চান্দিনা মাঠে জনসভায়-আমি ফজলুল হুইক্কা: আমাকে প্রধানমন্ত্রি চাইলে,মোজাফরকে ভোট দিও, নুরুল আমিন চোরাকে প্রধানমন্ত্রি চাইলে, মফিজ্জা চোরাকে ভোট দিও ! আছ্ছালামো আলাইকুম !

এ কে এম ফজলুক হক ১৮৭৩ সালে ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রমে মামার বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র পুত্র ছিলেন।

তিনি গ্রাম্য পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন। গৃহ শিক্ষকদের কাছে তিনি আরবি, ফার্সি এবং বাংলা ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৮১ সালে তিনি বরিশাল জিলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন।

১৮৮৬ সালে অষ্টম শ্রেণীতে তিনি বৃত্তি লাভ করেন এবং ১৮৮৯ সালে ফজলুল হক প্রবেশিকা পরীক্ষায় তৎকালীন ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেন। ফজলুল হক তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তির কারণে শিক্ষকদের খুবই স্নেহভাজন ছিলেন।

১৮৯১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

নিজের মেধার বলে ফজলুক হক প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এফ.এ. পাশ করার পর তিনি গণিত, রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যায় অনার্সসহ একই কলেজে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন।

১৮৯৩ সালে তিনি তিনটি বিষয়ে অনার্সসহ প্রথম শ্রেণীতে বি.এ. পাশ করেন। বি.এ. পাশ করার পর এম.এ. ক্লাসে প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন

খেলাধুলার প্রতি ফজলুল হক খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি প্রথম জীবনে নিজে বিভিন্ন খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন।

তিনি মোহামেডান ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে জড়িত ছিলেন। এছাড়া তিনি দাবা, সাঁতার সহ বিভিন্ন খেলা পছন্দ করতেন।

১৮৭১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি বি. এল. পাশ করে আইন ব্যবসা শুরু করেন।

এ. কে. ফজলুক হক এম.এ. পাশ করার পর দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করেন। এ সময় নবাব আবদুল লতিফ সি. আই. ই.-এর পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগমের সাথে তার বিয়ে করেন । খুরশিদ তালাত বেগম দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন।

খুরশিদ তালাত বেগমের অকাল মৃত্যুর পর তিনি হুগলী জেলার অধিবাসী এবং কলকাতা অবস্থানকারী ইবনে আহমদের কন্যা জিনাতুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করেন।

কিন্তু, জিনাতুন্নেসাও নিঃসন্তান অবস্থায় পরলোক গমন করেন এবং ১৯৪৩ সালে এ. কে. ফজলুল হক মীরাটের এক ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তান এ. কে. ফাইজুল হক ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ২০০৭ সালে মারা যান।

১৮৯৭ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল. পাশ করে স্যার আশুতোষ মুখার্জির শিক্ষানবিশ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন এ. কে. ফজলুল হক।

দুবছর শিখানবিশ হিসেবে কাজ করার পর ১৯০০ সালে তিনি সরাসরি আইন ব্যবসা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে তিনি বরিশালের ফিরে আসেন এবং বরিশাল আদালতে যোগদান করেন।

১৯০৩ – ১৯০৪ সালে বরিশাল বার এসোয়েশনের সহকারী সম্পাদক পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এ সময়ই তিনি বরিশাল রাজচন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ ডক্টর হরেন্দ্রনাথ মুখার্জির অনুরোধে ঐ কলেজে অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

১৯০৬ সালে আইন ব্যবসা ছেড়ে ফজলুল হক সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। পূর্ব-বাংলার গভণর ব্যামফিল্ড ফুলার তাকে ডেকে সম্মানের সাথে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেন। সরকারি চাকুরিতে তিনি কিছুদিন ঢাকা ও ময়মনসিংহে কাজ করেন।

এরপর তাকে জামালপুর মহকুমার এস.ডি.ও হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে জামালপুরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়। ফজলুল হকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেখানে দাঙ্গা বন্ধ হয়।

জামালপুর মহকুমাতে চাকরি করার সময় তিনি জমিদার ও মহাজনের যে নির্মম অত্যাচার নিজের চোখে দেখেন, পরবর্তী জীবনে এর প্রতিকার করতে গিয়ে সে অভিজ্ঞতা হয়, তাই তার জন্য খুবই সহায়ক হয়েছিল।

