আমার ছোট বোনের ছোট্ট একটা বাচ্চা আছে নাম শান্ত। খুবই সুন্দর। আমি খুবই আদর করি। বোনের স্বামীটাও খুব ভালো। ভালো একটা চাকরি করে।

সুখে শান্তিতে আছে তারা। কিন্তু আমি তো বেশি কিছু চাইনি। আমার কোনো চাহিদাও নেই। তাহলে কেনো আমার জীবনটা এমন হল।

ভাইয়াকে অনেক বেশি মনে পড়ে। অনেক বছর আগে ভাইয়াকে শেষ বারের মত দেখেছিলাম। এখন ঠিকমত চেহারাটা মনে পড়ে না। কিন্তু এরপরও ভাইয়াকে অনেক বেশি মনে পড়ে। অপেক্ষায় আছি কখন ভাইয়ার কাছে যাব।

শরীর নিস্তেজ হওয়ার সাথে সাথে যেন জীবনের সকল ইচ্ছাগুলোও নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। জীবনের সূর্যটা যেন অস্ত যাওয়ার পথে। এখন শুধুই অপেক্ষা, যন্ত্রনা আর বাবা-মা কে কষ্ট দেয়া।

পরিবারটা নিস্ব হয়ে যাচ্ছে এটা আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আর বেচেঁ থাকার ইচ্ছে নেই। মরে গেলেই যেন বাঁচি।

এমনভাবে টাইমনিউজবিডি’কে নিজের জীবনের কষ্টের কথাগুলো জানালেন মরণব্যাধি থেলাসেমিয়ায় আক্রান্ত জান্নাতুল ফেরদৌস সোমা। বয়স ২২ হলেও মনে হবে ১৪ কি ১৫।

আর এ বয়সে কত ব্যাগ রক্ত শরীরে নিয়েছেন তার কোনো ইয়াত্তা নেই, কারণ বয়স যখন ছয় মাস তখন থেকেই রক্ত নিতে হয় শরীরে। এখন প্রতিমাসে ২ থেকে ৩ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।

এই রোগের প্রধান সমস্যা রক্তশুন্যতা। মাসে দু’বার রক্ত না দেওয়া হলে রোগীর শরীর হলুদ বর্ণ ধারণ করে দুর্বল হয়ে বিছানার সঙ্গে লেগে যায়। রোগী পা উঠাতে পারে না, খেতে পারে না। পেট ফুলে শক্ত হয়ে যায়।

২০০১ সালে মারা যায় সোমার বড় ভাই সুমন। কোন স্বাভাবিক ঘটনায় মারা যায়নি সুমন। জন্মের পরই ধরা পড়ে ঘাতক ব্যাধী থ্যালাসেমিয়া। বিদেশে নিয়ে ছেলের চিকিৎসা দেয়ার সাধ্য ছিল না বাবা হারুনের।

ছোট্ট ফার্মেসি দিয়ে কত টাকাই বা আয় তার? সাধ্য অনুযায়ী ধন-সম্পদ, জমি-জমা যা ছিল তার সব কিছু বিক্রি করে দীর্ঘ ৯টি বছর ধরে ছেলের চিকিৎসা চালিয়েছেন দেশের মাটিতে থেকেই।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারলেন না একমাত্র ছেলেকে। চিরদিনের জন্য তাদেরকে নি:স্ব করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যায় ছেলে সুমন।

সোমার বাবা হারুন জানান, আমার এক ছেলে আর দুই মেয়ে। ছোট মেয়ে বাদে বড় দুই জনের এই রোগ। ঘাতকব্যাধি সুমনকে কেড়ে নিলেও এখনও কেড়ে নিতে পারেনি সোমাকে।

ডাক্তার বলছেন, বোনম্যারো অপারেশন করলে ভালো হয়ে উঠবে সোমা। কিন্তু তাতে খরচ হবে প্রায় ১৬ লাখ টাকা।

