ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি। এ ব্যাধি সাধারণত আমাদের যুবকসমাজের মাঝে পরিলক্ষিত হয়। তাহলে এর দায় নিবে কে? কেন করা হয় ইভটিজিং ? এ জন্য কি আমাদের সমাজ দায়ী ? নাকি আমাদের যুবক সমাজের মূল্যবোধের অভাব। তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে।
আজ ইভটিজিং প্রতিরোধ দিবস। এর ইতিহাস পরিলক্ষিত করলে দেখা যায়, খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থের নাম বাইবেল। বাইবেলের আরেক নাম ইনজিল। খ্রিষ্টান ও মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন যে, বাইবেল একটি আসমানী কিতাব।
বাইবেলের প্রধান চরিত্র Adam ও Eve, পবিত্র কোরানে তাঁদেরকে বলা হয়েছে আদম ও হাওয়া। বাইবেলের Eve ও কোরানের হাওয়া একই ব্যক্তি। কাজেই Eve শব্দটির উৎপত্তি বাইবেলে।
বাইবেলে Eve শব্দ দ্বারা হাওয়াকে বুঝালেও বর্তমানে শব্দটির অর্থের ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়। Eve শব্দটির যৌগিক অর্থ হাওয়া, কিন্তু রুপকার্থে রমনী, নারী, নায়িকা, প্রিয়তমা।
ব্যবহারিক অর্থে আরো আছে। আমাদের লক্ষ্য 'Eve' শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ তুলে ধরা। এ ক্ষেত্রে শব্দটি যোগজয় অর্থের দিকে নজর দিব। সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছরের মেয়েদেরকে বোঝায়, যাদের বলা হয় 'teen ager'। Eve teasing বলতে নারীকে বিরক্ত করা অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ইয়ার্কি ঠাট্রার মাধ্যমে আমরা দাদি নানিকেও বিরক্ত করি। কিন্তু সেটা Eve teasing এর মধ্যে পড়ে না। বিরক্ত করার মধ্যে দিয়ে যদি কোন অনৈতিক প্রস্তাব, প্রেম ভালোবাসার প্রস্তাব, লোভ লালসার ইঙ্গিত, ভয় দেখিয়ে বা জিম্বি করে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা, অবৈধ কাজে প্রলুব্ধ করা।
Eve teasing যে কেবল টিন এজারের মধ্যেই ঘটে তা নয়। যে কোন মেয়ে বা নারী- যে বয়সের হোক না কেন, অন্য কোন পুরুষ কর্তৃক আপত্তিকর আচরণের শিকার হলেই তা Eve teasing। বিবাহ-পূর্ব ভালোবাসা অশালীন কথাবার্তা বলা, প্রেমপত্র, মোবাইল ফোনে শ্রুতিকটু আলাপ, জনতার ভিড়ে পরপুরুষ কর্তৃক ইচ্ছাকৃত ধাক্কা ধাক্কি, ষ্পর্শ করা, চোখের ভাষায় অশুভ ইঙ্গিত করা, কথনে, ইঙ্গিতে ইন্দ্রীয় অনুভুতি উপলব্ধি করবার দূরভিসন্ধিকে Eve teasing বলা হয়।
ইভ-টিজিং (Eve-teasing) কেন হয়?
প্রত্যেকটি মানুষের রক্তের ভেতরেই তার স্বভাবের পরিচয় নিহিত রয়েছে। কেও সেটি বিবেকের শাসনে দমিত রাখে, কেও পারে না। যে পারে না, তার যুক্তি নজরুল ইসলামের ভাষায় ' তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ?'
