৮ম শ্রেণীর ছাত্রী জেসমিন, ফুটফুটে চেহারা। বয়স ১৩ কি ১৪ হবে। দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি কথাবার্তায়ও, খুবই শান্ত প্রকৃতির মেয়ে। হঠাৎ কৌতুহল হল কথা বলার। ডাক দিলাম এই মেয়ে বলে।

আমার ডাক শুনেই ভয়ে জড়ো সড়ো হয়ে তাকিয়ে রইলো। বুঝতে পেরে হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম বাড়ি কই? নাম জানি তাই নাম জিজ্ঞেস করিনি।

জেসমিন মুচকি হাসি দিয়ে বলল ময়মনসিংহ। কথা-বার্তা হলে জানতে পারলাম ৮ম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবা মারা যাওয়ার কারণে এখানে এসেছে সে। গ্রামের বাড়িতে তার মায়ের সাথে আরো ২টি ছোট ভাই আছে জেসমিনের। মাঝে মধ্যে দেখা হলে জেসমিনের খোজ খবর নেয়ার চেষ্টা করি।

আসা যাক আমার কথায়। আমার নাম আরিফুর রহমান। একটি গ্রুপ অব কোম্পানির গার্মেন্টেসের এডমিনের দায়িত্বে আছি আমি। তাই অধস্তন সবারই খোজ-খবর জানি কিংবা রাখতে হয় আমার।

জেসমিন আমাদের গার্মেন্টেসে কাজ করে, বেতন ৪২০০ টাকা। সকাল ৮টায় থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস।

আমাদের অফিসের কাজের বুয়া নাম আমেনা খাতুন, বয়স ৬৫। এক ছেলে ও এক মেয়ে, দুই জনেরই বিয়ে হয়েছে। বেতন পায় পাঁচ হাজার টাকা। সকাল ৮টার আগে আসতে হয় তার আর যাবার কোন সময় নেই। সবার যাবার আধ ঘন্টা পর তার যেতে হয়।

আমেনা আর জেসমিন একজন বৃদ্ধা আরেক জন কিশোরী। পৃথিবীর সকল আইনে তাদের দিয়ে কাজ করানো বেআইনি। অথচ তাদের মতো হাজারো জেসমিন আর আমেনা কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু তাদের প্রাপ্য বেতন তারা পাচ্ছে না।

গেজেট-২০১৪ অনুযায়ী জেসমিনের বেতন হওয়ার কথা ৫৩০০ এবং আমেনার বেতন হওয়ার কথা ৬৩০০। কিন্তু তারা সেটা পায় না।

ফিরে যাই কয়েকদিন আগে। হঠাৎ করেই খবর আসলো বিজিএমইএ থেকে টিম আসবে ওডিট করার জন্যে। কিন্তু শ্রমিকদের সাক্ষর নেই কাগজে। তাই সময় নষ্ট না করে নিজেই সব সাক্ষর আর টিপ সই দিয়ে কাগজ প্রস্তুত করলাম। ওডিট শেষে সবাই বাহবা দিল। সুন্দর নিয়মে ফ্যাক্টরি চলছে। কারণ কাগজে জেসমিনের বেতন ৫৩০০ এবং আমেনার বেতন ৬৩০০।
আপনারা হয়তো ইতোমধ্যে বুঝতে পারছেন ঘটনা কি ঘটে। হয়তো কেউ বকা দিচ্ছেন ফ্যাক্টরির মালিকদেরকে। কিন্তু তাদের কিছুই করার নেই।

কারণ বায়াররা যে জিনিস আমাদের কাছ থেকে নিয়ে ২৫-২৬ ডলার বিক্রি করে সে পণ্যে আমাদেরকে দেয় ২.৩০-২.৫০ ডলার। তাই নিয়ম মেনে যদি কাজ করা হয় প্রতি মাসে ৫-৬ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ফ্যাক্টরি চালাতে হবে। অথচ পার্শবর্তীদেশ ভারত বা পাকিস্তান একই পণ্যের মূল্য পায় ৪.৫০ ডলার। সুতরাং ব্যবসা করতে এসে কেউ লোকসান দিবে না অবশ্যই। সেজন্যই নিয়ম বহির্ভূত ভাবে শ্রমিকদের কাজ করাতে মালিকদের।

তাই এই দেশের শ্রম বাজারকে ধ্বংস করার জন্যই যত নিয়ম কিন্তু কাজের মূল্য দেয়ার জন্য কোন নিয়ম নেই , নেই কোন আইন। আর বিজিএমইএ আর বিকেএমইএ যেন নিরব দর্শক। প্রেস বিফ্রিং আর বাৎসরিক নির্বাচন ছাড়া আর কোন কাজ নেই যেন তাদের।

আমাদের শ্রমবাজার এক গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার। সেটা করছে আমাদের প্রতিবেশীরা। আর এই কাজে সহযোগিতা করছে মীর জাফর রূপী এদেশেরই কিছু আমলা এবং ব্যবসায়ী। তাই প্রতিবছরই কারখানায় ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয় আগুন, আর বেতন না দিয়ে করানো হয় শ্রমিক আন্দোলন এবং ভাংচুর।

ফলে নষ্ট হচ্ছে আমাদের ভাবমূর্তি আর ক্ষতি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ ডলার। পুঁড়ে ছাই হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ট গ্রুপের মতো জনপ্রিয় কারখানা। যার প্রতিটি ইটের জন্য আজো কাঁদে শ্রমিকরা।

তাই মহান মে দিবসে সরকার, মালিক, ক্রেতা ও শ্রমিক, জনগনের প্রতি একটাই আহ্বান আসুন মীর জাফরদের চিহ্নিত করি, শ্রম অধিকার রক্ষা করি, সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনি লক্ষ শ্রমিকের।

ইআর