১৯০৮ সালে এস.ডি.ও –এর পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি সমবায়র সহকারী রেজিস্ট্রার পদ গ্রহণ করেন। এসময় তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষক শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা নিজের চোখে পর্যবেক্ষণ করেন।

সরকারের সাথে বনাবনি না হওয়ায় অল্পদিনের মধ্যেই তিনি চাকুরি ছেড়ে দিলেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯১১ সালে এ. কে. ফজলুল হক কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দেন।

বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান অশ্বিনীকুমার দত্ত এ. কে. ফজলুক হককে কমিশনার পদে প্রার্থী হবার আহবান জানান।

এ. কে. ফজলুক হক পৌরসভা ও জেলা বোর্ডে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে সদস্য নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমেই এ. কে. ফজলুক হকের রাজনৈতিক জীবনে সূত্রপাত।

১৯১৪ সালে ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেস দলে যোগ দেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস দলের নেতা হয়ে উঠেন।

১৯১৮ তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। এ. কে. ফজলুক হক খেলাফত আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্দের পর খেলাফত আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এ. কে. ফজলুল হক নিখিল ভারত খেলাফত কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে এ. কে. ফজলুক হক খুলনা উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হন।

১৯২৪ সালে খুলনা অঞ্চল থকে তিনি পুনরায় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এ সময় বাংলার গভণর ছিলেন লিটন ফজলুল হককে বাংলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়োগ করেন।

১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহেরু-এর নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল সরকারি নীতির বিরোধীতা সহ সরকারি বাজেট বা আয় ব্যয় প্রন্তাব প্রত্যাখ্যান করা।

স্বরাজ্য পার্টি ১৯২৪ সালের বাজেটের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। এ সময় ১৯২৪ সালের ১ আগস্ট এ. কে. ফজলুক হক মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তাফা দেন।

১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রীর পদে পদত্যাগ করার পর থেকে আবুল কাশেম ফজলুল হক সম্পূণ জড়িয়ে পরেছিলেন কৃষকদের রাজনীতি নিয়ে।

১৯২৯ সালের ৪ জুলাই বঙ্গীয় আইন পরিষদের ২৫ জন মুসলিম সদস্য কলকাতায় একটি সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন।

এই সম্মেলনে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি নামে একটি দল গঠনের সিধান্ত করা হয়। বাংলার কৃষকদের উন্নতি সাধনই ছিল এই সমিতির অন্যতম লক্ষ্য।

১৯২৯ সালেই নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত কলকাতায়। ঢাকায় প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে। এই সম্মেলনে এ. কে. ফজলুক হক সর্বসম্মতিক্রমে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ময়মনসিংহে বঙ্গীয় প্রজা সমিতির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৫ সালে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিতসঙ্গীত এবং মরমী শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের গানের মধ্যে দিয়ে এ সম্মেলন শুরু হয়েছিল। এই প্রজা সমিতির মধ্য দিয়েই পরবর্তিতে কৃষক-প্রজা পাটির সূত্রপাত ঘটে।

১৯৩৫ সালে এ. কে. ফজলুক হক কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনিই কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র।

১৯৩৭ সালের মার্চে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পাটিরপক্ষ থেকে পটুয়াখালী নির্বাচনী এলাকা থেকে এ. কে. ফজলুক হক ও মুসলিম লীগের মনোনীত পটুয়াখালীর জমিদার ও ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

মুসলিম লীগ প্রার্থী খাজা নাজিমুদ্দিনের নির্বাচনী প্রতীক ছিল “হারিকেন” আর হক সাহেবের কৃষক প্রজা পাটির প্রতীক ছিল “লাঙ্গল”। কৃষক প্রজা পাটির শ্লোগান ছিল, “লাঙল যার জমি তার, ঘাম যার দাম তার”।

পটুয়াখালীতে এ. কে. ফজলুক হক ১৩,০০০ ভোটে পেয়ে ছিলেন। অপরদিকে, খাজা নাজিমুদ্দিন ৫,০০০ হাজার ভোট পেয়ে ৭,০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এই নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি ৩৯টি আসন ও মুসলীম লীগ ৩৮ টি আসন লাভ করে।