না অপরাধ নয়, চেয়ে থাকা অপরাধ নয় যদি সে চাহনিতে কোন দূরভিসন্ধি না তাকে। কিন্তু অনেকের চাহনি নিষ্কলুস নয়, বিশেষ করে টিন এজারদের, যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৯।
এই বয়সের ছেলে মেয়েরা আবেগ প্রবণ হয়ে থাকে। যৌবনের উত্তাপে ধীরে ধীরে উষ্ণ থেকে উষ্ণতা হয়। পিতামাতা বা অভিভাবক কর্তৃক নৈতিক শিক্ষা না পেলে বেয়ারা বা বখাটে হয়ে যায়। তখন সে ইভ-টিজিং সহ অন্যান্য অপরাধে আসক্ত হয়।
যে কারণে ইভ-টিজিং হয়-
১) ধর্মীয় অনুশাসন না থাকার কারণে, ২) নৈতিক জ্ঞানের অভাব থাকলে। ৩) নারীকে অবলা মনে করলে, ৪) পাশ্চাত্যের ফ্রি সেক্সের প্রভাবে, ৫) প্রেমের কারণে বা প্রেমে ছ্যাকা খাওয়ার কারণে, ৬) রমণীর দেহ উপবোগের মোহে, ৭) অভিভাবকের অতি প্রশ্চয় বা উদাসিনতার কারণে, ৮) নাটক, সিনেমা, গল্পে, উপন্যাসে বিবাহ পূর্ব প্রেমলীলা/পরকীয়া প্রেমের কারণে, ৯) সমেচ্ছ মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে, ১০) ইভ-টিজিং এর পরিনাম না জানার কারণে, ১১) ধনী লোকের জামাই হওয়ার লোভে, ১২) অতি আধুনিকা মেয়েদের অশালীন আচরণের কারণে, ১৩) ভূক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় না নেয়ার কারণে, ১৪) আইন শক্তিশালী না হওয়ার কারণে, ১৫) আইনের প্রয়োগ না থাকার কারণে, ১৬) পাঠ্য পুস্তুকে আছে, এমন কিছু অনৈতিক পাঠ্য করে বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখাতে যেয়ে।
ইভ-টিজিং এর কূ-প্রভাব-
১) স্কুল কলেজগামী মেয়েরা রাস্তাঘাটে নিরাপত্তার অভাববোধ করে, ২) মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়, ৩) মেয়েদের বাইরে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়, ৪) অপমানিত হয়ে অনেক মেয়ে আন্তহত্যার মত পথ বেছে নেয়, ৫) চরিত্রবান হয়ে উঠবার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায়, ৬) বংশের মান মর্যাদা ক্ষুন্য হয়, ৭) পারিবারিক শান্তি ব্যহত হয়, ৮) অভিভাবক চিন্তিত হয়ে পড়েন, ৯) সমাজে বখাটে ছেলেদের দৌড়াত্ব বৃদ্ধি পায়, ১০) আইন শৃংখলার অবনতি ঘটে।
প্রতিকার-
ইভ-টিজিং হতে নিস্তার পেতে হলে ধর্মীয় বিধি নিষেধ মেনে চলা তথা কোরআন ও হাদিসের আলোকে নিজেদেরকে পরিচালিত করলেই শুধূ ইভ-টিজিং এর কবল হতে মূক্তি পাওয়া সম্ভব। কারন সকল সমস্যার সমাদান দিতে পারে একমাত্র আল-কোরআন। আসুন আমরা আমাদের সকলের ব্যক্তিগত জীবনের একমাত্র অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে আল-কোরআনকে বেছে নেই। শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয় রাস্ট্রের অপারেটিং সিস্টেমও যেন আল-কোরআন হয় সেই প্রচেষ্টায় আমরা শরীক হই।
আজ বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুশাসন কি অনেকেই জানেন না তাই তাদেরকে পৃথকভাবে ইভ-টিজিং প্রতিরোধে কিশোর/তরুদের করনীয় ও কিশোরী/ তরুনীদের করনীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হ'ল। আশাকরি এগুলো মেনে চললে কিছুটা সূফল পাওয়া যাবে আমার বিশ্বাস।
কিশোর তরুণদের করণীয়-
১) ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে, ২) আবেগকে সংযত রাখতে হবে, ৩) অনৈতিক চিন্তা বাবনা পরিহার করতে হবে, ৪) নিজেকে সৎ হতে হবে, ৫) বিবাহ পূর্ব প্রেম-প্রীতি পরিহার করতে হবে, ৬) বখাটে বন্ধুদের এড়িয়ে চলতে হবে, ৭) মেয়েদেরকে মায়ের জাত মনে রেখে তাদের উপযুক্ত সম্মান দিতে হবে, ৮) কোন মেয়ে আক্রান্ত হলে তাকে সাহয্যের জন্য এগিয়ে আসতে হবে, ৯) সম্প্রীতির মনোভাব বজায় রাখতে হবে, ১০) হিংসা প্রতিহিংসা পরিহার করতে হবে।
