সমুদ্র একটি নীল জলের প্রচন্ড ঢেউ! বিশাল এই জলরাশিকে ভাবলেই চোখে ভাসে নীল জলের উৎসের ছবি। যেখানে ক্রমাগত ঢেউ ছুটে আসছে। সমুদ্রের উপরিভাগ আর তলদেশ আমাদের কাছে বেশ পরিচিত। সাগর- মহাসাগরকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। আমাদের অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা হলো এসব সাগর আর মহাসাগর।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি কিংবা এনিমেল প্লানেটে সমুদ্রকে ঘিরে দুর্দান্ত সব অভিযান আর বিচিত্র সব প্রাণীদের নিয়ে অসংখ্য প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। তবে আমরা খালি চোখে যেটুকু দেখি, সমুদ্রের অবদান আর আবেদন তার চেয়েও অনেক বেশি।

সমুদ্রের এই অবদান, আবেদন, প্রয়োজনীয়তা আর উপকারীতাকে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বের সবার সামনে তুলে ধরতে প্রতি বছর ৮ জুন পালন করা হয় 'বিশ্ব সমুদ্র দিবস'।

কিন্তু দুঃখজনক হলো- পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাস্টবিন এখন সমুদ্র। তবে এটি বলা ঠিক হবে কিনা জানিনা। তবে বলে রাখি যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আবর্জনা ফেলার জায়গাটির অবস্থান আমাদের স্থল ভাগে নয়! এটির অবস্থান সমুদ্রের গভীরে, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে। এই অবস্থা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য ভয়াবহ রকমের দুঃসংবাদ।

মানবজাতির ক্রমাগত অতৎপরতা সমুদ্রকে ভয়ংকর ও দূষিত করে তুলছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা ও সমুদ্র-পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় সামুদ্রিক জীবন, উপকূলীয় ও দ্বীপান্তর কমিউনিটি ও দেশের অর্থনীতির ওপর তা হুমকির সৃষ্টি করেছে।

সাগর ও মহাসাগর নিয়ে জাতসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কার্যালয় একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে যার নাম‘গ্রিন ইকোনমি ইন এ ব্লু ওয়ার্ল্ড’- এই প্রতিবেদনে বিশ্বের সমুদ্রগুলির এক করুণ অবস্থা ফুটে উঠেছে।

মানবজাতির সমুদ্রে নিঃসরিত দূষণ অব্যাহতভাবে মানবজাতির নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য, অতিবিরল সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজননের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সামুদ্রিক জঞ্জালে সমুদ্রের ক্ষতি হওয়া মানবজাতির একটি বড় সমস্যা প্রতিফলিত হয়েছে। তা হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় এবং অপ-প্রশাসন।

সরকার বা ব্যক্তি যেই হোক না কেন সামুদ্রিক পরিবশ সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক সম্পদের প্রশাসনের ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

তথ্য অনুসারে, সমুদ্রকে বিষাক্ত করে তোলার এই কাজটি শুরু হয় ১৯৯৭ সাল থেকে। আর এই কয়েক বছরে সেখানে জমা হয়েছে ১০ কোটি টনেরও বেশি আবর্জনা। ভাবুন তো কি শোচনীয় অবস্থা প্রকৃতি আর পরিবেশের?

২০০৬ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থা জানিয়েছিল, এই ডাস্টবিনের কাছে সাগরের প্রতি বর্গমাইলে গড়ে ৪৬ হাজার প্লাস্টিকের বোতল ভাসতে থাকে। এ সব বোতলের ৭০ শতাংশই সাগরের পানির নিচে পড়ে থাকে। যা ২০ মিটার পুরু স্তর হয়ে আছে৷

টোকিও ইউনিভার্সিটির গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রের বিশাল আবর্জনার ৮০ শতাংশ আসে স্থল ভাগ থেকে। বাকিটা আসে জাহাজ থেকে। তিন হাজার যাত্রীবাহী একটি জাহাজ প্রতি সপ্তাহে ওই অঞ্চলে প্রায় আট টন করে আবর্জনা ফেলছে।

পানি দূষিত হলে খাদ্য ও বায়ু দূষিত হয়। বর্তমানে পৃথিবীর মোট পানির শতকরা ৬০ ভাগই কলুষিত। পানি দূষণের হার শতকরা ৬ দশমিক ৪ ভাগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পানি দূষণের মূল কারণ হলো নর্দমার ময়লা, কারখানার বর্জ্য পদার্থ, মানুষ ও পশু পাখির বর্জ্য পদার্থ, কীটনাশকের ব্যবহার ও জলযান।

আজ থেকে অনেকদিন পূর্বে, এ রকম কোন পরিস্থিতির কথা ভেবেই হয়তো তৎকালীন কিছু গুণী মানুষ প্রস্তাব করেছিলেন-মানুষের সচেতনতার লক্ষ্যে একটি বিশেষ দিবস এবং সমুদ্র সংশ্লিষ্ট অনেক খসড়া আইন বাস্তবায়নের চেষ্টার নিমিত্তে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের।

এরই প্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনিরোতে আয়োজিত বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে কানাডা কর্তৃক বিশ্ব সমুদ্র দিবসের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে গৃহীত ১১১নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে দ্যা ওসেন প্রজেক্ট এবং ওয়ার্ল্ড ওসেন নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে প্রতি বছরের ৮ জুন আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বৈশ্বিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ এই দিবসটি পালন করে।

এই দিবসটিকে আমাদের প্রাণময় পৃথিবীর সমুদ্র সমূহকে সম্মান জানানোর এক অপূর্ব সুযোগ বলা হচ্ছে।

এমকে