‘মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিলাম, জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতেও।’ট্যাঙ্কের সামনে শুয়ে পড়ার মুহূর্তটির কথা স্মরণ করতে গিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললেন মেটিন দোগান (৪০)।
এখন মিটিমিটি হাসছেন। দেশের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত বিমানবন্দর দখলে নেওয়ার জন্য তুর্কি সৈন্যরা যখন ট্যাঙ্ক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন কিন্তু মোটেও হাসেননি।
ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সেই রাতে ক্ষমতাধর তুর্কি সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কের গতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যে নিরস্ত্র মানুষটির সামনে, সেই মেটিন দোগান শুয়ে শুয়ে তাদের বলছিলেন, ‘আমার ওপর দিয়ে যাও।’
কয়েকবার এই বাক্য উচ্চারণের পর ট্যাঙ্ক বাহীনির উদ্দেশ্যে খেকিয়ে উঠলেন, ‘তাহলে দূর হয়ে যাও।’
তখন তার মনের অবস্থা কি হয়েছিল, সেই অভিব্যক্তির কথা বললেন তিনি এভাবে, ‘শুয়ে পড়ামাত্র আমার পুরো শরীর মনে হলো একটা বিন্দুতে এসে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে থেতলে যাচ্ছে আমার মস্তিস্ক, আমার হৃদপিণ্ড আমার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছু।
‘আমি দেখতে চেয়েছিলাম সেই এক সেকেন্ড আসলে কেমন লাগে, কেমন কাটে। সেই এক সেকেন্ডটিকে আমি হারাতে চাইনি। যদি হারিয়ে যেতে দিতাম ওই এক সেকেন্ডকে, তাহলে মনে হতো আমি বড় কিছু হারিয়েছি। তাই আমি মাটিতে শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছিলাম।’
মেটিন নিজেও এক সময় তুর্কি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। তখন তার বয়স ছিল ৩০। মেটিন বলছেন, তার মধ্যে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, ঠিক কাজটিই করছেন তিনি। তার এই শুয়ে পড়ার বিষয়টি সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে, বিশেষ করে টুইটারে।
টেলিভিশনে শুক্রবার রাতে রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামতে দেখে কোনো সময় নষ্ট না করে সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য মেটিন রাস্তায় নেমে আসেন। সে সময় দেশের জন্য মৃত্যুকে বরণ করে নিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন বলে জানান।
‘রাস্তায় নামার আগে আমার ছোট ভাইয়ের দিকে চোখ পড়ে। তাকে বলি, তোমার ছেলে-মেয়ে আছে, পরিবার আছে। এরপর তাদের কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমি দৌঁড় দেই,’ বলেন তিনি।
‘এর আগে কখনোই আমি ভোট দেইনি। কোন রাজনৈতিক দল থেকে প্রেসিডেন্ট হল, সে ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যাথাও নেই। কিন্তু এরদোয়ান আমার প্রেসিডেন্ট, দেশের নেতা। কেউ বন্দুক দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করুক আমি তা চাইনি,’ বললেন মেটিন।
তিনি ছয় কিলোমিটার দৌঁড়ে বিমানবন্দর যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু এমন সময় এক মোটরসাইকেল আরোহীকে আসতে দেখে তাকে থামিয়ে তিনি লিফট দিতে বলেন। মোটরসাইকেল আরোহীও তাকে লিফট দিতে রাজি হন।
‘তার বয়স হবে ২২ কিংবা ২৩। তাকে বলি আল্লাহর কসম লাগে আমাকে তাড়াতাড়ি.. যাও,’ বললেন মেটিন। এরপর তরুণ ছেলেটির সঙ্গে তার বিমানবন্দর যাওয়ার ঘটনাকে তুলনা করেন রীতিমতো চলচ্চিত্রের সঙ্গে।
ডাক্তারি পড়র সময় মেটিন পরিকল্পনা করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী হওয়ার। এখন মাথা থেকে এসব চিন্তা উবে গেছে তার। ছেলেটি যদি ভয় পাওয়ার পরও তার মাথা ঠিক রাখতে পারে, সে জন্য একের পর এক প্রশ্ন করছিলেন তকে। এভাবে তারা ঘটনাস্থলে দেখলেন প্রচার মাধ্যমের কর্মীরা আগেই পৌঁছে গেছে। অভ্যুত্থানের ঘটনা তারা যেভাবে প্রচার করে যাচ্ছেন, তা দেখে মেটিন উৎসাহিত বোধ করতে লাগলেন। রাস্তায় নেমে আসেন তিনি প্রচার মাধ্যমের প্রচারণায় উৎসাহিত হয়ে।
তিনি দেখলেন সবার আগে রয়েছে সাঁজোয়া বাহিনী, তাদের পেছনে রয়েছে তিনটি ট্যাঙ্ক সারিবদ্ধ হয়ে এগোচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে ট্রাক বোঝাই সৈন্য। বয়সে একেবারে তরুণ।
‘কথা নেই, বার্তা নেই ফাঁকা গুলি চালানো শুরু করল সৈন্যরা। বুঝতে অসুবিধা হল না যে, ক্যামেরাতে যেন ছবি দেখায় একারণেই তারা এভাবে গুলি চালাচ্ছে,’ বললেন তিনি।
‘ঠিক সেই সময় আমি দৌঁড়ে যাই এবং চিৎকার করতে থাকি আমি তুর্কি সৈন্য, আমি জাতির সৈন্য, কিন্তু তোমরা কার পক্ষের সৈন্য?’ বললেন মেটিন।
সে সময় তারাও পাল্টা চিৎকার করে বলে, ‘সরে যাও, সরে যাও, নইলে আমরা গুলি চালাব।’
‘এ সময় ট্যাঙ্ক এগিয়ে যেতে থাকলে কোনো উপায় না দেখে আমি ট্যাঙ্কের সামনে শুয়ে পড়ি। সে সময় আমি ভেবেছিলাম আমি মারা গেলেও যদি তাদের অগ্রযাত্রা থেমে যায়,’ বললেন তিনি।
এ কথা ভেবে শুয়ে পড়লেন তিনি। অপেক্ষা করতে লাগলেন তার শরীর থেতলে যাওয়ার। ট্যাঙ্কের সামনে তার শুয়ে পড়ার এই দৃশ্য কিছুক্ষণের মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং রীতিমতো পরিণত হলেন আইকোনিক ফিগারে।
মেটিন বলেন, সে সময় তিনি ভাবতে ছিলেন এই বুঝি থেতলে গেল তার মস্তিস্ক, হৃদপিণ্ড, শরীরের যতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে, সবকিছু।
কিন্তু এক সময় তিনি অনুভব করলেন ট্যাঙ্ক থেমে গেছে। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ট্যাঙ্কের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে এক সৈনিক।
তিনি আমাকে বললেন, কথা দিচ্ছি, আমরা চলে যাব। আপনি শুধু ট্যাঙ্কের সামনে থেকে একটু সড়ে দাঁড়ান।
এরপর মেটিন তার ওপর দিয়ে ট্যাঙ্ক চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ দিলেন। কিন্তু তারা সেই সুযোগ নিল না। বরং দূরে সরে গেল।
এরপর বিনীতিভাবে বললেন মেটিন, ‘এই তো হলো ঘটনা।’
এফএফ





