আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। বর্তমান দুনিয়ায় গণতন্ত্র একটি বিশ্বজনীন মতাদর্শ হলেও দিবসটির প্রচলন হয়েছে বেশি দিন হয়নি। ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের গৃহীত একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২০০৮ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালিত হয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ২০১৫ উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এক বাণীতে বলেছেন, ‘সুশীল সমাজ গণতন্ত্রের অক্সিজেন। সুশীল সমাজ সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।’
গণতন্ত্র এমন একটি শাসন ব্যবস্থা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান ভোট বা অধিকার আছে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরির ক্ষেত্রে সব নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে।
এ বছর জাতিসংঘ দিবসটির প্রতিপাদ্য করেছে, ‘স্পেস ফর সিভিল সোসাইটি। সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজের সরকারের প্রতি দায়িত্ব ও যথার্থ গণতন্ত্রায়নে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যার স্বীকৃতিও দিচ্ছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে। এখানে সর্বময় ক্ষমতা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সংসদের ওপরে ন্যস্ত থাকে। এই ব্যবস্থায় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নগণ্য।
যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বর্তমানে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু আছে। আমাদের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু রয়েছে। এখানে সর্বময় ক্ষমতা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সংসদের ওপরে ন্যস্ত থাকে। এই ব্যবস্থায় সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নগণ্য। যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বর্তমানে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু আছে।
এদিকে শুধু নির্বাচন আয়োজন করেই একটি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জরুরি। ১৫ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে এমন মতামত দিয়েছেন জাতিসংঘের দুই বিশেষজ্ঞ আলফ্রেড দে জায়াস ও মাইনা কিয়াই।
তারা আরও বলেছেন, দমনমূলক নীতির কারণে বিশ্বের কয়েকটি দেশে গণতন্ত্র অব্যাহতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা এ পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়ে বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোর প্রতি গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়, ওএইচসিএইচআর এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বার্তা দেন ‘গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক নিয়ম শৃঙ্খলা প্রচারণা’ বিষয়ক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ আলফ্রেড দে জায়াস এবং ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা’ বিষয়ক বিশেষ র্যা পোর্টিয়ের মাইনা কিয়াই। গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন দেশে দমননীতি ছাড়াও জনগণের ইচ্ছাকে আমলে না নিয়ে কতিপয় অংশের প্রভাব বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন তারা। তাই এ বছর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্য হলো নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা।
জাতিসংঘের এ দুই বিশেষজ্ঞ বলেন, গণতন্ত্র এখন অতিরিক্ত ব্যবহৃত এক শব্দে পরিণত হয়েছে। এমনটি স্বৈরশাসকরাও গণতন্ত্রের কথা বলছেন। শুধুমাত্র নির্বাচন আয়োজন করেই একটি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। নির্বাচনগুলোর মাঝখানের সময়ে কি ঘটছে তা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ কথা বলতে পারছে কি না? তারা যাদের নির্বাচিত করেছে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারছে কি না? তাদের প্রভাবিত করতে পারছে কি না? মানুষের প্রয়োজন, ইচ্ছা আর তাদের ওপর প্রভাব রাখে এমন নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না? দুঃখ দুর্দশার কথা প্রকাশ করার অন্য সব উপায় ব্যর্থ হওয়ার পর মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে পারছে কি না? শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত পোষণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে কি না এবং অনুপ্রাণিত করা হচ্ছে কি না যেন একটি গ্রুপের দ্বারা একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার না হয়। এ বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, এগুলো হওয়ার জন্য নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। এটা নিঃসন্দেহে সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য জরুরি।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে আমরা সকল রাষ্ট্রের প্রতি এটা উপলব্ধি করার আহ্বান জানাই। দুঃখজনকভাবে বর্তমানে নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে। আপাত গণতান্ত্রিক এবং গণতন্ত্রের ঐতিহ্য নেই- দুই ধরনের রাষ্ট্রেই এ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। নির্বাচিত কর্মকর্তা আর জনগণের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক বৈধতা নেই এমন কতিপয় গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ফলে গণতন্ত্র ক্ষয় হওয়ার উদ্বেগজনক ঘটনাপ্রবাহ আমরা লক্ষ্য করেছি। গণতান্ত্রিক সুশাসন তাদের দ্বারা দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে যারা গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ে না।
এ কারণে আমরা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নাগরিক সমাজের জন্য অধিকতর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানাই যেন তারা গণতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হিসেবে তাদের ন্যায্য অবস্থান নিতে পারেন।
এমএইচ