নির্বাচনে মুসলিম লীগের সথে সমঝোতায় গিয়ে এ. কে. ফজলুক হক ১১ সদস্য বিশিষ্ট যুক্ত মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। মন্ত্রীদের মধ্যে তিনজন কৃষক প্রজা পাটির, তিন জন মুসলিম লীগের, তিন জন বর্ণ হিন্দুর এবং দুই জন তফসিলী সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন।

১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল এ. কে. ফজলুক হকে নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রী পরিষদ গর্ভনর এন্ডারসনের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। আইন পরিষদের স্পিকার ছিলেন স্যার আজিজুল হক ও ডেপুটি স্পিকার হলেন জালালউদ্দিন হাশমী। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ. কে. ফজলুক হক বহু কর্মসূচি হাতে নিয়ে ছিলেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেই জোড় দিয়ে ছিলেন বেশি। তার আমলে দরিদ্র কৃষকের উপরে কর ধার্য না করে সারা বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়।

“বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ”-এর পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন। এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য বৃটিশ সরকার ১৯৩৮ সালে “ক্লাউভ কমিশন” গঠন করে।

১৯৩৮ সালের ১৮ আগস্ট বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনী পাস হয় এবং জমিদারদের লাগামহীন অত্যাচার চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়।

১৯৩৯ সালের “বঙ্গীয় চাকুরি নিয়োগবিধি” প্রবর্তন করে মন্ত্রী পরিষদ মুসলমানদের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ চাকুরি নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করে। এ বছরেই “চাষী খাতক আইন”-এর সংশোধনী এনে ঋণ সালিশী বোর্ডকে শক্তিশালী করা হয়। ক্লাউভ কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ১৯৪০ সালে হক সাহেব আইন পরিষদে “মহাজনী আইন” পাস করান।

এ বছরই “দোকান কর্মচারি আইন” প্রণয়ন করে তিনি দোকান শ্রমিকদের সপ্তাহে একদিন বন্ধ ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের নির্দেশ জারী করেন।

কৃষি আধুনিকায়নের জন্য ঢাকা, রাজশাহী এবং খুলনার দৌলতপুরে কৃষি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাট চাষীদের নায্য মূল্য পাওয়ার লক্ষ্যে ১৯৩৮ সালে “পাট অধ্যাদেশ” জারী করা হয়।

১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর আবুল কাশেম ফজলুল হক দ্বিতীয় বারের মত মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। শরৎচন্দ্র বসু ও হিন্দু মহাসভার সহ-সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখাজির সঙ্গে প্রগতিশীল যুক্ত পার্টি গঠন করে তিনি সেই দলের নেতা হয়েছিলেন। ১৭ডিসেম্বর এই মন্ত্রী পরিষদ বাংলার গভণর জেনারেল হার্বাটের কাছে শপথ গ্রহণ করেন।

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলীম লীগের অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন এ. কে. ফজলুক হক। এই লাহোর প্রস্তাবই “পাকিস্তান প্রস্তাব” হিসেবে পরবর্তীকালে আখ্যাযয়িত হয়।

১৯৪৬ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে বরিশাল অঞ্চল ও খুলনার বাগেরহাট অঞ্চল থেকে প্রার্থী হয়ে তিনি নির্বাচিত হন। কিন্তু, দলীয় ভাবে পরাজিত হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভা গঠন করেন ও বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেন। কিন্তু দলের সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন নীরব।

পাকিস্তান গঠিত হবার পর থেকে হক সাহেব ঢাকা হাইকোর্টে পুনরায় আইন ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তিনি ঢাকা হাইকোর্ট বারের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের এটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এ. কে. ফজলুক হক সমর্থন দেন।

১৯৫৩ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় তার বাস ভবনে কৃষক-প্রজা পার্টির কর্মীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে দলের নাম থেকে প্রজা শব্দটি বাদ দিয়ে ‘কৃষক শ্রমিক পার্টি’ গঠন করা হয়। আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে সাধারণ সম্পাদক করে এই পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এ. কে. ফজলুক হক।

