পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদীয় দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধিকারের প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকার করেন ইয়াহিয়া। ফলে যা আশংকা করা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত তা-ই হল। দুই দিনের মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার এ খবর দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ।

এ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর আইন ও সংবিধান উপদেষ্টা ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। কি প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায় এবং এর আইনি সমাধান কি- সে বিষয়ে দুই পক্ষের আইন উপদেষ্টাদের একটি বৈঠকের ব্যাপারেও দুই নেতা সম্মত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে আজকের দিনে দুই পক্ষের আইন বিশেষজ্ঞদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক কমিটির সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষে তার আইন উপদেষ্টা বিচারপতি কর্নেলিয়াস, জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান অংশ নেন। এ বৈঠকে দুই পাকিস্তানের জন্য পৃথকভাবে দুটি সংবিধান রচনা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। এ বৈঠক সম্পর্কে শহরে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিশেষ মহল গুজব ছড়িয়ে দেয়, শেখ মুুজিব ক্ষমতার লোভে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আপসরফা করে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে যাচ্ছেন। তারা দেশব্যাপী প্রচারণা চালায়, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় ইসলাম ও কোরআনি মুসলমানরা জীবন বাজি রেখে শেখ মুজিবের এই হালুয়া-রুটি ভাগাভাগির ষড়যন্ত্র রুখে দেবে।

১৭ই মার্চ সকাল থেকে বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর ভবনের সামনে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সমবেত হতে থাকে। সমবেত জনতার মধ্য থেকে মুহুর্মুহু স্লোগান ওঠে- ‘আপস নয়, সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম, তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার নেতা আমার নেতা- শেখ মুজিব শেখ মুজিব, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ইত্যাদি। অপরদিকে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সার্বিক সহায়তা দেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, গণচীন, ভারতসহ বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান। নেতারা এক দফার আন্দোলনকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সব জেলা ও থানা কমিটির প্রতি আহ্বান জানিয়ে সবাইকে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, তবে শুরু হবে এক দফার সংগ্রাম। ১৭ই মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা শেষে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলার মানুষ কোনো আপস বা সমঝোতা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে স্বাধিকারের দাবি মেনে না নিলে এক দফার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আদায় করা হবে।

এ দিন ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতার মিছিলের ঢল নামে। তারা মিছিলে মিছিলে রাজপথ মুখরিত করে স্বাধীনতা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করে। বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত ছাত্র ইউনিয়নের সমাবেশ থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জেনারেলদের ঢাকা আগমনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। বিকালে নগরীতে স্বাধীনতাকামী আন্দোলনরত কয়েকটি ছাত্র গ্র“পের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কুচকাওয়াজে বিপুলসংখ্যক ছাত্রীও অংশ নেয়। কুচকাওয়াজে ডামি রাইফেলও ব্যবহার করা হয়।

এআইজে