গরিব মানুষের খাবার পান্তাভাত। রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনও উপায় ছিল না; তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলুভর্তা, পোড়া শুকনো মরিচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হতো।কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনী লোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে এবং এটা দুর্মূল্যও বটে যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ নিয়ে আলাপকালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, ইলিশ খাওয়ার সিজন হচ্ছে আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। বৈশাখ তো ইলিশ খাওয়ার সময় না। ৯০ এর দিকে এইটা শুরু হয়েছে।

আগে যখন পহেলা বৈশাখ উদযাপন হতো, তখন গ্রামের অবস্থাপন্ন এবং ধনী পরিবারে খাবারের আয়োজনের মধ্যে থাকত চিড়া, মুড়ি, সাধারণ খই, বিভিন্ন ধানের খই, দই, লুচি, খেজুরের গুড়, খিচুড়ি, বড় কই মাছ, বড় রুই মাছ ইত্যাদি। কিন্তু ইলিশ আর পান্তার কোনও ব্যাপার ছিল না।

শামসুজ্জামান খান বলেন, এখন তো শহুরে নাগরিকদের হাতে টাকা এসেছে, তাই এক লাখ-দেড় লাখ টাকা খরচ করে বৈশাখে ইলিশ খায়।

এছাড়াও বিভিন্ন লেখক-ইতিহাসবিদরা পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলে এসেছেন। বিরোধিতা করে এসেছেন এই বানোয়াট আয়োজনের।

ইতিহাসবিদ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এক লেখায় বলেছেন, সম্প্রতি পহেলা বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি। এই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে ছিল না।

বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেন লিখেছেন, পহেলা বৈশাখে ইলিশ-পান্তার কালচার একদমই নতুন প্রজন্মের।

রাজধানী ঢাকার পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠান। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

ছায়ানটের এই আয়োজনকে কেন্দ্র করেও পান্তা-ইলিশের বিক্রির ব্যবস্থা হয় অনুষ্ঠানের আশেপাশে। যদিও বরাবরই ছায়ানট বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে আসছে এসব পান্তা-ইলিশের সঙ্গে ছায়ানট এবং বৈশাখের কোনও সম্পর্ক নেই।

ছায়ানটের নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্দিক বেলাল বলেন, ছায়ানটের অনুষ্ঠানের আশেপাশে বিক্রি হওয়া পান্তা-ইলিশ বিক্রির সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। বরাবরই আমরা বিবৃতি দিয়ে এই কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে এসেছি।

গ্রাম বাংলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনের যে ঐতিহ্য তার সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। বৈশাখের সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। কিন্তু ইলিশ খাওয়ার সাথে বাংলা নববর্ষের কি আদৌ কোনো যোগাযোগ আছে? জানতে চাইলে মিস্টার খান বলেন বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের চিরায়ত সংস্কৃতির সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।

বৈশাখে যখন খরার মাস যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে।

কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত, এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি, একটু বেগুন ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে খেত।

এমই