লোকসমাজে প্রায় একথাটি শুনে থাকি যে, বাংলা নববর্ষ এলেই যেনো আমরা বাঙালিতে পরিণত হয়ে যায়। সারা বছর কোনো খোঁজ থাকে না আর এদিন ব্যস্ত হয়ে থাকি। কেনো আমাদের মাঝে এসব নিয়ে এতো বিতর্ক। আর বিতর্কে এখন আর বড় করে দেখা দিচ্ছে ইলিশ খাওয়াকে কেন্দ্র করে।

তাইতো শিরোনামে বলেছি, নববর্ষে পান্তা-ইলিশ বাণিজ্যিক না হুজুগে। শহুরে ভোজন বিলাসীরা ইতোমধ্যে ইলিশ দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। অন্য অংশটি ঠিক উল্টো অবস্থানে। তাদের মতে, পান্তা-ইলিশ আরোপিত সংস্কৃতি। এই বিলাসিতার সঙ্গে বাঙালীর নববর্ষ উদযাপনের কোন সম্পর্ক নেই।

নিজ নিজ মতের পক্ষে এখন চলছে ব্যাপক যুক্তিতর্ক। পুরনো বিতর্ক জোরালোভাবে সামনে আসায় নিরপেক্ষদের জন্য তা উপভোগ্যও হয়ে উঠেছে বৈকি! খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলা নববর্ষ বরণের দিনে ইলিশ খাওয়ার রীতি খুব পুরনো নয়।

আবার একেবারে নতুন এমনটিও বলা যাবে না। বেশকিছু বছর ধরে এ রীতি চালু আছে। যতদূর তথ্য, রাজধানী শহর ঢাকায় এর সূচনা।

এরশাদ সরকারের শাসনামলে প্রথম লক্ষ্য করা যায়। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বিপুলভাবে সামাদৃত হয়ে ওঠার একপর্যায়ে পান্তা-ইলিশের প্রবেশ।

গোটা রাজধানীর মানুষ তখন বৈশাখের সকাল শুরু করতেন ছায়ানটের অভূতপূর্ব প্রভাতী আয়োজনে। অনুষ্ঠানটি ঘিরে লোকসমাগম বাড়তে থাকলে আশপাশে বারোয়ারি মেলা বসতে শুরু করে। রমনা পার্কে মেলার আয়োজন করা হয়।

লোকে লোকারণ্য মঙ্গল শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে একই রকম মেলা দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলায় হরেক রকমের পণ্য দিয়ে স্টল সাজানো থাকত। বাদ যেত না খাবারের দোকান। ওসব দোকানে খাবার খেতে গিয়েই প্রথম চোখে পড়ে পান্তা ভাত।

পান্তা ভাতে গ্রামের মানুষের দিন শুরু হতো, সে তো জানা কথা। কিন্তু এর সঙ্গে যে ইলিশ উঁকি দিচ্ছে! পানিতে ভিজিয়ে রাখা ভাতের সঙ্গে কড়কড়ে ইলিশ ভাজা! লোভনীয় খাবার যেহেতু, দ্রুতই তা কিনে খেতে শুরু করেন প্রচুর ঘুরে বেড়িয়ে ক্লান্ত মানুষ। কখনও বাঙালীর জীবন লোকাচারের প্রতি সম্মান জানিয়ে এ খাবার খাওয়া হতো। কখনওবা হুজুগে সাবাড় হতো থালার পর থালা। এরই মাঝে গণমাধ্যমে বিষয়টি আসতে থাকে। প্রচার পায়। এভাবে দেখতে দেখতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পান্তা-ইলিশ।

বৈশাখী উৎসব অনুষ্ঠানের প্রবীণ আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও মূল ধারার সংস্কৃতির সঙ্গে এর কোন যোগ ছিল না। তখনও এই চর্চার সমালোচনা হতো।

তবে কেউ উচ্চবাচ্য করতেন না। বাধা দিতে যেতেন না। বর্তমানেও কেউ ইলিশ খাওয়া বন্ধে কর্মসূচী দেননি বটে। সমালোচনা বাড়িয়ে দিয়েছেন। গত কয়েকদিনে যে পরিমাণ সমালোচনা তাকে পাহাড়সম বলেই মন্তব্য করছেন কেউ কেউ।

হঠাৎ কেন পান্তা-ইলিশ এমন ‘হুমকি’র মুখে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, এর কারণ গত কয়েক বছরের বাড়াবাড়ি।

পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে শহুরে লোকেরা ইলিশের জন্য মরিয়া হয়ে ছোটেন। দাম বেড়ে ইলিশ আকাশে উঠেছে। এখন একে বলা হয় সোনার হরিণ। এর পরও ইলিশ ছাড়া বৈশাখ উদযাপনের কথা অনেকে ভাবতে পারনে না। উচ্চবিত্তরা বিপুল টাকায় ইলিশ কিনে ফ্রিজ ভরে রাখছেন। মধ্যবিত্তরা এখন আর পেরে উঠছেন না। এই দৌড়ে ক্লান্ত তারা। এর পরও ইলিশ সংগ্রহে হুলুস্থূল চলে। চলছে।