সোমা নিজে জানে তার বাবার পক্ষে এতো টাকা দিয়ে তার চিকিৎসা করানো তার বাবার পক্ষে সম্ভব না। বাবা-মাকে এত কষ্ট দিয়ে আর বেঁচে থাকতে তারও ভালো লাগছে না।

তাই ঘরে একা সোমা নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে আর গণনা করে মৃত্যুর প্রহর। সোমা জানায়, আমার যদি টাকা থাকতো আমি যতকষ্টই হোক পড়লেখা চালিয়ে যেতাম।

সোমা বলে, ফেসবুকের নাম শুনেছি কিন্তু কখেনা চালাইনি। মাঝে মাঝে মধ্যে মনে হয় ফেসবুক চালাতে পারলে একটু সময়টা কাটতো, সারা দিন ঘরে একা একা আর ভালো লাগে না। বন্ধুদের সবাই ফেসবুক চালায়।

আমার ফেসবুক থাকলে তাদের সাথে কথা বলে সময় কাটানো যেত। কিন্তু বাবাকে বলার সাহস পাইনা, কারণ জানি বাবার ভালো মোবাইল কিনে দেয়ার সাধ্য নেই। আমার চিকিৎসার জন্য যে টাকা খরচ হয় এরপর সংসারই ঠিকমতো চলে না, মোবাইল তো পড়ে।

হারুন ঢাকা এবং গ্রামের বাড়িতে জায়গা-জমি যা ছিল সব কিছু বিক্রি করে দুই সন্তানের চিকিৎসা চালিয়েছে। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি ছেলে সুমনকে। এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২২ লক্ষ টাকা।

এখন পরিবারটি পুরোপুরি নিস্ব। সোমার চিন্তা মারা যাবার পর বাবা-মা’র কি হবে। যদি আবার বাবা-মা’কেও পেয়ে বসে এই রোগে।

কিন্তু সত্যি অবাক লাগে! একটা পরিবারে আর কত বিপদ নেমে আসতে পারে। এরই মধ্যে কিছুদিন আগে মা নাজমাকেও আবার পেয়ে বসে থ্যালাসেমিয়ায়। বাবা হারুন এখন তার সর্বশক্তি দিয়ে স্ত্রী ও মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় এতো টাকা কোনোভাবেই যোগাড় করতে পারছেন না তারা। সোমার বাবা এখন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ দিয়ে আসেন। এতে যা আয় হয় সেটা দিয়ে সংসার চলে। এতক্ষণ পাশে বসে চুপ করে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন সোমার বাবা।

হঠাৎ ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মৃত ছেলের ছবি দেখিয়ে বলতে লাগলেন, এক সন্তানকে হারিয়েছি। আরেকটিরও এ অবস্থা। কেউ কি নেই আমার মেয়েটাকে বাঁচানোর?

বাবার গায়ে হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিতে চেষ্টা করলেন সোমা। তার অসুস্থতা অসহায় করে দিয়েছে বাবাকেও। হয়তো এ অপরাধবোধ থেকেই বলে উঠলেন, না বাবা। আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বেঁচে থেকে তোমাদের এতো কষ্ট দেওয়ার থেকে মরে যাওয়া অনেক ভালো।

অপারেশন করে সুস্থ হলে কী করবেন -এ প্রশ্নে সোমার মুখে ক্ষণিকের জন্য দেখা গেলো মলিন হাসি। বললেন, শিক্ষক হবো অথবা যে কোন চাকরি করে বাবা-মাকে দেখাশোনা করবো। কিন্তু এভাবে স্বপ্নের কথা না বলতে মেয়েটি বার বার বারণ করেন এই প্রতিবেদককে।

সোমাকে সাহায্য করতে চাইলে ফোন করতে পারেন এই নম্বরে : হারুন-উর-রশিদ, মোবাইল নং- ০১৭৬২১৭৪৪০৪ (বিকাশ)। অথবা ডাচবাংলা ব্যাংকের একাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন। একাউন্ট নাম্বার ২১১.১০১.৫৮৮০৩, পল্লবী শাখা, ঢাকা।

ইআর/এসএইচ