কিশোর তরুনীদের করনীয়-
ইভ-টিজিং বন্ধে তরুনিদেরকেও ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে হবে। কথায় বলে- এক হাতে তালি বাজে না। ইভ-টিজিং এর জন্য কেবল পুরুষদেরকেই দায়ী করা যায় না, নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পরে। কাজেই তরুনী তথা নারীদের করনীয় ভূমিকা উল্লেখ করা হ'ল।
১) ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে, ২) সবক্ষেত্রে উগ্রতা পরিহার করতে হবে, ৩) আচার আচরণে নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী হতে হবে, ৪) অশালীন আচরন ও পোষাক পরিহার করতে হবে, ৫) পর-পুরুষদের এড়িয়ে চলতে হবে, ৬) পর্দা প্রথা মেনে চলতে হবে, ৭) আপত্তিকর আচরনের শিকার হলে শিক্ষক ও অভিভাবককে জানাতে হবে, ৮) লজ্জা নারীর ভূষন- মনোভাব বজায় রেখে চলতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করনীয়-
১) শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমন্বয়ে সাপ্তাহিক, বা পাক্ষিক বা মাসিক মিটিং করে ছাত্র ছাত্রীদের ইভ-টিজিং এর কুফল বা পরিনাম সম্পর্কে সজাগ করে দিতে হবে, ২) শ্রেণী শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষার্থীদের যেকোন অভাব অভিযোগ শোনা ও শুনানীর ব্যবস্থা করতে হবে, ৩) প্রত্যেক শ্রেণী বা বিভাগ থেকে ৩/৪ জন করে ছাত্রীর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে- যারা আক্রান্ত ছাত্রীদের পাশে দাড়াবে এবং তাৎক্ষনিকভাবে শ্রেণী শিক্ষকের কাছে রিপোর্ট করবে, ৪) ৪/৫ জন শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি প্রাথমিক কমিটি গঠন করতে হবে যাদের কাছে শ্রেণী শিক্ষকগন প্রাথমিক ভাবে রিপোর্ট করবেন, ৬) প্রতিষ্ঠান প্রধান যিনি- তিনি সবসময় কমিটির কার্যক্রম মনিটরিং করবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন, ৭) ক্যাম্পসে ক্লাস চলাকালে কেউ ক্লাস ফাকি দিচ্ছে কিনা- সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন, ৮) ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের আনাগোনা আছে কিনা সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন, ৯) প্রতিষ্ঠান প্রধান রাজনৈতিক দল সমূহের স্থানীয় শাখার সকল সদস্যদের সাহায্য সহযোগিতা চাইবেন এবং পর্যায়ক্রমে সাপ্তাহিক/পাক্ষিক/মাসিক মিটিংএ তাদেরকে আমন্ত্রন জানাবেন।
সামজিকভাবে করনীয়-
১) সামজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বখাটের পরিবারকে 'একঘরে' করে রাখতে হবে, ২) শান্তির স্বার্থে সংকীর্ন দৃষ্টি ভংগি উদার করতে হবে। অপরের দুঃখে সমবেদনা জানাতে হবে, ৩) ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে, ৪) উঠতি বয়সী সন্তানদেরকে চোখে-চোখে রাখতে হবে, ৫) মেয়েদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর হতে হবে, ৬) রাস্তার মোড়ে, গাছ তলায়, ব্রিজের উপর, চায়ের দোকানের সামনে বকাটে ছেলেদের আড্ডা বন্ধ করে হবে।
পাঠকদের কাছে অনুরোধ ভালকরে পড়ুন, আর যদি লেখাতে কোন অংশ সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন করা লাগে তবে মন্তব্যের মাধ্যমে জানান, আমি সংশোধন করে নেবো।
ইভটিজিং ঠেকানো যাচ্ছে না কেন?
