‘৭০০ কোটি স্বপ্ন। একটাই পৃথিবী। ভোগ কর যত্নের সাথে।’ হ্যাঁ ধরণীর যতস্বপ্ন তা উপভোগ্য করে তোলার লক্ষে ১০০ টিরও বেশি দেশে পালিত হয় কোন না পরিবেশ রক্ষার দিবস।
পরিবেশও প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সৃষ্টিকর্তা আমাদের বেঁচে থাকার উপযোগী করেই গড়ে তুলেছেন এই প্রকৃতি ও পরিবেশ। সময়ের পরিক্রমায়, সভ্যতার ক্রমবিকাশের পাশাপাশি জীবনের নানা প্রয়োজনে আমরা এই প্রকৃতি ও পরিবেশের আমূল পরিবর্তন বা ক্ষতি করে চলেছি।
আমাদেরদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকৃতি তথা বন, জলাভূমি, উপকূলীয় প্রতিবেশ ও এরজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে সভা, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হলেওতা অনেকটা সরকারি-বেসরকারি খাতের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ এবং আয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যেই সীমিত। সাধারণ মানুষের মাঝে এসব কার্যক্রমের তেমন প্রভাব বিস্তৃত হয় না। ফলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জনসচেতনতার ব্যাপক ঘাটতি থেকেই যায়।
আমরা মিতব্যয়ী ও স্বল্পাহারীদের যতই কিপ্টা বা কঞ্জুস বলে ঠাট্টা করি না কেন, পৃথিবীতে আমাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নির্ভর করছে ভোগের মাত্রার ওপর। আগামীদিনে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে আমাদের ভোগবিলাসিতার লাগাম যেমন টেনে ধরতে হবে, তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারেও মনোযোগী হতে হবে।
মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক পরিবেশের অগুনতি উপাদান একে অন্যের সঙ্গে এতই সুদৃঢ় বন্ধনেআবদ্ধ যে, ক্ষুদ্র একটি উপাদানের অতিমাত্রায় ভোগ বা ব্যবহার আমাদের পুরোপ্রতিবেশ ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে তুলতে পারে। তাই মানবজাতির সার্বিককল্যাণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখা অনেকটাই নির্ভরকরছে পৃথিবীর সীমিত ও ক্রমক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠুব্যবস্থাপনার ওপর।
এই পৃথিবীতে মানুষ টিকে থাকতে হলে, সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশের গ্যারাটি নিজেদেরকেই দিতে হবে। এ ব্যাপারে বিশ্ব সংস্থাগুলো স্ব স্ব দেশের পরিবেশ সংস্থাগুলো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।
এক রিপার্টে জানা গেছে, ‘সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর জন্য তৃতীয় বিশ্ব নয়, বরং উন্নত বিশ্বই দায়ী।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সচেতনতা বাড়ালেই চলবে না। যথাযথ আইন-প্রণয়ন ও প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সুইডেনের স্টকহোমে ৭ দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন এই বলে যে, “আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা যখন আরো ৩০০ কোটির মতো বেড়ে যাবে তখন পানি সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’ জীবন ধারণের জন্য পানির কি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে সকলেই অবগত।
শীর্ষক এক সেমিনারে গ্রিন হাউজ ইফেক্টের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্টিফেন হকিং। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব যে ক্রমশ উষ্ণ হয়ে পড়ছে, এ ব্যাপারে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, গ্রিন হাউজ ইফেক্ট হয়তো রোধ করা যাবে না, সেক্ষেত্রে মানবজাতির অস্তিত্ব এক হাজার বছরের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পৃথিবীর আবহাওয়া হয়ে যাবে শুক্র গ্রহের মতো। শুক্র গ্রহে সালফিউরিক এসিড বৃষ্টি ঝরে।’ গ্রিন হাউজ ইফেক্টের বিরুদ্ধ শক্তিশালী জনমত তৈরির আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এটা করা না গেলে আমরা আর এক হাজার বছরও টিকব না।’