১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর এ. কে. ফজলুক হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে গঠিত হল যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করার জন্য এ সময় সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’কে দৈনিক পত্রিকায় রুপান্তর করা হয় , তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের সময় কুমিল্লার চান্দিনায় বাজার মাঠের নির্বাচনী জনসভায় বর্তমান ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ,কে সমার্থনে লক্ষ লক্ষ মানুষ জমায়েত হয়েছিল, সে মাঠে এ কে এম ফজলুল হক মঞ্চে দাড়িয়ে বলেছিল যে, আমাকে তোমরা চেন—? , উপস্থিত লোকজন জবাব দিয়েছিল –আপনি শেরে-বাংলা ফজলুল হক ,সেইদিন ফজলুল হক নিজেকে ফজলুল হুইক্কা বলে —আমাকে যদি প্রধান মন্ত্রি চান ?

মোজাফ্ফরকে ভোট দিবেন আর নুরুল আমিনকে যদি প্রধানমন্ত্রি চান ? মফিজ্জা চোরাকে ভোট দিও বলে আস্সলামো আলাইকুম মঞ্চে থেকে সোজা চলে যান, প্রার্থী মোজাফ্ফর হতাশ, শুধু এই কথায় মানুষ আমাকে ভোট দিবো না, ফজলুল হক মোজাফ্ফর শান্তনা দিয়ে বলল, মোজাফ্ফর তুমি পাশ করবে, এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ৯ টি আসন লাভ করে, ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল এ. কে. ফজলুল হক চার সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রী সভা গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হয় ১৫ মে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি ছিল। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী পরিষদ এই ২১ দফা বাস্তবায়নের জন্য তৎপর হন।

১৯৫৪ সালের ৩১ মে পাকিস্তানের গভণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করে দিয়ে ৯২ (ক) ধারা জারীর মাধ্যমে প্রদেশে গভর্ণরের শাসন প্রবর্তন করেন।

১৯৫৫ এর ৫ জুন সংখ্যাসাম্যের ভিত্তিতে পুনরায গনপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয এবং কোয়ালিশন সরকার গঠিত করা হয়। মুসলিম লীগের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। এ. কে. ফজলুক হক ছিলেন এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হোসেন শহীদ সোহরায়ার্দী ছিলেন বিরোধী দলের নেতা।

১৯৫৬ এর ২৯ ফেব্রয়ারী পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র গৃহীত ও ২৩ মার্চ তা কার্যকরী হয়। এ সময় এ. কে. ফজলুক হক পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করে ৮৩ বছর বযষে সে করাচি থেকে ঢাকা এসে ১৯৫৬ সালের ২৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভণর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৫৮ সালের ১ এপ্রিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার তাকে গভর্ণরের পদ থেকে অপসারণ করে। এরপরই তিনি তার ৪৬ বছরের বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক জীবন থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৫৮ এর ২৭ অক্টোবর আবুল কাশেম ফজলুল হককে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সোর্বচ্চ পদক “হেলাল-ই-পাকিস্তান” খেতাব দেওয়া হয়।

১৯৬১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের ছাত্র-শিক্ষকবৃন্দ তাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে এবং তাকে হলের আজীবন সদস্য পদ প্রদান করা হয়। এই সংবর্ধনা সভার পর তিনি আর কোন জনসভায় যোগদান করেননি ।

১৯৬২ এর ২৭ মার্চ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তিনি প্রায় একমাস চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে অবস্থিত তিন নেতার মাজারে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের কবর, ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১০ টা ২০ মিনিটে এ. কে. ফজলুক হক ৮৬ বছর ৬ মাস বয়সে মৃত্যু বরণ করেন।

২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে দশটা পর্যস্ত তার মরদেহ ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় তার ২৭কে. এম. দাস লেনের বাসায় রাখা হয়।

সেদিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার পল্টন ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়। একই স্থানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর রয়েছে।

তাদের তিনজনের সমাধিস্থলই ঐতিহাসিক তিন নেতার মাজার নামে পরিচিত। রেডিও পাকিস্তান সেদিন সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে সারাদিন কোরআন পাঠ করে।

জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়। ৩০ এপ্রিল সোমবার পাকিস্তানের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজে ছুটি ঘোষণা করা হয় ।

মমিনুর রহমান বুলবুল, শিক্ষক ও রাজনৈতিক