ইলিশ নিয়ে এমন হৈচৈ এর প্রকৃত ইতিহাসটিকে সামনে নিয়ে আসে। সংস্কৃতি সচেতন মানুষ নানাভাবে বলার চেষ্টা করছেন, পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়া বাঙালী সংস্কৃতির অংশ নয়।

অফিসে, হাট-বাজারে এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। কোন কোন গণমাধ্যমও এই বক্তব্য নিশ্চিত করেছে। সবচেয়ে বেশি তৎপর অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। ফেসবুকে প্রতিদিনই লেখা হচ্ছে ইলিশ খাওয়ার বিরুদ্ধে। ঠিক একই সময়ে ইলিশের পক্ষে সরব হতে দেখা যাচ্ছে ভোজন বিলাসী বাঙালীকে। বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার বিরোধিতা করে নানা যুক্তি আসছে প্রতিদিন। এ আলোচনায় অংশ নিয়ে লোক গবেষক শামসুজ্জামান খান বলেছেন, নববর্ষ উদযাপনের সংস্কৃতির সঙ্গে ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই। বৈশাখ তো ছিল খরার মাস।

এ সময় তেমন কোন ফসল হতো না। কৃষকের অর্থকষ্ট বেড়ে যেত। ইলিশের যেহেতু দাম বেশি, তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। নববর্ষে গ্রামে উৎসব অনুষ্ঠান খুব ছোট পরিসরে হতো জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষাণিরা আগের রাতে একটি নতুন পাত্রে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতেন। চাল ভিজিয়ে রাখতেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষক সেই চাল-পানি পানি খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন। পান্তাও খেতেন বটে। তবে তা ইলিশ ভাজা দিয়ে নয়। কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনও কখনও শুঁটকি, বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তাও থাকত পান্তার সঙ্গে। কাজেই আজকের ইলিশ সংস্কৃতি গ্রামীণ সংস্কৃতি নয়।

বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার যুক্তি দিতে গিয়ে এমনকি আইনের কথা এসেছে!

কৃষ্টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক ড. হাবীবের মতে, নবেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত ইলিশ ছোট থাকে। এই জাটকা ধরা আইনত দ-নীয়। এর পরও বৈশাখ সামনে রেখে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জাটকা মাছ ধরা হয়। অসময়ে এভাবে ইলিশ মাছ খাওয়ার উৎসব চলতে থাকলে ইলিশের সার্বিক মজুদে প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা তার।

এদিকে, ভোজন বিলাসী বাঙালী এসব কথা শুনতে নারাজ। তাদের মতে, মাছেভাতেই তো বাঙালী। পহেলা বৈশাখে মাছ খাওয়া যৌক্তিক। আর ইলিশ যেহেতু জাতীয় মাছ, যেহেতু সুস্বাদু খুব, তাই খাওয়া। এ প্রসঙ্গে কেউ কেউ তো খুব কট্টর।

আামাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও ঘোষণা দিয়েছেন যে, পয়লা বৈশাখে আমার খাবার মেনুতে ইলিশ থাকবে না।

এদিকে কুলদা রায় নামে একজন  ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আসছে পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাব। পান্তাও খাব। এর মধ্যে যারা আমাদের সংস্কৃতি আছে কি নেই বলে চেঁচামেচি করছেন তাদের কথা শুনবই না। আগে ছিল না বলে এখন সংস্কৃতির অংশ হতে পারবে না এটা যারা বলেন তারা সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল জানেন। সংস্কৃতি কোন স্থবির বিষয় নয়। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল।

ইলিশ ধ্বংসের বিপরীতে যুক্তি দিয়ে তিনি লেখেন একটি ইলিশের পেটে কমবেশি ২০ লাখ ডিম থাকে। সারাবছরই ইলিশ ডিম দেয়। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসটাই হলো ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রধান মৌসুম। আর ফেব্রুয়ারি-মার্চ এই দুই মাস হলো ডিম ছাড়ার সাধারণ মৌসুম। ২ বৈশাখ থেকে ৩০ বৈশাখ পর্যন্ত ইলিশ খাওয়া বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তিনি।

নিউমার্কেট থেকে ইলিশ কিনে ফেরার সময় আরিফুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা বললেন, পহেলা বৈশাখ সকালে ইলিশ থাকে খাবারের টেবিলে। এটা তো অন্য দেশের মাছ নয়। এখন হঠাৎ করে কেন বাদ দিতে হবে? যার কেনার সামর্থ্য আছে তিনি কিনবেন। যিনি খেতে চান না, তাকে তো জোর করা হচ্ছে না।

আরও নানা যুক্তি। কান পাতলেই শোনা যায়। ইলিশ নিয়ে এমন তর্ক-বিতর্ককে মধুর মানছে বাঙালী। বৈশাখের আগে এও যেন আরেক উদযাপন। আরেক রকমের বছর শুরু।

ওএফ