নিষ্ঠুর পূর্বাভাস দিয়েছেন প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর জোহান হ্যারি। তার প্রকাশিত (২০.৬.২০০৮) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গোপসাগরের পানির স্তর বৃদ্ধি এবং হিমালয় পর্বতমালা গলতে থাকায় পর্বত পরিবেষ্টিত সমতল বাংলাদেশ এ নির্মম পরিণতির শিকার হতে যাচ্ছে। এ পরিণতির জন্য মানুষকে দায়ী করে প্রতিবেদনের ইতি টানা হয় এভাবে“আমরা যা করছি, তা যদি করতে থাকি, বাংলাদেশের মৃত্যু অত্যাসন্ন। যারা পরিবেশকে ধ্বংস করছে দেশটির সাথে তাদের সলিল সমাধি হবে অথবা অন্য কোন উপকূল ভেসে গিয়ে উদ্বাস্তু হবে তারা। নিহত কিংবা উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়াবে কোটি কোটি। বাংলাদেশের কবরের ওপর খোদাই করা থাকবে- বাংলাদেশ ১৯৭১-২০৭১ : রক্তে জন্ম জলে মৃত্যু।’
যুক্তরাষ্ট্রেরও একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানায়, ‘বাংলাদেশ কয়েক দশকের মধ্যে সাগরের বুকে বিলীন হয়ে যেতে পারে।’ পরিবেশ বিজ্ঞানীরা শুধু বাংলাদেশ নয়, এ তালিকায় মালদ্বীপ ও হল্যান্ডের নামও রেখেছেন। এই তিনটি দেশ সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে নিচে অবস্থিত। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা গ্রিন হাউজ ইফেক্টের প্রভাব বলে উল্লেখ করেন। গ্রিন হাউজ ইফেক্টের কারণে মরু অঞ্চলের তাপমাত্রা বেড়ে বরফ গলতে শুরু করেছে। এ কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সমুদ্র উপকূলীয় দেশগুলো প্লাবিত হবার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ বাংলাদেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্রে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
‘গাছের প্রাণ আছে’ এ সত্যটি প্রমাণ করেছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চদ্র বসু। অথচ ১৪শত বছর পূর্বে মহানবী (সা) গাছের প্রাণ আছে এ সত্যটি আমাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। হাদিসে রাসূল (সা) থেকে জানা যায়, একজন লোক যখন অকারণে একটি গাছের ডাল ভাঙে তখন নবী করিম (সা) সে লোকটির চুল মৃদুভাবে টান দিয়ে বলেন, “তুমি যেমন শরীরে আঘাত বা কেটে গেলে ব্যথা পাও, গাছের পাতা বা ডাল ছিঁড়লে গাছও তেমন ব্যথা পায়।”
পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য গাছ লাগাবার শিক্ষা আমরা মহানবী (সা) থেকে পাই। তিনি বলেছেন, “যদি তুমি মনে করো আগামীকাল কিয়ামত হবে, তবু আজ একটি গাছ লাগাও।” রাসূল (সা) বৃক্ষরোপণক উৎসাহিত করে বলেছেন, “বৃক্ষরোপণ সদকায়ে জারিয়া হিসাবে পরিগণিত হবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা) বলেছেন, “কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষ বা গাছ রোপণ করে, অতঃপর তা হতে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী ভক্ষণ করে, তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।”
প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবন সিনা বলেছেন, “পৃথিবীর এত ধুলা-বালি, ধোঁয়া ও গ্যাস যদি মানুষের ফুসফুসে না ঢুকতো তাহলে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারত।”
আমাদের চার পাশে যা কিছু আছে তা নিয়েই পরিবেশ। এই পরিবেশই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। সৌরজগতের বিশাল বিস্তারের মাঝে ছোট্ট সবুজ গ্রহ, আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী। প্রতিনিয়ত অপরিকল্পিত আর অনিরাপদ পদ্ধতির শিল্পায়ন ও নগরায়নের প্রভাবে, ক্রমান্বয়ে মানুষ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে প্রাণচ্ছোল এই গ্রহ।
তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেয়ার সময় এখনি।
এএইচ