মামাতো বোনকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় স্থানীয় বখাটেদের প্রহারে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মারা গেছেন রাজধানী ঢাকার এক মাছ ব্যবসায়ী্ । আইন ও সালিশ কেন্দ্র নামের মানবাধিকার সংগঠন বলছে, গত ৯ মাসে বাংলাদেশে ইভটিজিংএর শিকার হয়ে অন্তত ১০ জন মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন আরো ৭ জন।
বাংলাদেশে ইভটিজিং রোধে আইন হয়েছে ২০১০ সালে। মেয়েদের উত্যক্ত করা, পেছনে লাগা বা যৌন হয়রানির অভিযোগের বিচার হতে পারে মোবাইল কোর্টেও এবং এর শাস্তি হচ্ছে এক বছর কারাদন্ড এবং জরিমানা।
কিন্তু এসব আইনে কতটা কাজ হচ্ছে?
নারী নির্যাতন বিরোধী এক আন্দোলনকারী আপেক্ষ করে বলেন, পহেলা বৈশাখে টিএসসিতে নির্বিকার ভাবে অনেক মা, বোন কে হইতে হয়েছিল যৌন হইরানির স্বীকার। আমরা এর বিচার চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি।
গতসপ্তাহ মোহাম্মদপুর একটা স্কুলে পর পর দুই দিন প্রাথমিক শ্রেণির ছাত্রী যৌন হইরানির স্বীকার হলো। এবারও আন্দোলন চলছে। হইতো বিচার হবে না।।
এক বোন বাসের জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে ছিল। সেখান থেকে জোরপূর্বক প্রাইভেট কারে তুলে ধর্ষণ করলো। এবারও আমরা বিচার চাইবো। কিন্তু জানি এইবারও বিচার হবে না।
কিন্তু কেন হবে না বলতে পারেন??
তাহলে আপনি কি আপনার মা, বোনকে আর কোন অনুষ্ঠানে বাড়ির বাইরে জেতে দিবেন না??
তাহলে কি আপনি আপনার পরিবারের ছোট্ট বাচ্চাটি কে স্কুলে পাঠাবেন না??
তাহলে কি আপনার বোনের আর কখনো গাড়ির জন্য রাস্তায় দাড়াতে হবে না??
একবার নিজের কাছে প্রশ্ন করুন তো।। আপনি আসলেই কি পাড়বেন এই গুলো বাদ দিয়ে জীবনযাপন করতে??
যদি পারেন, তাহলে আপনি ঘুমিয়ে থাকুন।। আর যদি না পারেন, তাহলে প্রতিবাদ করুন।। নিজ নিজ জাইগা থেকে প্রতিবাদ করুন।
অপরাধির সংখ্যা কিন্তু হাতে গোনা কয়েক জন। আর আমরা...
তারপরও কি আমার, আপনার মা, বোন লাঞ্ছিত হবে, হতেই থাকবে?
মনে রাখবেন, অপরাধ বা অপরাধিকে একবার ক্ষমা করা মানে, তাকে আরো দুইবার একই অপরাধ করতে উনুপ্রেরণা যোগানো।
এসএইচ





