাপাশি নারীদের আরো কিছু মারাত্মক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় শুধুমাত্র তারা নারী বলে।এ নির্যাতনের কোনো শেষ নেই। এসিড সন্ত্রাস, ইভটিজিং,পারিবারিক সন্ত্রাস, যৌতুক, ধর্ষণ, ফতোয়া, গৃহ পরিচারিকা নির্যাতন এরকম আরো অনেক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা যাবে।

আধুনিক কালে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটলেও নারী নির্যাতন বন্ধ হয় নি। অথচ দেশে আইনের সঠিক ব্যবহার নেই বললেই চলে। তাই নারী নির্যাতন কমছে না। বরং বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বিবেক অপমানিত হয় তখন যখন আমরা দেখি নারী দ্বারা নারী নির্যাতিত হচ্ছে।

মানবসভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে নারীর অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। লাখ লাখ বছর আগে গুহাবাসী নারী-পুরুষ যৌথ প্রচেষ্টায় যে জীবন শুরু করেছিল, তা ক্রমেই বিকশিত হয়ে আজকের সভ্যতার সৃষ্টি। নারী-পুরুষের স্বার্থ এক ও অভিন্ন।

প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্য এলিমিনেশন অব ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’ বা আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়।নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীদের এক সম্মেলনে ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলন দিবসটিকে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস উদ্যাপন কমিটি ১৯৯৭ সাল থেকে এই দিবস ও পক্ষ পালন করছে। নারী নির্যাতন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এ দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়ে থাকে।

এ বছর এই পক্ষ এমন সময়ে পালন করা হচ্ছে যখন বাংলাদেশে তনু, মিতু, রিশার খুনিদের এখনো কোনো বিচার হয়নি। পূজার মতো পাঁচ বছর বয়সী ছোট্ট শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের নারীদের ওপর চলছে ভয়ঙ্কর নিপীড়ন। সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নারীরা সহিংসতা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

তাই নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে না দেখে তার সঠিক মর্যাদা তাকে দেওয়া উচিত। সকল অভিশাপ থেকে নারীকে মুক্ত করতে হবে। নারীরা প্রতিনিয়ত কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন। নির্যাতিত নারীদের অধিকাংশই নীরবে নির্যাতন সহ্য করেন। এই নির্যাতন নারীর অগ্রগতির পথে একটি মারাত্মক হুমকি বা বাধা।
ইমরান